বিষণ্ণতা প্রতিবন্ধিত্ব ও ভারসাম্যহীনতার অন্যতম কারণ। শুধু তাই নয়, সারা বিশ্বে শারীরিক প্রতিবন্ধিত্বের পেছনে পিঠের অসামঞ্জস্যতা বা পিঠের ব্যাথার পরপরই যে কারণটি উঠে এসেছে তা হলো বিষণ্ণতা। প্লাস মেডিসিন জার্নালে প্রকাশিত একটি গবেষণা প্রতিবেদনে উঠে আসা এই তথ্য বিশ্লেষণ করে বিশেষজ্ঞরা বিশ্বব্যাপী জনস্বাস্থ্যকে ঝুঁকিমুক্ত করতে বিষণ্ণতাকে অগ্রাধিকার দেয়ার পরামর্শ দিয়েছেন।
গবেষণামূলক প্রতিবেদনটিতে শারীরিক প্রতিবন্ধিত্বের জন্য ২০০ রকম রোগ এবং বিভিন্ন ইনজুরির সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে একটি মাত্র সমস্যাকে, আর তা হলো বিষণ্ণতা। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা জানিয়েছে, সারা বিশ্বে খুব অল্পসংখ্যক মানুষই বিষণ্ণতাকে সমস্যা বা অসুখ মনে করে চিকিৎসকদের শরণাপন্ন হন।
গবেষণায় শারীরিক প্রতিবন্ধিত্বের কারণ হিসেবে বিষণ্ণতাকে বিশ্বব্যাপী দু’নম্বর কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হলেও প্রকৃতপক্ষে দেশ এবং অঞ্চলভেদে বিষণ্ণতার প্রভাবকে আরো অনেক বেশি মারাত্মক হিসেবে প্রতিবেদনটিতে উল্লেখ করা হয়েছে। গুরুতর বিষণ্ণতায় ভোগার কারণে প্রতিবন্ধিত্বের হার বেশি- এমন দেশের তালিকায় আফগানিস্তান রয়েছে সারির প্রথমে এবং সারির শেষে অবস্থান করছে জাপান। এছাড়া শারীরিক প্রতিবন্ধকতা নিয়ে বেঁচে থাকা মানুষের গড় আয়ুর হিসাবে বৃটেন তালিকায় অবস্থান করছে তৃতীয় দেশ হিসেবে।
কুইন্সল্যান্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের জনস্বাস্থ্য অনুষদের অধ্যাপক ড. অ্যালিজ ফেরারির নেতৃত্বে গবেষণাটি করা হয়। বিবিসি নিউজকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে ড. ফেরারি জানিয়েছেন, “বিষণ্ণতা একটি বড় সমস্যা। তাই এখন এর প্রতি যতটা গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে প্রকৃতপক্ষে তার চাইতেও আরো অনেক বেশি গুরুত্ব দিয়ে দেখা উচিত এই সমস্যাটিকে।” রোগ হিসেবে বিষণ্ণতার প্রতি যথেষ্ট গুরুত্ব দিয়ে এ বিষয়ে জনগণকে সচেতন করা এবং বিষণ্ণতা থেকে মুক্তি পেতে উন্নততর চিকিৎসাপদ্ধতি উদ্ভাবনের কাজে সাফল্য অর্জন ও বৃদ্ধির দিকেও দৃষ্টি আকর্ষণ করেন ড. ফেরারি।
নীতিনির্ধারণ পর্যায়ে বিষণ্ণতার গুরুত্ব জনসম্মুখে তুলে ধরতে কাজ করা হলেও তা যথেষ্ট নয় বলে মন্তব্য করে ড. ফেরারি আরো বলেন, “বিষণ্ণতার নিরসনে কাজে সাফল্য অর্জনের পেছনে মূল বাধাটা হচ্ছে বিভিন্ন দেশের মানুষের মধ্যে জীবনযাপনের মানের পার্থক্য। এ কারণেই বিশ্বব্যাপী নীতি নির্ধারণ বেশ কঠিন কাজ। বেশি আয়ের দেশে অর্থাৎ ধনী দেশগুলোতে বিষণ্ণতার মাত্রা যেমন কম, তেমনি নিম্ন আয়ের দেশগুলোতে বিষণ্ণতার মাত্রা ও বিষণ্ণতায় ভোগা মানুষের হার অনেক বেশি।”
বিষণ্ণতা ছাড়াও শারীরিক প্রতিবন্ধিত্বের জন্য মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ক আরো অনেকগুলো বিষয়কে দায়ী করেন ফেরারি। তিনি বলেন, “একজন মানুষের কাছে অক্ষমতা বা প্রতিবন্ধিত্ব বা অসুস্থতা বলতে যা বোঝায়, দৃষ্টিভঙ্গিগত পার্থক্যের কারণে অন্যজনের কাছে সংজ্ঞাটি অন্যরকম হতেই পারে। আর স্রেফ দু’জন মানুষের দৃষ্টিভঙ্গির মধ্যে যত না পার্থক্য, দু’টো আলাদা দেশের কাছে সে পার্থক্য আরো অনেক বিশাল। সাংস্কৃতিক ভিন্নতা সংক্রান্ত বিশ্লেষণ এক্ষেত্রে বেশ বড় জটিলতা- যা একইসঙ্গে কিভাবে সমস্যাটিকে চিহ্নিত করতে হবে সেই পথও দেখায় এবং এই সমস্যার ব্যাপ্তি সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধিতে আরো গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় হিসেবে বিবেচিত হয়।”
সারা বিশ্বে ১৯৯০ এবং ২০০০ সালে একই ধরনের বিভিন্ন গবেষণাতে বিষণ্ণতা নিয়ে যেসব তথ্য উঠে এসেছিল, ২০১০ পরবর্তী সময়েও সে দৃশ্য খুব একটা বদলায়নি। বরং অবস্থা দিনকে দিন আরো খারাপ হয়েছে। বিষণ্ণতাকে প্রতিবেদনে বিশ্বের একটি ‘বোঝা’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
বিষণ্ণতা বিষয়ক এই গবেষণার প্রতিবেদনে উঠে আসা তথ্য সম্পর্কে মন্তব্য করতে গিয়ে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মানসিক স্বাস্থ্য অনুষদের স্বাস্থ্য বিষয়ক অর্থনীতিবিদ ড. ড্যানিয়েল চিজহোম জানিয়েছেন, “সারা বিশ্বে বিষণ্ণতার যে চিত্র তাও বিষণ্ণ হওয়ার মতোই! জনস্বাস্থ্যের প্রতি এটা এত বড় ঝুঁকি যে তা বলে শেষ করা সম্ভব নয়।” তিনি আরো বলেন, “সারা বিশ্বে খুব কমসংখ্যক মানুষই আছেন যারা বিষণ্ণতাকে রোগ হিসেবে চিহ্নিত করতে পেরে কোনোরকম চিকিৎসা বা বিশ্লেষণের প্রয়োজন অনুভব করেন।”
উল্লেখ্য, সম্প্রতি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বৈশ্বিক মানসিক স্বাস্থ্য সম্পর্কে মূলত নীতি-নির্ধারকদের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি করতে একটি কর্ম পরিকল্পনা প্রণয়ন করেছে। সূত্র বিবিসি নিউজ।
সূত্র - natunbarta.com

