গরম কমছে না। কমছে না ডায়রিয়ার প্রকোপও। প্রচণ্ড গরমে মানুষ যে শুধু ডায়রিয়ায় ভুগছে তা-ই নয়, অবসাদগ্রস্ততায় ভুগছে, ঠিকমতো কাজকর্ম করতে পারছে না। জন্ডিস, টাইফয়েড, প্যারাটাইফয়েড ও ভাইরাসজনিত রোগেও আক্রান্ত হচ্ছে মানুষ।
গতকাল শনিবার রাজধানীর আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্রে বেলা তিনটা পর্যন্ত ৩৭৯ জন রোগী ভর্তি হয়েছে। এর আগের ২৪ ঘণ্টায় ভর্তি হয় ৭৪১ জন। এ মৌসুমে সবচেয়ে বেশি রোগী ভর্তি হয়েছে গত বৃহস্পতিবার। ওই দিন ভর্তি রোগীর সংখ্যা ছিল ৭৮৬ জন।
আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশের (আইসিডিডিআরবি) প্রধান চিকিৎসক প্রদীপ কে বর্ধন প্রথম আলোকে বলেন, গত বছরের তুলনায় এবার রোগীর সংখ্যা বেশি। পর্যাপ্ত পরিমাণে নিরাপদ পানি সরবরাহ ছাড়া পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা যাবে না। প্রচণ্ড গরমের কারণে অনেকেই হয়তো রাস্তার ধার থেকে বিভিন্ন রকমের শরবত, ফল কিনে খাচ্ছে। এ থেকে সংক্রমণ ঘটছে। মানুষ ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হচ্ছে।
তবে আক্রান্ত রোগীরা কোনো এক বা দুটি বিশেষ জায়গা থেকে আসছে না। মূলত রোগীরা আসছে ঢাকা ও এর আশপাশের বিভিন্ন এলাকা থেকে। এদের কমপক্ষে ৬০ ভাগই শিশু। চিকিৎসকেরা বলছেন, যারা হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসছে, তাদের ৪০ ভাগ গুরুতর ডায়রিয়ায় আক্রান্ত।
প্রতিবছরের মতো এবার চৈত্র-বৈশাখ মাসে বাড়তি রোগীর চাপ সামলাতে না পেরে আইসিডিডিআরবির মূল ভবনের সামনে তাঁবু খাটানো হয়েছে। সেখানে কথা হয় নূরজাহানের সঙ্গে। তাঁর বাড়ি গাজীপুরের কাপাসিয়ায়। তিনি জানান, তাঁর আট মাসের বাচ্চা রিমিকে বারবার স্যালাইন খাইয়েও কাজ হচ্ছে না বলে বাধ্য হয়ে এই হাসপাতালে ভর্তি করতে এসেছেন। এ সময় তাঁর পেছনে আরও ছয়-সাতজন নারী তাঁদের শিশুসন্তান কোলে নিয়ে ভর্তির জন্য দাঁড়িয়ে ছিলেন।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নিয়ন্ত্রণকক্ষের তথ্যমতে, ২৪ এপ্রিল পর্যন্ত দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি রোগীর মধ্যে এক হাজার ৩৫৬ জন ডায়রিয়ায় আক্রান্ত। তবে গ্রীষ্মকালীন অন্যান্যরোগের খবর দিতে পারেনি নিয়ন্ত্রণকক্ষ।
রোগ নিয়ন্ত্রণ বিভাগের পরিচালক বেনজির আহমেদ প্রথম আলোকে বলেন, প্রতিটি জেলায় ডায়রিয়া পরিস্থিতি সামাল দিতে প্রতিবছরের মতো এবারও সিভিল সার্জনদের নেতৃত্বে চিকিৎসক দল প্রস্তুত আছে। কিন্তু মানুষকে সচেতন করার উদ্যোগ সেভাবে এখনো নেওয়া হয়নি।
পরামর্শ:
ডায়রিয়াসহ এই গরমে আরও কিছু সমস্যায় করণীয় সম্পর্কে পরামর্শ দিয়েছেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএসএমএমইউ) মেডিসিন অনুষদের ডিন এ বি এম আবদুল্লাহ। তিনি জানান, প্রচণ্ড গরমে মানুষ হিট এক্সরসন বা হিট ক্র্যাম্পে আক্রান্ত হতে পারে। হিট ক্র্যাম্প বা হিট এক্সরসন থেকে রোগীর হিট স্ট্রোকও হতে পারে। প্রাথমিক অবস্থায় এ রোগে মানুষ অবসাদগ্রস্ত হয়ে পড়ে, মাথা ঘোরে। পরিস্থিতি খারাপ হলে রোগীর বমি হতে পারে, শরীরের তাপমাত্রা ১০৪ -১০৫ ডিগ্রি হয়ে যেতে পারে। সাধারণত শ্রমিক শ্রেণীর মানুষ, যাঁরা প্রচণ্ড গরমের মধ্যে কাজ করেন, তাঁরা এ রোগের ঝুঁকিতে রয়েছেন।
এ বি এম আদুল্লাহ হিট স্ট্রোক থেকে রক্ষা পেতে গরম এড়িয়ে চলার পরামর্শ দিয়েছেন। তিনি জানান, হিট স্ট্রোক হয়ে গেলে রোগীর গা মুছে দিতে হবে, ফ্যান বা শীতাতপনিয়ন্ত্রণ যন্ত্র ছাড়তে হবে। এ দুটোর কোনোটাই জোগাড় করা সম্ভব না হলে তালপাতার পাখার বাতাস করতে হবে। এ ছাড়া গরমে দূষিত পানি ও খাওয়ার থেকে জন্ডিস, টাইফয়েড, প্যারাটাইফয়েড হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের শিশু ওয়ার্ডের চিকিৎসকদের গতকাল ডায়রিয়ায় আক্রান্ত শিশুর মায়েদের বারবার শিশুকে বুকের দুধ খাওয়ানোর পরামর্শ দিতে দেখা গেছে। এ ছাড়া চিকিৎসকেরা ছয় থেকে ২৩ মাস বয়সী শিশুদের বুকের দুধের পাশাপাশি টাটকা পরিপূরক খাবার খাওয়ানোর পরামর্শ দিয়েছেন। তাঁরা বলছেন, শিশুকে খাওয়ানোর আগে প্রতিবার মাকে হাত পরিষ্কার পানিতে ধুতে হবে, শিশুর হাত ধুয়ে দিতে হবে।
সূত্র - প্রথম আলো

