রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতাল এবং বাংলাদেশ মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালের দুই চিকিৎসককে কারাগারে প্রেরণ, বারডেম হাসপাতালে চিকিৎসককে মারধর ও ভাঙচুর, মিটফোর্ড হাসপাতালে বিনা অনুমতিতে সংবাদ সংগ্রহের অভিযোগে সাংবাদিকদের ওপর চিকিৎসকদের হামলার ঘটনার পর গতকাল রবিবার রোগীর স্বজনের হাতে এক ইন্টার্নি চিকিৎসক লাঞ্ছিত হওয়ার প্রতিবাদে রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ব্যাপক তাণ্ডব চালিয়েছেন ইন্টার্নি চিকিৎসকরা। তাঁরা হাসপাতালে ভাঙচুর চালানোর পাশাপাশি সাংবাদিকদের ওপরও হামলা চালান। গতকাল হামলা ও ভাঙচুরে অশান্ত হয়ে ওঠে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালও। কিছুদিন ধরেই এমন অশান্ত পরিস্থিতির উদ্ভব হচ্ছে একের পর এক হাসপাতালে। ফলে মানুষের চিকিৎসা কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হচ্ছে মারাত্মকভাবে। একই সঙ্গে সরকারের দায়িত্বশীল মহলও বিপাকে পড়ছে বারবার।
বাংলাদেশ মেডিক্যাল অ্যাসোসিয়েশনের মহাসচিব অধ্যাপক ডা. ইকবাল আর্সলান বলেন, চিকিৎসাকেন্দ্রগুলোকে সব কিছুর ঊর্ধ্বে রাখা দরকার। কিন্তু আমাদের দেশে ডাক্তার, রোগী, কর্মকর্তা-কর্মচারী, প্রশাসন, মিডিয়াসহ সব ক্ষেত্র থেকেই একধরনের নেতিবাচক আচরণের শিকার হচ্ছে হাসপাতালগুলো। এসব ক্ষেত্রে অসচেতনতাকেই দায়ী করা যায়। সবার সম্মিলিত ইতিবাচক উদ্যোগের মাধ্যমে হাসপাতালের মতো প্রতিষ্ঠানগুলোতে সুরক্ষার দায়িত্ব সমাজের সর্বস্তরের মানুষকে নিতে হবে। তবে সরকারের সবার আগে এ জন্য আরো কার্যকর ভূমিকা রাখা জরুরি।’
ডা. ইকবাল আর্সলান বলেন, হাসপাতাল বা চিকিৎসাকেন্দ্র সম্পর্কে মানুষের সচেতনতা বাড়ানো না গেলে পুরো চিকিৎসাব্যবস্থাই ক্ষতিগ্রস্ত হবে। ডাক্তারদের যেমন আচার-আচরণ সম্পর্কে আরো সচেতন থাকা প্রয়োজন, তেমনি রোগীদেরও সচেতন হতে হবে।
‘দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে মনে হচ্ছে অন্য কাজের চেয়ে হাসপাতালগুলোর পরিবেশ শান্ত রাখাই এখন প্রধান কাজ হয়ে পড়েছে। এমনটা চলতে থাকলে হাসপাতালে চিকিৎসা চলবে কী করে!’ সরকারের স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নবনিযুক্ত মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. দ্বীন মো. নুরুল হক গত শনিবার রাজধানীর রূপসী বাংলা হোটেলে এক অনুষ্ঠানে রাখা বক্তব্যে এ কথা বলেন। অনুষ্ঠানের মঞ্চে বসে থাকা অবস্থায়ই তিনি খবর পান- রাজধানীর স্যার সলিমুল্লাহ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে একজন রোগীকে হয়রানির অভিযোগ ঘিরে একটি টেলিভিশন চ্যানেলের সাংবাদিকদের মারধর করেন চিকিৎসকরা, যা নিয়ে ওই হাসপাতাল অশান্ত হয়ে ওঠে।
অন্যদিকে রাজধানীর বারডেম হাসপাতালে প্রতিদিন চলছে এক ঘণ্টা করে প্রতীকী কর্মবিরতি। এর আগের সপ্তাহে বাংলাদেশ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের একজন চিকিৎসককে গ্রেপ্তার করা নিয়ে বেসরকারি ওই হাসপাতালের চিকিৎসকরাও বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করে। এর আগে রাজশাহীতে আরেক রোগীর মৃত্যুর ঘটনায় এক ডাক্তারের জামিন মঞ্জুর না হওয়ায় ডাক্তাররা ধর্মঘটে ছিলেন। এদিকে বারডেমে চিকিৎসকদের কর্মবিরতির পাশাপাশি গতকাল রবিবার পাল্টাপাল্টি দুটি মামলার ঘটনায় পরিস্থিতি নতুন দিকে মোড় নিয়েছে। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ মামলা করেছে মৃত রোগীর স্বজনদের বিরুদ্ধে, আর মৃত রোগীর স্বজনদের পক্ষ থেকে মামলা করা হয়েছে ডাক্তারদের বিরুদ্ধে। সর্বশেষ বগুড়া মেডিক্যাল কলেজের হোস্টেলে ডাকাতি ও লুটপাটের ঘটনায় গতকাল রবিবার থেকে কর্মবিরতি শুরু করেছেন ওই হাসপাতালের ইন্টার্নি চিকিৎসকরা।
স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম এর আগে কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘রোগী ও ডাক্তারদের নিরাপত্তায় আইন করতে হবে। কিছু হলেই যেমন ডাক্তারদের মারধর বা হাসপাতালে ভাঙচুর করা যাবে না, তেমনি ডাক্তাররাও ধর্মঘটের নামে রোগীদের জিম্মি করতে পারবেন না।’
প্রধানমন্ত্রীর স্বাস্থ্যবিষয়ক সাবেক উপদেষ্টা ও প্রবীণ চিকিৎসক অধ্যাপক ডা. সৈয়দ মোদাচ্ছের আলী চিকিৎসক ও রোগীদের সম্পর্কের অবনতি বিষয়ে বলেন, ‘ডাক্তারদের ওপর মানুষের আস্থা ও বিশ্বাস অনেক বেশি। তাই অল্প কোনো বিচ্যুতি দেখলেই রোগী বা তাদের স্বজনদের মধ্যে ডাক্তারদের সম্পর্কে ভুল ধারণা সৃষ্টি হয়। এ অবস্থা কাটানোর দায়িত্বও ডাক্তারদের ওপরই বর্তায়।’
গত ১৩ এপ্রিল দায়িত্বে অবহেলায় একজন রোগীর মৃত্যুর অভিযোগে এক চিকিৎসকসহ চারজনকে মারধর ও ভাঙচুরের প্রতিবাদে অনির্দিষ্টকালের জন্য কর্মবিরতি শুরু করেন বারডেম হাসপাতালের চিকিৎসকরা। দুই দিন অবিরাম কর্মবিরতি চললেও পরবর্তী সময়ে স্বাস্থ্যমন্ত্রীর হস্তক্ষেপে ওই কর্মবিরতির পরিধি কমিয়ে দিনে এক ঘণ্টায় নিয়ে আসা হয়েছে, যা এখনো অব্যাহত আছে। ডাক্তারদের এ কর্মবিরতির ফলে প্রতিদিনই কম-বেশি ভোগান্তির মুখে পড়েন বারডেমের রোগীরা।
শনিবার হঠাৎ করেই স্যার সলিমুল্লাহ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ঘটে আরেক অপ্রীতিকর ঘটনা। মিটফোর্ড হাসপাতালে রোগীদের চিকিৎসাসেবায় অবহেলার অভিযোগে ওই হাসপাতালে চিকিৎসাসেবার হালচাল নিয়ে রিপোর্ট করার জন্য টেলিভিশন চ্যানেল একুশে টিভির একটি টিম যায়। এ সময় রোগীদের যথাযথ সেবা না দেওয়ায় চিকিৎসকদের সঙ্গে রোগী ও তাঁর স্বজনদের বাগ্বিতণ্ডা হয় সাংবাদিকদের উপস্থিতিতেই। এ দৃশ্য ক্যামেরাবন্দি করায় ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন চিকিৎসকরা। তাঁরা একুশে টিভির অনুসন্ধানমূলক অনুষ্ঠান ‘একুশের চোখ’-এর ক্যামেরাম্যানসহ ছয় সাংবাদিককে বেধড়ক মারধর করে। এমনকি হাসপাতালের পরিচালকের নেতৃত্বে তাঁর রুমে সাংবাদিকদের আটকে রেখে তাঁদের সঙ্গে থাকা ক্যামেরা, বুম ও মোবাইল ভাঙচুর করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগী সাংবাদিকরা। পরে র্যাব-পুলিশের সহায়তায় তাঁদের উদ্ধার করে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।
এ ঘটনার সময় হাসপাতালজুড়ে রোগীদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। চিকিৎসা নিতে আসা বহির্বিভাগের রোগীরা দ্রুত হাসপাতাল ত্যাগ করে। ডাক্তাররাও রোগীদের চিকিৎসা বন্ধ রেখে সাংবাদিকদের ওপর হামলা চালাতে ছুটে যান বলে জানান ঘটনাস্থলে উপস্থিত থাকা একাধিক রোগী ও তাদের স্বজন।
গত মাসে সবচেয়ে বেশি অশান্ত পরিস্থিতি বিরাজ করে রাজশাহীতে। চিকিৎসকদের সর্বজনীন সংগঠন ‘বাংলাদেশ মেডিক্যাল অ্যাসোসিয়েশন (বিএমএ) ও ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগের সমর্থনপুষ্ট ‘স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদ-স্বাচিপ’সহ সাতটি সংগঠনের সমন্বয়ে রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে একটানা কয়েক দিন চলে ডাক্তার ধর্মঘট। এর আগে একই মাসের প্রথম সপ্তাহে ফরিদপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল ও ঢাকার ন্যাশনাল মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ধর্মঘট পালন করেন চিকিৎসকরা। একইভাবে ফেব্রুয়ারি মাসে রংপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল, জানুয়ারি মাসে বগুড়া শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিক্যল কলেজ হাসপাতালেও ডাক্তাররা ধর্মঘটের ডাক দেন। এ ছাড়া গত ডিসেম্বরের ৯ থেকে ১৫ তারিখ পর্যন্ত একটানা আট দিন ধর্মেঘটে ছিলেন ঢাকার স্যার সলিমুল্লাহ মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালের ইন্টার্নি চিকিৎসকরা। একই মাসে ধর্মঘটে ছিলেন সিলেটের ওসমানী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের চিকিৎসকরা। এভাবে গত বছর সারা দেশে বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ৫০ বারেরও বেশি বিভিন্ন কারণে অশান্ত পরিস্থিতি তৈরি হয়, চলে ডাক্তার বা কর্মচারীদের ধর্মঘট।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, এসব অশান্ত পরিস্থিতির বেশির ভাগের পেছনে রয়েছে দায়িত্বে অবহেলায় রোগীর মৃত্যু, কর্মচারীদের সঙ্গে মারামারি ও রোগীর স্বজনদের হাতে লাঞ্ছিত হওয়ার ঘটনা। যদিও এবার বগুড়া মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের ঘটনার পেছনে রয়েছে হোস্টেলে ডাকাতি। আর গতকাল ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে হামলা হয়েছে অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদকে কেন্দ্র করে।
ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোস্তাফিজুর রহমান কালের কণ্ঠকে বলেন, অবৈধ দোকানপাট উচ্ছেদ করার সময় একদল বহিরাগত লাঠিসোঁটা নিয়ে জরুরি বিভাগ ও বহির্বিভাগে হামলা ও ভাঙচুর চালায়।
বাংলাদেশ মেডিক্যাল অ্যাসোসিয়েশনের মহাসচিব বলেন, একেকটি ঘটনা একেক রকম হলেও সবগুলোর শিকার হচ্ছে হাসপাতাল। এতে চিকিৎসা ব্যাহত হচ্ছে, রোগীরা বঞ্চিত হচ্ছে চিকিৎসাসেবা থেকে।
সূত্র - দৈনিক কালের কণ্ঠ

