ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সরকারি ওষুধ চলে যাচ্ছে পুরান ঢাকার মিটফোর্ড ও কামরাঙ্গীরচরসহ রাজধানীর বিভিন্ন ওষুধের দোকানে। হাসপাতাল থেকে চুরি করা ওষুধ অসাধু ব্যবসায়ীরা স্বল্পমূল্যে কিনে নিচ্ছে। এ ওষুধই আবার সাধারণ মানুষকে কিনতে হচ্ছে চড়া মূল্যে। গত শনিবার সকালে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল থেকে ওষুধ বাইরে নিয়ে যাওয়ার সময় মো. জসিম, মো. রফিক ও সাগর নামে আটক তিনজন প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে পুলিশকে এ তথ্য জানায়। এদের মধ্যে মো. জসিম বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) সদস্য। তাকে শনিবার রাতে বিজিবির কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। বিজিবি তার বিষয়ে বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবে বলে জানিয়েছে পুলিশ । পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে বিজিবির সদস্য জসিম দাবি করেন, ওষুধ চুরির সঙ্গে তিনি জড়িত নন। ঘটনার সময় দুই ব্যক্তিকে আনসার সদস্যদের সঙ্গে বাকবিতণ্ডা করতে দেখে তিনি ঘটনার কারণ জিজ্ঞেস করলে তাকে আটক করা হয়। তার পায়ের সমস্যার কারণে তিনি ঢামেক হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য গিয়েছিলেন। এছাড়া অন্য দু’জন পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে জানিয়েছে, ঢামেকের কয়েকজন অসাধু কর্মকর্তা ও কর্মচারীর যোগসাজশে তারা দীর্ঘদিন ধরে হাসপাতাল থেকে ওষুধ চুরি করে রাজধানীর বিভিন্ন ফার্মেসিতে বিক্রি করে আসছে। এদিকে হাসপাতালের একটি সূত্র জানায়, ওষুধ চুরির সঙ্গে হাসপাতালের সংঘবদ্ধ একটি চক্র জড়িত। তাদের সহায়তায় হাসপাতালের ওষুধ বাইরে যাচ্ছে। এসব বিষয়ে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ তদন্ত কমিটি গঠন করলেও তা আলোর মুখ দেখে না। চক্রটি এতই শক্তিশালী যে তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হলেও আইনের ফাঁক গলে বেরিয়ে আবারো একই কাজ করছে।
ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোস্তাফিজুর রহমান জানান, আটক হওয়া ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে। এছাড়া এর সঙ্গে জড়িত অন্যদেরও আইনের আওতায় আনা হবে। ঢামেক হাসপাতালের আনসার ক্যাম্প ইনচার্জ প্লাটুন কমান্ডার (পিসি) আবদুল খালেক বলেন, আটককৃতদের মধ্যে রফিক দীর্ঘদিন ধরেই এ কাজের সঙ্গে জড়িত। সে হাসপাতালের বিশেষ কর্মচারী। এ কারণে চিকিৎসকদের বিভিন্ন সমস্যার কথা বলে সিøপে ওষুধের নাম লিখিয়ে নিত। হাসপাতালের চিকিৎসকরাও বিশ্বাস করে ওষুধ লিখে দিতেন। গোপন তথ্যের ভিত্তিতে গত এক সপ্তাহ রফিককে নজরদারিতে রাখা হয়। পরে হাতেনাতে শনিবার তাকে আটক করা হয়।
তিনি আরো জানান, রফিক হাসপাতালের বহির্বিভাগ থেকে ওষুধের সিøপ নিয়ে স্টোর থেকে ওষুধ নিয়ে আসত। কখনো কখনো সিøপে চিকিৎসকের স্বাক্ষর জাল করে ওষুধ বের করে আনত। ওই ওষুধগুলো লুকিয়ে রেখে কিছুদিন পর জমানো ওষুধ হাসপাতাল থেকে বাইরে নিয়ে বিক্রি করত।
বিজিবির সদস্যকে আটকের বিষয়ে তিনি জানান, ওই ব্যক্তি এসে আটক অন্য ব্যক্তিদের ছেড়ে দেয়ার কথা বলেন। এ কারণে তাকেও আটক করা হয়। তাদের সে না চিনলে ছেড়ে দিতে কেন বলবে। এছাড়া তিনি নিজের পরিচয় ওই সময় দেননি।
হাসপাতালের বহির্বিভাগে গিয়ে দেখা যায়, সেখানে আগত রোগীরা প্রথমে টিকিট নেয়। এরপর সংশ্লিষ্ট বিভাগের চিকিৎসকের চেম্বারে যায়। চিকিৎসক হাসপাতালের সিল মারা একটি সিøপে রোগীর জন্য ওষুধের নাম লিখে দেন। পরে সিøপটি নিয়ে ওষুধের জন্য নির্ধারিত কাউন্টারে গিয়ে দেখালে সিøপে লেখা ওষুধ দিয়ে দেয়া হচ্ছে।
শাহবাগ থানার ওসি সিরাজুল ইসলাম জানান, এদের সঙ্গে হাসপাতালের কয়েকজন কর্মচারী জড়িত রয়েছে। হাসপাতালের চিকিৎসকের মাধ্যমে সিøপে ওষুধের নাম লিখিয়ে পরে কাউন্টার থেকে ওষুধ নিয়ে নিজের কাছে রেখে দেয়। সুযোগ বুঝে অন্যদের সহায়তায় ওষুধগুলো বাইরে বিক্রি করে। জিজ্ঞাসাবাদে আটককৃতরা চুরি করা ওষুধ বাইরের বিভিন্ন ফার্মেসিতে বিক্রির কথা জানায়। তাদের দেয়া তথ্যে কামরাঙ্গীরচরের একটি ফার্মেসিতে অভিযান চালানো হয়েছে। কিন্তু ফার্মেসিটি বন্ধ পাওয়া যায়। পরে আবারো ওই ফার্মেসিতে অভিযান চালানো হবে। তবে তদন্তের স্বার্থে ফার্মেসি বা মালিকের নাম জানাননি তিনি।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা শাহবাগ থানার এসআই আবদুল মোতালেব জানান, আটকদের মধ্যে বিজিবি সদস্য জসিমকে বিজিবির কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। বিজিবি এ বিষয়ে বিভাগীয় তদন্ত করবে। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে আটক রফিক ও সাগর ওষুধ চুরির কথা স্বীকার করেছে। রফিক হাসপাতালের কর্মচারী। সাগর নিজেকে বহিরাগত ছাত্র বলে দাবি করেছেন। তিনি ২০১৩ সালে মোহাম্মদপুরে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব মেডিকেল সায়েন্স থেকে পাস করেছেন। এছাড়া ঢামেক থেকে ইন্টার্ন কোর্স করেছেন। সে সুবাদে তার সঙ্গে ঢামেকের লোকজনের পরিচয় রয়েছে।
উল্লেখ্য, গত বছরের ৬ ডিসেম্বর ঢামেক হাসপাতাল থেকে ওষুধ পাচারের সময় হাসপাতালের ওয়ার্ডবয় আব্দুল মজিদকে (৪০) আটক করে পুলিশের কাছে সোপর্দ করে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। পরে এ ঘটনায় একটি তদন্ত কমিটিও করা হয়। এর আগে একই বছরের ৫ অক্টোবর প্রায় ১৪ হাজার টাকা মূল্যের সরকারি ওষুধ চুরি করার অপরাধে ওয়ার্ডবয় সোহাগকে পুলিশে সোপর্দ করা হয়। এ সময় সোহাগ পুলিশের কাছে স্বীকার করে যে হাসপাতালের নিউরোসাজারি বিভাগের ওয়ার্ডবয় হারুনের মাধ্যমে তিনি এসব ওষুধ কিনেছেন। এর আগেও একবার তার কাছ থেকে ওষুধ কিনেছেন। এছাড়া গত বছরের ২৩ এপ্রিল প্রায় ৩৭ হাজার টাকা মূল্যের ওষুধ পাচারের সময় নাসির উদ্দিন নামের এক ওয়ার্ডবয়কে আটক করে পুলিশে সোপর্দ করে কর্তৃপক্ষ। ওই সময় নাসির উদ্দিন জিজ্ঞাসাবাদে জানিয়েছিলেন দীর্ঘদিন ধরে হাসপাতালের ওষুধ বাইরে বিক্রি করে আসছেন তিনি।
সূত্র - দৈনিক মানবকণ্ঠ

