বাবা মারা যাওয়ায় মা, দুই ভাই, বিয়ের সোমত্ত বোনকে নিয়ে অনেক কষ্টেই দিন কাটছিল তাদের। এ সময় ঢাকার গোপীবাগে এক অবস্থাপন্ন পরিবার থেকে তার বিয়ের প্রস্তাব আসে। এমন পাত্র হাতছাড়া করতে চাননি তার মা। তাকে দেখতে এসেই পছন্দ হয়ে যায় বরপক্ষের। ১৯৮৮ সালে কাজী ডেকে বিয়ে করে তাকে শ্বশুরবাড়িতে নিয়ে তোলে। বিয়ের পরদিনই জানতে পারেন তার স্বামী ফেনসিডিল খায়।
এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, স্বামী তাকে প্রথমে ফেনসি, হেরোইন, এর পর সুই নেয়ার অভ্যাস করায়। ফেনসিতে নেশা না হলে হেরোইন খাই। হেরোইন নকল বের হওয়ায় নেশা হয় না। তখনি দুজনে সুই নেয়া শুরু করি। বড় ছেলেরে বিয়ে করিয়ে ঘরে বউ আনি। কিন্তু নেশা ছাড়তে পারি না। শ্বশুর-শাশুড়ি-স্বামী-ছেলে-ছেলের বউ-নাতি ভরা সুখের সংসার। নেশা করি দেখে শাশুড়ি বাড়ি থেকে বের করে দেন। যে আমারে নেশা করা শেখাল সে তার ছেলে হওয়ায় তাকে বাড়ি থেকে তাড়াল না। ছেলেরা আমারে ঘর ভাড়া করে নতুন ফার্নিচার দিয়ে সাজিয়েও দেয়। স্বামী-ছেলেরা মাঝে মাঝে আমার সঙ্গে দেখা করতে আসত। এখানে স্বামী আমার সঙ্গে সুই নিত। ২০১৩ সালের জানুয়ারিতে আমার এইচআইভির জীবাণু ধরা পড়ে। স্বামী-ছেলেদের কাছে কথাটা গোপন রাখি। সাতাশ দিন আগে দ্বিতীয়বার বিয়ে করি আরেক মাদকসেবীকে। সে আমার পূর্ব পরিচিত। সেও আমার মতো সিরিঞ্জের মাধ্যমে শিরায় মাদক নেয়। তার বউও সুই নিত। ওর বউ খুন হওয়ার পর আমরা দুজনে একসঙ্গে সুই নিতাম। সুই নিতে গিয়ে দুজনের মধ্যে ভাব-ভালোবাসা হয়। বিয়ে করি। সেও জানে না আমি এইচআইভি পজিটিভ। আগের স্বামীও ফোনে মাঝে মাঝে আমার খোঁজখবর নেয়। দ্বিতীয় স্বামী এইটা পছন্দ করে না দেখে তার অগোচরে আমারে ফোন করে। সেও আমারে খুব ভালোবাসে।
সেভ দ্য চিলড্রেনের সিনিয়র প্রোজেক্ট ম্যানেজার অনুপ কুমার বসু জানান, ১৯৯০ সাল থেকে বাংলাদেশে সিরিঞ্জের মাধ্যমে শিরায় মাদক নেয়ার ব্যাপকতা শুরু হয়। সিরিঞ্জের মাধ্যমে যারা শিরায় মাদক নেয় তাদের মাদক নেয়া বন্ধ করে মাদকমুক্ত করতে হবে। তাদের অনিরাপদ যৌন সম্পর্ক বন্ধ করা দরকার। কারণ এইচআইভি ঝুঁকির একমাত্র কারণ অনিরাপদ সিরিঞ্জের মাধ্যমে মাদক নেয়া, কনডমবিহীন যৌন সম্পর্ক গড়ে তোলা। পাঁচটি শহরে এইচআইভি ব্যক্তি রয়েছে। ঢাকায় এর পরিমাণ শতকরা ৫.৩ ভাগ। বাংলাদেশে শিরায় মাদক গ্রহণকারীদের জন্য ঝুঁকি হ্রাস লক্ষ্যে সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সমন্বিত উদ্যোগের দরকার।
বাংলাদেশে সিরিঞ্জের মাধ্যমে শিরায় মাদক নেয়ার ফলে কী কী কারণে মানুষ এইচআইভি ঝুঁকির পর্যায়ে রয়েছে জানতে চাইলে সেভ দ্য চিলড্রেনের সিনিয়র প্রোজেক্ট ম্যানেজার অনুপ কুমার বসু বলেন, গ্লোবাল ফান্ডের অর্থায়নে সেভ দ্য চিলড্রেনের সহায়তায় সিরিঞ্জে মাদকসেবীদের ওপর বেইস লাইন সার্ভে করা হয় ২০০৮ সালে, যারা সেবার আওতায় ছিল না তাদের জন্য। বেইস লাইনের তথ্য মতে, শতকরা ৭১ ভাগ একই সিরিঞ্জের মাধ্যমে শিরায় মাদক নেয়, শতকরা ২৪ ভাগ রক্ত বিক্রি করে, শতকরা ৬০ ভাগ অনিরাপদ যৌন সম্পর্ক স্থাপন করে, শতকরা ৬০ ভাগ কখনো কখনো কারাগারে অবস্থানকালে এবং মাত্র ৩৮ ভাগ বলেছেন তাদের এইচআইভি ঝুঁকি রয়েছে।
২০০৯ সালের এমএসটি’র (জাতীয় এইডস/এসটিডি প্রোগাম) জরিপে জানা যায়, ঢাকা শহরে শতকরা ৫.৩ ভাগ মানুষ সিরিঞ্জের মাধ্যমে শিরায় মাদক নেয়ায় এইচআইভি/এইডসে আক্রান্ত হয়েছে। এইচআইভিতে ৮ হাজার ৪২২ ব্যক্তি আক্রান্ত হয়েছে। সরকারি তথ্য মতে, বাংলাদেশে এ পর্যন্ত এইচআইভি সংক্রমিত রিপোর্টেট কেস ২০১৩ সালের ১ ডিসেম্বরের তথ্য অনুযায়ী, ৩ হাজার ২৪১ জন এইচআইভি, ১ হাজার ২৯৯ জন এইডস এবং ৪৭২ জন মৃতের ঘটনা শনাক্ত হয়েছে।
মামাতো বোনের বাচ্চাকে দেখাশোনার জন্য গ্রাম থেকে ঢাকার মিরপুরে এসেছিলেন মেয়েটি। বোন-দুলাভাই চাকরিতে চলে গেলে বোনের বাসার সামনে এক দোকান কর্মচারীর সঙ্গে তার প্রেম হয়। দুবছর পর বিয়ে করার জন্য ওই ছেলের সঙ্গে তিনি পালিয়ে যান। ছেলে তাকে বিয়ে না করে নবাবপুর রোডে দাঁড়া করিয়ে রেখে কেটে পড়ে। পথঘাট কিছুই চেনেন না তিনি। এক লোক তাকে ওখান থেকে নবাবপুর হোটেলে নিয়ে যায়। ওই হোটেলে শুরু হল তার যৌনকর্মীর জীবন। যৌনকর্মীর কাজ করতে গিয়ে কয়েকজন যুবকের সঙ্গে তার পরিচয় হয়। ওর ঠাণ্ডা লাগায় তারা তাকে ফেনসিডিল খেতে বলে।
তিনি (২৬) বলেন, ওরা বলে ফেনসি খাইলে ঠাণ্ডা ভালো হইয়া যাইব। ওদের কথায় ফেনসি খাই। মিষ্টি মিষ্টি লাগে। ভালোই লাগে। এরপর দিনে তিনটা খাইতাম। সেখানেই এক যুবকের সঙ্গে পরিচয় হয়। তারে কাগজে পেঁচাইয়া হেরোইন খাইতে দেখতাম। আমারে কয়, এইটা খাইলে ঘুম হয়, সেক্স বাড়ে। আমার ঘুমের সমস্যা ছিল। ঘুম হওয়ার জন্য প্রথম দিন দুই-তিনটা টান দিই। টান দিয়া দুই-তিন দিন ঘুমাইয়া থাকি। ঘুম হয় দেইখ্যা খাওয়া শুরু করি। কয়দিন যাইতে না যাইতে হে আমারে বিয়ার প্রস্তাব দেয়। ঢাকার ওয়ারিতে ওর বাড়িতে নিয়া বাবা-মা, ভাই-বোন-ভাবীর সঙ্গে পরিচয় করাইয়্যা দেয়। পনের বছর আগে শাশুড়ি আমাগো বিয়া পড়াইয়া দেয়। বাড়িটা দুই রুমের ফ্ল্যাট বাড়ি। এক ঘরে ভাশুর ঘুমাইত। আরেক ঘরে দেবর-ননদরা খাটে আর আমরা মেঝেতে ঘুমাইতাম। কেউ যাতে না দেইখ্যা ফেলে এইজন্য খাটের নিচে গিয়া দুজনে নেশা করতাম। নেশার কারণে প্রথম সন্তান ছেলে জšে§র সাত দিনের মাথায় মারা যায়। এর পর নেশার মাত্রা আমার বাইড়া যাইতে থাকে। স্বামী আমারে যা খাইতে দিত তাতে আমার হইত না। সে দেয়াল ঘড়ির ঢাইস মিস্ত্রির কাম করত। বেতন পাইত মাসে আট হাজার টাকা। এই টাকায় সংসারে খরচ দিয়া দুজনের নেশার টাকা হইত না। নেশা নেশা কইর্যা স্বামীর সঙ্গে ঝগড়াঝাটি কইর্যা শ্বশুরবাড়ি থিক্যা চইল্যা আসি। বাসা ভাড়া নিয়া একা থাকতে শুরু করি। বাসায় আমার সাথে নেশা করার জন্য কয়েকজন ছেলে আসত। বাড়িওয়ালা নেশা করি জানতে পাইর্যা আমারে উঠাইয়া দেয়। যাত্রাবাড়ীর ধলপুরে সিটি পল্লীর বস্তিতে আইস্যা পড়ি। এখানে আগে স্বামীর সঙ্গে আসতাম। এইখানেই আস্তানা গাড়ি। নেশার খরচ জুটাইতে যৌনকর্মীর কাম শুরু করি। আট বছর ধইর্যা এই কাম করতাছি। দুই নাম্বার হেরোইন বাইর হওয়ায় নেশা হয় না। ইয়াবা খাওন শুরু করি। ইয়াবাও দুই নাম্বার হওয়ায় সুই নেয়া শুরু করি। দুই বছর ধইর্যা সুই নিই। চাইর বাচ্চা হইছে। দুজনরে বিক্রি কইর্যা দিছি। যাতে আমার সন্তানগো আমার মতো জীবন না হয়। ধলপুরে কেয়ার বাংলাদেশের ড্রপ ইন সেন্টার থাইক্যা সুই, কনডম নেই।
কেয়ার বাংলাদেশের জিএফএটিএম (গ্লোবাল ফান্ড টু ফাইট এইচ/এইডস টিবি অ্যান্ড ম্যালেরিয়া) আইডিইউ প্রজেক্টের টিম লিডার ডা. জেড এম বাবর বলেন, সিরিঞ্জের মাধ্যমে শিরায় মাদক নেয়ার ক্ষেত্রে পুরুষের তুলনায় নারীর এইচআইভিতে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি অপেক্ষাকৃত বেশি। যে সব নারী সিরিঞ্জের মাধ্যমে শিরায় মাদক নেয় তাদের অধিকাংশই যৌনকর্মী। যৌনকর্মী হওয়ার কারণে তার মাধ্যমে এইচআইভি সংক্রমণের ঝুঁকি বেড়ে যাওয়ার আশংকা থাকে। ২০০৯ সালের এমএসটি’র (জাতীয় এইডস/এসটিডি প্রোগাম) পরিসংখ্যান অনুযায়ী বাংলাদেশে ২১ হাজার ৮০০ থেকে ২৩ হাজার ৮০০ ব্যক্তি সিরিঞ্জের মাধ্যমে শিরায় মাদক নেয়। ঢাকায় এর সংখ্যা ৭ হাজার ৪০০।
কেয়ার বাংলাদেশের গ্লোবাল ফান্ড ইনজেকটিং ড্রাগ ইউজার প্রোজেক্ট, এইচআইভি প্রোগ্রামের টেকনিক্যাল কো-অর্ডিনেটর সাকিনা সুলতানা জানান, এইচআইভি সংক্রমণ প্রতিরোধের লক্ষ্যে কেয়ার বাংলাদেশ সিরিঞ্জের মাধ্যমে শিরায় মাদক গ্রহণকারীদের মধ্যে ঝুঁকি হ্রাস কার্যক্রমের আওতায় ডিআইসি (ড্রপ ইন সেন্টার) ভিত্তিক, আউট রিচ এবং অন্যান্য কার্যক্রম পরিচালনা করছে। ডিআইসিভিত্তিক কার্যক্রমের মধ্যে যৌনবাহিত রোগের চিকিৎসা, অ্যাবসেস ম্যানেজমেন্ট, কাউন্সিলিং, সচেতনতামূলক সেশন, রেফারেল সার্ভিস, বিনোদনমূলক কার্যক্রমসমূহে টেলিভিশন দেখা, পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা, গোসল ও বিশ্রামের সুব্যবস্থা, ক্যারাম, লুডু ও দাবা খেলার সুব্যবস্থা, পত্র-পত্রিকা পড়ার সুব্যবস্থা এবং ওএসটি কার্যক্রম রয়েছে। আউটরিচ সুই-সিরিঞ্জ ও কনডম বিতরণ, সচেতনতামূলক সেশন (একক ও দলীয়), যৌনবাহিত ও অ্যাবসেস ম্যানেজমেন্টের জন্য রেফারেল সার্ভিস এবং অন্যান্য কার্যক্রমের মধ্যে রয়েছে বিভিন্ন স্টেকহোল্ডারের সঙ্গে অ্যাডভোকেসি, মাদক নিরাময় ও পুনর্বাসন কেন্দ্র ইত্যাদি।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর মেডিক্যাল কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ের অবসরপ্রাপ্ত ভাইস চ্যান্সেলর এবং ভাইরোলজি বিভাগের অধ্যাপক ডা. নজরুল ইসলাম বলেন, যারা সিরিঞ্জের মাধ্যমে শিরায় মাদক নেন তারা একা মাদক নেন না। দুই/ পাঁচ/সাত জন অথবা এরও বেশি লোক গোল হয়ে বসে একটি আসরের পরিবেশ সৃষ্টি করে। একই সুই সিরিঞ্জ দিয়ে একজন আরেকজনকে পুশ করে। এভাবে একই সুই সিরিঞ্জ দিয়ে বহুজনে শিরায় মাদক নেয়। কাজেই তাদের মধ্যে জনসচেতনতা সৃষ্টির জন্যে বিনা মূল্যে সিরিঞ্জ, কনডম দিলেই যে তারা তা মেনে চলবে এমন নিশ্চয়তা নেই। একজন একটা সিরিঞ্জ ব্যবহার করছে কিনা তা মনিটরিং করা দরকার। সিরিঞ্জের মাধ্যমে অনেক ভাইরাস ছড়ায়। এর মধ্যে হেপাটাইসিস সি ভাইরাস ছড়ানোর মাত্রা শতকরা ৭৮ থেকে ৮০ ভাগ। এছাড়া স্বামীর দ্বারাই আমাদের দেশের মেয়েদের এইচআইভি সংক্রমণের হার বেশি। একজন নারীর মধ্যে এইচআইভি’র জীবাণু ধরা পড়লে তার স্বামীকেও পরীক্ষা করা হয়। পরীক্ষায় দেখা গেছে, তার স্বামী আগে থেকেই এইচআইভির জীবাণু বহন করছে।
সূত্র - দৈনিক যুগান্তর

