হঠাৎ করে চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ (চমেক) হাসপাতালের হৃদরোগ বিভাগে রোগী বেড়ে গেছে। করোনারি কেয়ার ইউনিট (সিসিইউ) ও পোস্ট করোনারি কেয়ার ইউনিটে (পিসিসিইউ) ৮৩ শয্যার বিপরীতে গতকাল বুধবার সকালে রোগী ভর্তি ছিলেন ২১৬ জন। শয্যার অভাবে ১৩৩ রোগী মেঝেতে চিকিৎসাধীন আছেন। মঙ্গলবার রাত সাড়ে ১১টা থেকে বুধবার সকাল ১১টা পর্যন্ত মারা গেছেন চারজন।
চিকিৎসকরা জানান, মঙ্গলবার সকাল ৮টা থেকে বুধবার সকাল ৮টা পর্যন্ত সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় চমেক হাসপাতালের হৃদরোগ বিভাগে চিকিৎসাধীন ছিলেন ২১৬ জন। এর মধ্যে সিসিইউতে ১৬ শয্যার বিপরীতে ১৮ জন এবং পিসিসিইউতে ৬৭ শয্যার বিপরীতে ১৯৮ জন ভর্তি হন। ১৯৯০ সালের মাঝামাঝি সময়ে আলাদাভাবে এই বিভাগ চালু হওয়ার পর ২৪ বছরের মধ্যে গত ২৪ ঘণ্টায় সর্বোচ্চ রোগী চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
এ প্রসঙ্গে চমেক হাসপাতালের হৃদরোগ বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডা. এ কে এম মনজুর মোরশেদ গতকাল কালের কণ্ঠকে বলেন, 'শীতকালে সাধারণত রোগী কম থাকে। কিন্তু হঠাৎ করে কী কারণে হৃদরোগী বেড়ে গেছে তা বলতে পারছি না। আমাদের ওয়ার্ডের দুটি ইউনিটে ৮৩টি শয্যা আছে। এখানে প্রতিদিন গড়ে ১৬০/১৭০ জন রোগী থাকেন। কিন্তু কয়েকদিন ধরে বাড়তে বাড়তে বুধবার সকালে সর্বোচ্চ ২১৬ জন রোগী ছিলেন। শয্যার অভাবে বেশির ভাগ রোগীকে মেঝেতে চিকিৎসা নিতে হচ্ছে। কিন্তু কোনো রোগী চিকিৎসা সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন না।'
হাসপাতাল সূত্র জানায়, ১২ নম্বর হৃদরোগ বিভাগে গত ১০ জানুয়ারি সিসিইউতে ১৭ জন ও পিসিসিইউতে ১৩৪, ১১ জানুয়ারি সিসিইউতে ১২ জন ও পিসিসিইউতে ১৬৮, ১২ জানুয়ারি সিসিইউতে ১৩ জন ও পিসিসিইউতে ১৪৫, ১৩ জানুয়ারি সিসিইউতে ১৩ জন ও পিসিসিইউতে ১৪৯, ১৪ জানুয়ারি সিসিইউতে ২০ জন ও পিসিসিইউতে ১৫৫ রোগী চিকিৎসাধীন ছিলেন। তাদের মধ্যে ১০ জানুয়ারি ২ জন, ১১ জানুয়ারি ৪, ১২ জানুয়ারি ৩, ১৩ জানুয়ারি ৯ জন এবং মঙ্গলবার রাত সাড়ে ১১টায় বোয়ালখালী উপজেলার হালিমা বেগম (৫৫), রাত ২টা ২০ মিনিটে চন্দনাইশের রাবেয়া বেগম (৬৫), রাত ৩টা ১০ মিনিটে নগরীর পতেঙ্গা এলাকার জয়নাল আবেদীন (৫৫) এবং গতকাল বুধবার সকাল ১১টায় খুলশী এলাকার জামালউদ্দিন (৫০) নামে রোগীরা মারা গেছেন।
জানা গেছে, বুধবার বেলা আড়াইটা পর্যন্ত ৫৫ রোগী সুস্থ হয়ে ছাড়পত্র নিয়ে হৃদরোগ বিভাগ ত্যাগ করেন। এছাড়া সকাল ৮টা থেকে বেলা ৩টা পর্যন্ত সিসিইউতে ১৫ রোগী ভর্তি হয়েছেন। এ সময়ে এই ইউনিটে চিকিৎসাধীন ছিলেন প্রায় ৩০ জন রোগী।
গতকাল দুপুরে সরেজমিন দেখা গেছে, সিসিইউতে বেশির ভাগ রোগী ফ্লোরে চিকিৎসা নিচ্ছেন। বাঁশখালীর রত্নপুর এলাকা থেকে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মো. আবু তৈয়ব (৪৫) ১১ ও ১২ নম্বর বেডের মাঝামাঝি ফ্লোরে একটি বিছানায় চিকিৎসা নিচ্ছেন। তার ছেলে আজগর চৌধুরী বলেন, 'বুধবার সকাল ১০টায় ভর্তি করেছি বাবাকে। এখনো শয্যা পাইনি। বাবার আগে হার্টের সমস্যা ছিল। বাড়িতে হঠাৎ করে বুকব্যথা, শ্বাসকষ্ট বেড়ে গেলে এখানে নিয়ে আসি।' এছাড়া আনোয়ারা মোহছেন আউলিয়া এলাকা থেকে আসা আজমা খাতুন (৫০), পটিয়া থেকে জোহুরা বেগম (৫৫)সহ আরো ১২/১৫ জন রোগী সিসিইউতে ফ্লোরে চিকিৎসা নিচ্ছেন। নগরীর পাথরঘাটা এলাকা থেকে অর্ধেন্দু ভট্টাচার্য (৭০) নামের এক রোগী ৬ নম্বর বেডে ভর্তি হয়েছেন মঙ্গলবার রাত সাড়ে ১০টায়।
গতকাল হাসপাতালের অত্যন্ত স্পর্শকাতর এই ওয়ার্ডটি ঘুরে কিছু অনিয়মও চোখে পড়েছে। রোগীর পাশে কোনো অবস্থাতে একজনের বেশি স্বজন থাকার নিয়ম না থাকলেও একেকজনের পাশে ৩/৪ জন করে দেখা যায়। রোগীর শয্যায় স্বজনরা বসে আছেন। মোবাইল ফোন ব্যবহার নিষেধ থাকলেও তা কেউ মানছেন না। আস্তে কথা বলার নিয়ম থাকলেও সিসিইউ ও পিসিসিইউতে উচ্চস্বরে কথা বলা ও চিৎকারে চিকিৎসা সেবার কিছুটা ব্যাঘাত ঘটছে। এ দুটি ইউনিটে প্রবেশের পথে কোনো প্রহরী না থাকায় হু হু করে স্বজনরা প্রবেশ করছেন।
হৃদরোগ বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. ইব্রাহিম চৌধুরী ও সহকারী অধ্যাপক ডা. প্রবীর কুমার দাশ জানান, এমনিতে রোগীর প্রচণ্ড চাপ। তার ওপর এত বেশি এটেনডেন্ট আসছে তাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। ওয়ার্ডে যারা ভর্তি হন তারা প্রয়োজনীয় চিকিৎসা পাচ্ছেন।
তারা বলেন, 'শুধু শীতের প্রকোপের কারণে হৃদরোগী বাড়ছে না। শীতের পাশাপাশি বুকব্যথা, হার্ট অ্যাটাকসহ বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে রোগীরা ওয়ার্ডে আসছেন। ৫০ থেকে ৬০ বছরের বয়সী বেশি রোগী। অবরোধের কারণে যেসব রোগী দূর-দূরান্ত থেকে আসতে পারেননি তারাও এখন আসছেন।'
এদিকে হৃদরোগ বহির্বিভাগের আবাসিক চিকিৎসক (আরপি) ডা. মো. রিজোয়ান রেহান বলেন, 'গত কয়েকদিন ধরে হৃদরোগী বেশি আসছে। প্রতিদিন আউটডোর দিয়ে গড়ে ১২/১৫ জন ভর্তি হচ্ছেন। এছাড়া কিছু রোগী প্রাথমিক চিকিৎসা নিয়ে বাড়িও চলে যাচ্ছেন।'
সূত্র - দৈনিক কালের কণ্ঠ

