ময়মনসিংহের ভালুকা উপজেলার মল্লিকবাড়ি ইউনিয়নের ভান্ডাব ধারিয়াপাড়া গ্রামে নজরুল ইসলাম নামের এক পল্লি চিকিৎসক দীর্ঘদিন ধরে ঝুঁকিপূর্ণ চিকিৎসা করে আসছেন। নাকের মাংস বেড়ে যাওয়া (পলিপ) রোগীদের তিন দফা অ্যাসিড প্রয়োগ করে বাড়তি মাংস কেটে ফেলছেন। চিকিৎসাবিজ্ঞানের নিয়মবহির্ভূত এই ঝুঁকিপূর্ণ চিকিৎসার মাধ্যমে দীর্ঘদিন ধরে গ্রামের স্বল্পশিক্ষিত মানুষদের জিমিঞ্চ করে রাখছেন তিনি।
গত শুক্রবার নজরুল ইসলামের বাড়িতে গিয়ে দেখা গেছে, বাড়ির সামনে খোলা জায়গায় কমপক্ষে ২০ জন রোগী অপেক্ষা করছেন। তাঁদের সবাই পলিপ রোগে আক্রান্ত। প্রথম সারির কয়েকটি ওষুধ প্রস্তুতকারক কোম্পানির বিক্রয় প্রতিনিধিরাও সেখানে উপস্থিত রয়েছেন। খোলা আকাশের নিচে প্লাস্টিকের চেয়ারে রোগীদের বসিয়ে লুঙ্গি পরা অবস্থাতেই চিকিৎসায় ব্যস্ত নজরুল ইসলাম। রোগীর নাকে প্রথমে তিনি তুলার মাথায় অ্যাসিড দিয়ে ‘ওয়াশ’ করছেন। রোগী যন্ত্রণায় আর্তনাদ করছে। অ্যাসিড ‘থেরাপি’ শেষে উচ্চমাত্রার অ্যান্টিবায়োটিক ওষুধ লিখে দিচ্ছেন নিজের নামের প্যাডে। রোগীরা জানান, এভাবে পর পর তিন সপ্তাহ চলে অ্যাসিড থ্যারাপি।
গাজীপুরের একটি পোশাক কারখানায় কাজ করেন তাসলিমা আক্তার। তিনি বলেন, এক বছর ধরে তিনি পলিপ রোগে ভুগছেন। তাঁর এক সহকর্মীর কাছ থেকে জেনেছেন, এখানে কম টাকায় এই রোগের চিকিৎসা নিয়ে সুস্থ হওয়া যায়।
তাসলিমার মতো টাঙ্গাইল, শরীয়তপুর, নরিসংদীসহ আশপাশের বিভিন্ন এলাকা থেকে স্বল্পশিক্ষিত রোগীরা চিকিৎসা নিতে এসে নজরুল ইসলামের কাছে জিমিঞ্চ হয়ে পড়েছেন।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, নজরুল ইসলাম পল্লি চিকিৎসক সমিতির আয়োজিত একটি প্রশিক্ষণ কর্মসূচির অধীনে ছয় মাস মেয়াদের একটি প্রশিক্ষণ নিয়েছেন ২০১০ সালে। কিন্তু এর আগে থেকেই তিনি চিকিৎসা দিয়ে আসছেন। মাঝেমধ্যে জটিল রোগীদের অস্ত্রোপচারও করে থাকেন তিনি। নজরুলের চিকিৎসায় সাময়িকভাবে পলিপ রোগীদের নাকের বাড়তি মাংস কমলেও তিন থেকে চার মাস পর আবারও একই রোগ দেখা দেয়। আর এভাবেই দিনের পর দিন তিনি রোগীদের জিমিঞ্চ করে রাখেন।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে স্থানীয় একজন রোগী বলেন, নজরুলের চিকিৎসা নেওয়ার পর তাঁর নাকে ক্ষতের সৃষ্টি হয়। পরে অনেক টাকা ব্যয় করে উন্নত চিকিৎসা নিতে হয়েছে তাঁকে।
ওষুধ কোম্পানির বিক্রয় প্রতিনিধিরা জানান, নজরুল ইসলাম রোগীদের ব্যবস্থাপত্রে দামি ওষুধ লিখে থাকেন। বিক্রির উদ্দেশ্যে তাঁরা নজরুল ইসলামের বাড়িতে উপস্থিত হয়েছেন।
ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের নাক-কান-গলা বিভাগের চিকিৎসা কর্মকর্তা আশিকুর রহমান বলেন, চিকিৎসাবিজ্ঞানে পলিপ রোগের জন্য অ্যাসিড ব্যবহার করার কোনো কথা উল্লেখ নেই। কোনো কারণে অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ হলে ‘কেমিক্যাল কটারি’ করা হয়। তবে এর জন্য অবশ্যই উপযুক্ত উপকরণ ও পরিবেশ প্রয়োজন। খোলা আকাশের নিচে তা কোনোভাবেই সম্ভব নয়।
অ্যাসিড প্রয়োগের কথা অস্বীকার করে নজরুল ইসলাম দাবি করেন, ‘এটা এক প্রকার হারবাল, আমি নিজেই তৈরি করি।’ রোগীদের জিমিঞ্চ করা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘আমি কাউকে ডেকে আনি না। রোগীরা আমার চিকিৎসায় সুস্থ হয় বলেই আসে।’ এ ব্যাপারে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা রয়েছে কি না জানতে চাইলে নজরুল ইসলাম এর উত্তর না দিয়ে পল্লি চিকিৎসক সমিতির প্রশিক্ষণের সনদ দেখান।
ময়মনসিংহের সিভিল সার্জন আ স ম আবদুছ ছামাদ বলেন, ‘বিষয়টি আমার জানা ছিল না। দ্রুত খোঁজ নিয়ে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
সূত্র - প্রথম আলো

