শীতের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে ঠাণ্ডা জনিত সমস্যা। ওষুধের দোকানে তাই বিক্রিও বেড়ে গেছে। শীত মৌসুমে মুড়ি মুড়কির মতো ওষুধ না খেয়ে রোগ এড়াতে একটু সচেতন হোন। এতে বিব্রতকর রোগ গুলো হওয়ার আশঙ্কা কমে যাবে। ওষুধের বিকল্প হিসেবে নিচের পদ্ধতি গুলোয় অভ্যস্ত হলে ঠাণ্ডার রোগ পালাবে এমনিতেই।
বারবার হাত ধোয়া : অধিকাংশ ঠাণ্ডা জনিত ভাইরাস সরাসরি সংস্পর্শে সংক্রমিত হয়। কারও কাছ থেকে এ ভাইরাস গুলো আমাদের নিত্য দিনের ব্যবহার্য জিনিস যেমন_ টেলিফোন, মোবাইল ফোন, কি-বোর্ড ইত্যাদির মাধ্যমে একজন থেকে অন্যজনে ছড়িয়ে পড়ে। এই জীবাণু গুলো মানুষের দেহ ছাড়াও ঘণ্টার পর ঘণ্টা, কখনও কখনও কয়েক সপ্তাহ বেঁচে থাকে। এই সময়ে তাই সারা দিনই কয়েকবার হাত ধুতে হবে। যদি হাত ধোয়ার সুযোগ না থাকে, এক হাত দিয়ে আরেক হাত কয়েক মিনিট ভালো করে ঘষতে হবে।এতেও ঠাণ্ডার জীবাণু কিছুটা দূর হবে।
মুখে হাত দেওয়া যাবে না : ঠাণ্ডা ও ফ্লু ভাইরাস গুলো মানুষের দেহে প্রবেশ করে সাধারণত চোখ, নাক ও মুখ দিয়ে। খেলার ছলে শিশু হাত মুখে পুরে দেয়।হামাগুড়ি দিয়ে বেড়ায় সারা ঘর। একজনের কোল থেকে যায় অন্য কোলে। এভাবেই কোনো এক সময় সংক্রমিত হয়ে পড়ে শিশু। নিজের ও শিশুর ঠাণ্ডা এড়াতে তাই পরিষ্কার নাকরে মুখমণ্ডলে হাত দেওয়া যাবে না।
পানি পান : পানি শরীরের ভেতরকার তন্ত্র গুলোর সুরক্ষায় কাজ করে। শরীর থেকে বের করে দেয় ক্ষতিকর উপাদান। একজন প্রাপ্ত বয়স্ক মানুষের প্রতিদিন আট আউন্স পরিমাণের আট গ্গ্নাস পানীয় দরকার। আমরা কি তা গ্রহণ করছি? এটা কিন্তু সহজেই বোঝা যাবে প্রস্রাবের রঙ দেখে। যদি প্রস্রাবের রঙ পানির মতো হয় তবে ঠিক আছে। যদি গাঢ় হলুদ হয় তাহলে বুঝতে হবে, শরীরে পানির ঘাটতি আছে। তাই পানি পান করতে হবে আরও।
ছেঁক নেওয়া : বিশেষজ্ঞরা এখনও খুব জোর দিয়ে বলতে পারছেন না যে, ছেঁক ঠাণ্ডা প্রতিরোধে কার্যকর। কিন্তু ১৯৮৯ সালে জার্মানির এক গবেষণায় দেখা যায়, যারা সপ্তাহে দুই দিন ছেঁক নেন, অন্যদের তুলনায় তাদের ঠাণ্ডা লাগার প্রবণতা অনেক কম। এর বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা হলো, যখন ছেঁক নেওয়া হয় তখন উচ্চ তাপমাত্রায় গরম বাতাস শ্বাস-প্রশ্বাস প্রক্রিয়ায় দেহের ভেতর প্রবেশ করে। এই তাপমাত্রায় সাধারণত ঠাণ্ডার জীবাণু গুলো বাঁচতে পারে না।
ব্যায়াম নিত্যদিন : হৃৎপিণ্ডের কর্মক্ষমতা বাড়িয়ে দেয় ব্যায়াম। রক্ত চঞ্চল হয়ে ওঠে শরীরে। অক্সিজেন ফুসফুস থেকে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে কোষ থেকে কোষে। শরীরে তৈরি হয় তাপ। সেই সঙ্গে ঘাম। ফলে শরীরে তৈরি হয় ভাইরাস প্রতিরোধী কোষ।
ধূমপান বর্জন : অতিধূমপায়ীদের ঠাণ্ডা জনিত রোগে আক্রান্ত হওয়ার প্রবণতা বেশি থাকে অন্যদের তুলনায়। ধোঁয়া নাসারল্প্রব্দ শুষ্ক করে ফেলে এবং নাকের ভেতরের সিলাগুলো কর্মক্ষমতা হারায়। এই সিলার স্বাভাবিক নড়াচড়ায় ঠাণ্ডার ভাইরাসগুলো নাসারল্প্রব্দ থেকে বেরিয়ে যেতে বাধ্য হয়। কিন্তু ধূমপানের ফলে এই অংশটি দুর্বল হয়ে পড়ায় প্রায় বিনা বাধায় ঠাণ্ডার জীবাণু গুলো ঢুকে পড়ে দেহে। ঠাণ্ডা থেকে বাঁচতে ছাড়তেই হবে ধূমপান।
দই খেতে হবে : দই উপাদেয় খাদ্য তো বটেই, তাকে আরও এক ধাপ এগিয়ে নিয়েছে বেশকিছু গবেষণা। সেখানে বলা হয়, প্রতিদিন অল্প ফ্যাটের এক কাপ দই ঠাণ্ডা সংক্রমণের পরিমাণ কমিয়ে দেয় ২৫ শতাংশ। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, দইয়ে থাকা উপকারী ব্যাকটেরিয়া দেহের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতায় কার্যকর এবং ঠাণ্ডাজনিত রোগের বিরুদ্ধে শক্তি বলয় তৈরি করতে সাহায্য করে।
ঠাণ্ডায় হাড় ব্যথা : বাতাসের আর্দ্রতা এবং আনুষঙ্গিক পরিবেশ শরীরের ছোট-বড় জয়েন্টের ওপর প্রভাব ফেলে। এ সময় শরীরের কোথাও সামান্য আঘাত পেলে তা বেশি অনুভূত হয় এবং যারা আগে থেকেই বাতের ব্যথায় ভুগছেন তাদের ব্যথা বেড়ে যায়।শীতে ব্যথা বাড়ার বেশ কিছু যুক্তি সঙ্গত কারণ রয়েছে। প্রথমত, বাইরের পরিবেশের তাপমাত্রা হ্রাস পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে শরীরের অভ্যন্তরীণ তাপমাত্রাও কমতে থাকে। এজন্য হাত-পা ঠাণ্ডা হয়ে যায়। এ সময় রক্ত মূলত হৃৎপিণ্ড এবং মস্তিষ্কে বেশি প্রবাহিত হয়। এতে জয়েন্ট এবং শরীরের অন্যান্য অংশে, বিশেষত হাতে ও পায়ে রক্ত প্রবাহ কমে যায় এবং সেখানে উষ্ণতা হ্রাস পায়।
দ্বিতীয়ত, শীতে বাতাসের চাপ কমে যায়, এতে ব্যথা বেড়ে যায়। একে বলা হয় প্রেসার ফেনোমেনা। বায়ুচাপ কমে গেলে স্বভাবতই জয়েন্টের ক্ষতি গ্রস্ত কোষ গুলোর প্রশস্ততা বেড়ে যায়, যা জয়েন্টের ভেতরে-বাইরে প্রভাব ফেলে এবং ব্যথা বেড়ে যায়। প্রকৃত অর্থে জয়েন্টে রক্ত প্রবাহ কমে যাওয়া, বাতাসে বায়ুচাপ কম থাকা এবং জয়েন্ট পার্শ্ববর্তী ত্বক শীতল হওয়াই শীতে ব্যথা বেড়ে যাওয়ার মূল কারণ।এ সময় ত্বকের তাপমাত্রা সাধারণত ৭০ থেকে ৮০ ডিগ্রি ফারেনহাইট পর্যন্ত হয়ে থাকে, যা বছরের অন্য সময়ে ৯০ ডিগ্রি ফারেনহাইট বা আরও বেশি থাকে। শীতে ত্বক শীতল থাকায় ব্যথা অনুভবের স্নায়ু গুলো অধিক স্পর্শকাতর থাকে, তাই অল্পতেই বেশি ব্যথা বোধ হয়। যেমন_ একটি ক্রিকেট বল ওপরে ছুড়ে তা আবার মুষ্টিবদ্ধ করতে গরম কালের চেয়ে শীতে বেশি ব্যথা লাগে।
সূত্র – সমকাল.নেট

