২০৩০ সালে বাংলাদেশে ডায়াবেটিস রোগীর সংখ্যা প্রায় তিন কোটি ছাড়িয়ে যেতে পারে । বর্তমানে এই রোগে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ার কারণে সংশ্লিষ্টরা এই আশঙ্কা করছেন।
বারডেম’এর সূত্র এই তথ্য দিয়ে বলেছে, বর্তমানে দেশে প্রায় ৮৪ লাখেরও বেশি ডায়াবেটিসে আক্রান্ত রোগী রয়েছে।
অন্যদিকে বেসরকারি আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থা ‘হেলেন কেলার ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশে’ এর একটি গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয় ‘বাংলাদেশে আগামী ২০৩০ সালের মধ্যে ডায়াবেটিস রোগে আরো এক কোটি নানা বয়সী মানুষ আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।’
বারডেম সূত্র জানায়, আগামী ২০২৫ সালে সারাবিশ্বে ডায়াবেটিক রোগে আক্রান্তের সংখ্যা ৩৮ কোটিতে পৌঁছানোর আশংকা রয়েছে। বর্তমানে বিশ্বে প্রায় ২৫ কোটি নানা বয়সী মানুষ এ রোগে আক্রান্ত।
বারডেমের মহাপরিচালক নাজমুন নাহার জানান, বর্তমানে নগরায়ন এবং পরিবর্তিত জীবনযাপনের জন্য সারা বিশ্বেই ডায়াবেটিক রোগীর সংখ্যা মহামারী আকারে বেড়ে যাচ্ছে। অন্যান্য উন্নয়নশীল দেশের মতো বাংলাদেশে এই রোগ বৃদ্ধির হার বেশি। তবে নারী ও শিশুরা ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। শিশুদের শারীরিক ওজন যেন বৃদ্ধি না পায় তার প্রতি পরিবারের সদস্যদের সর্তক থাকতে হবে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে নিয়মিত খেলাধূলার আয়োজন ও এলাকাভিত্তিক হাঁটা ও ব্যায়ামের চর্চা করলে ডায়াবেটিস রোগ প্রতিরোধ সম্ভব। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে টাইপ-২ ডায়াবেটিস অনেকাংশে প্রায় শতকরা ৬৫ ভাগ প্রতিরোধ করা সম্ভব।
তিনি বলেন, সুষম খাবার গ্রহণ, অতিমাত্রায় কোমল পানীয় ও ফাস্টফুড পরিহার, নিয়মিত ব্যায়াম ও ডাক্তারের পরার্মশমতো চললে এরোগ প্রতিরোধ সম্ভব।
‘বর্তমানে সারাদেশে প্রায় ৮৪ লাখেরও বেশী ডায়াবেটিস রোগী আছে। এরমধ্যে বারডেমের ৬৫ টি জেলা ও উপজেলায় নিবন্ধনকৃত রোগীর সংখ্যা ছয় লাখ। শিশু ডায়াবেটিক রোগীর সংখ্যা শতকরা ২ ভাগ । পূর্বের চেয়ে এর সংখ্যা বাড়ছে’ বলে তিনি জানান।
চিকিৎসকরা জানান, দুই ধরনের ডায়াবেটিস রোগে আক্রান্ত হয় মানুষ। এর মধ্যে বড় একটা অংশ রয়েছে নারী ও শিশু । টাইপ-১ ও টাইপ-২ ধরনের ডায়াবেটিক রোগের মধ্যে বাংলাদেশে টাইপ-২ রোগীর সংখ্যা বেশী । প্রায় শতকরা ৯০ থেকে ৯৫ ভাগ।
দীর্ঘদিন ডায়াবেটিস অনিয়ন্ত্রিত থাকলে ডায়াবেটিক আক্রান্ত রোগীর কিডনি, দৃষ্টি ও শারীরিক সক্ষমতা হ্রাসসহ নানা সমস্যা দেখা দিতে পারে। ডায়াবেটিস রোগের কারণে ডায়াবেটিক রেটিনোপ্যাথিকে চিহ্নিত করা হয়েছে। ডায়াবেটিক অন্ধত্বজনিত রোগটি মূলত ডায়াবেটিস রোগ থেকে হয়। এরফলে চোখের রেটিনার রক্ত কণিকা নষ্ট হয়ে যায়।বাংলাদেশে ডায়াবেটিক রোগীদের শতকরা ৫০ ভাগ রোগীদের মধ্যে ডায়াবেটিক রেটিনোপ্যাথীর রোটির প্রভাব দেখা যায়। সঠিক চিকিৎসা ও পরিচর্যার মাধ্যমে এ রোগ প্রতিরোধ করা যায়। গর্ভকালীন সময়ে অনেক নারী ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হতে পারে।
গর্ভকালীন সময়ে ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণ রাখতে হবে এবং গর্ভবতী মায়ের স্বাস্থ্য রক্ষায় পরিবারের নজরদারিত্ব বাড়াতে হবে।
বারডেমের চক্ষুবিজ্ঞান বিভাগের আবাসিক সার্জন ও সহকারী অধ্যাপক ডা. পূরবী রানী দেবনাথ বলেন, ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে না থাকলে ডায়াবেটিক রেটিনোপ্যাথি বা ডায়াবেটিকজনিত অন্ধত্ব হতে পারে। আক্রান্ত ব্যক্তি তার দৃষ্টি শক্তি চিরদিনের মতো হারিয়ে ফেলতে পারেন।
তিনি বলেন, ডায়াবেটিকে আক্রান্ত রোগীর নিয়মিত চোখের পরীক্ষা করা এবং চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে চললে এ রোগের সংকট থেকে মুক্তি সম্ভব।
বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব হেলথ সায়েন্সর উপাচার্য অধ্যাপক ডা. লিয়াকত আলী বলেন, ডায়াবেটিক রোগ মহামারী আকার ধারণ করতে যাচ্ছে। এখন থেকে সচেতেন না হলে আগামী কয়েকবছরে এটি মহামারী রূপ ধারণ করবে। বাংলাদেশ ডায়াবেটিক রোগের জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থানে রয়েছে । এর মধ্যে নারী ও শিশরাও ঝুঁকিতে রয়েছে। শিশুদের মধ্যে টাইপ-২ ডায়াবেটিস বেড়ে যাচ্ছে ।
ডা. লিয়াকত বলেন, মহামারী আকারের এর রোগ প্রতিরোধে জনসচেতনতা ও ডায়াবেটিস সংক্রান্ত জটিলতা এড়িয়ে যাবার কৌশল জানতে হবে। পাশাপাশি নিয়মিত ব্যয়াম, পুষ্টিকর খাদ্যগ্রহণ, সুস্থ জীবনযাপন পদ্ধতি গ্রহণ ও শিশুসহ সবাইকে স্বাস্থ্যশিক্ষার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে।
হেলেন কেলার ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টার এরিকা রয় বলেন, ডায়াবেটিক ডায়াবেটিক রোগ প্রতিরোধে সরকারে পাশাপাশি বেসরকারি উন্নয়নসংস্থাগুলোও কাজ করছে। তবে অনেকের মনে এ রোগের লক্ষ্মণ নিয়ে অজ্ঞতা ও অস্বচ্ছতা থাকায় অনেকক্ষেত্রে আক্রান্ত ব্যক্তির রোগ সনাক্তকরণ ও রোগ প্রতিরোধ দুষ্কর হয়ে পড়ে।
এরিকা রয় আরো বলেন, ডায়াবেটিক রোগ প্রতিরোধে গণমাধ্যমের সব শাখায় ডায়াবেটিকের নানা কুফল নিয়ে লিফলেট, সচেতনতামূলক নাটিকা ও বিশিষ্ট ব্যক্তিদের দিয়ে বিজ্ঞাপন প্রচার করলে প্রত্যন্ত অঞ্চলসহ দেশের সব স্তরের মানুষের মাঝে সচেতনতা বৃদ্ধি পাবে।
বারডেমে স্বাস্থ্য পরীক্ষা করতে আসা ব্যাংক কর্মকর্তা রুহুল আমিন জানান, ডায়াবেটিক রোগ সম্পর্কে মানুষ এখন সচেতন। প্রতিদিন সকালে পার্ক ও রাস্তায় জনসমাগম দেখা যায়।
তিনি বলেন, ডায়াবেটিস নিয়ে মানুষের মনে নানা কুসংস্কার আছে। জনসচেতনতা বাড়লে এসব কুসংস্কার থাকবে না। মানূষ এ রোগ সম্পর্কে সচেতন হবে। সূত্র: বাসস
সূত্র - natunbarta.com

