সরকারি পর্যায়ে নারী মাদকাসক্তদের জন্য আবাসিক চিকিৎসার ব্যবস্থা নেই। এ ক্ষেত্রে হাতে গোনা কয়েকটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে এমন সেবা থাকলেও তা অপ্রতুল ও ব্যয়বহুল। ১৯৯০ সালের মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন অনুযায়ী, বাধ্যতামূলকভাবে বিনা খরচে মাদকাসক্ত ব্যক্তিদের চিকিৎসা করানোর দায়িত্ব সরকারের। কিন্তু চিকিৎসায় পুরুষের জন্য আবাসিক ব্যবস্থা থাকলেও নারীদের জন্য নেই। এ ছাড়া জেলা অনুযায়ী মাদকাসক্ত ব্যক্তিদের তালিকা তৈরির বিধান থাকলেও তা কাগজে-কলমেই রয়ে গেছে।
মাদকাসক্ত ব্যক্তিদের চিকিৎসায় যুক্ত কয়েকজন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক জানিয়েছেন, নারী মাদকাসক্তের সংখ্যা ক্রমেই বাড়ছে। বিশেষ করে ইয়াবা সেবনকারী নারীদের সংখ্যা বেশি দেখা যাচ্ছে। নারী মাদকাসক্তের সংখ্যার সুনির্দিষ্ট তথ্য না পাওয়া গেলেও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের ধারণা, মোট মাদকাসক্তের ১০ থেকে ১৫ শতাংশই নারী। অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মোহাম্মদ ইকবাল প্রথম আলোকে বলেন, সরকারিভাবে নারী মাদকাসক্তদের আবাসিক চিকিৎসার সুযোগ নেই। তবে কেন্দ্রীয় মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্রে নারীদের জন্য ১০ শয্যার ওয়ার্ড চালুর বিষয়টি পরিকল্পনায় রয়েছে।
রাজধানীর তেজগাঁওয়ে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর প্রাঙ্গণে কেন্দ্রীয় মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্রে মোট শয্যাসংখ্যা ৪০। ২০১২ সালে এ কেন্দ্রের বহির্বিভাগে এক হাজার ৬৫৯ জন রোগীর মধ্যে নারী ছিলেন মাত্র পাঁচজন। এ ছাড়া একই প্রাঙ্গণে ২৫০ শয্যার আরেকটি মাদকাসক্তি নিরাময় ও পুনর্বাসন কেন্দ্রের অবকাঠামো তৈরি শেষ হলেও সেখানে জনবল নিয়োগ হয়নি। নারীদের জন্য আলাদা জনবলও চাওয়া হয়নি। আর চট্টগ্রাম, রাজশাহী ও খুলনায় একটি করে আঞ্চলিক নিরাময় কেন্দ্র রয়েছে। এর প্রতিটিতে পাঁচটি করে শয্যা রয়েছে। তবে খুলনার কেন্দ্রটি ২০০৯ সাল থেকে বন্ধ। এসব কেন্দ্রের কোনোটিতেই নারীদের জন্য আবাসিক চিকিৎসার সুযোগ নেই। কেবল বহির্বিভাগে সেবা দেওয়া হয়।
১৯৯১ সাল থেকে কুমিল্লা, যশোর ও রাজশাহী কেন্দ্রীয় কারাগার হাসপাতালে মাদকাসক্ত ব্যক্তিদের চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। ভুক্তভোগী কয়েকটি পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, অনেক সময় লজ্জা এবং সামাজিকতার কারণে নারী মাদকাসক্ত ব্যক্তিদের লুকিয়ে রাখা হয়। মাদকাসক্তদের আবাসিক চিকিৎসার গুরুত্ব সম্পর্কে জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক তাজুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, অজু করা ছাড়া যেমন নামাজ আদায় করা যায় না, তেমনি মাদকাসক্তদেরও দেহ ও মন থেকে মাদকের বিষ নিষ্ক্রিয় না করা পর্যন্ত চিকিৎসা শুরু করা সম্ভব নয়। অন্যান্য রোগে অনাবাসিক চিকিৎসা নিয়ে রোগী ভালো হয়, কিন্তু মাদকাসক্তদের ক্ষেত্রে তা প্রায় অসম্ভব।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর সূত্র বলছে, বেসরকারি পর্যায়ে ২০টি জেলায় লাইসেন্সপ্রাপ্ত ৬৯টি মাদকাসক্তি নিরাময় ও পুনর্বাসন কেন্দ্রে মোট শয্যা ৮৭৫টি। ৪৪টি জেলায় সরকারি বা বেসরকারি পর্যায়ে কোনো নিরাময় কেন্দ্র নেই। ২০০৯ সাল থেকে মানিকগঞ্জে আসক্তি পুনর্বাসন নিবাস ‘আপন’ নারী মাদকাসক্তদের চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা করেছে। কেন্দ্রে ২৫ জন নারীর আবাসিক সুবিধা আছে। চলতি মাসে ১৩ থেকে ৩৯ বছর বয়সী মোট ১৫ জন নারী চিকিৎসাধীন। গত বছর এ কেন্দ্র থেকে ৬০ জন নারী চিকিৎসাসেবা নিয়েছেন।
আপনের কাউন্সেলর খন্দকার আসাদুজ্জামান প্রথম আলোকে বলেন, অপুষ্টির চিকিৎসা, ব্যায়াম, খেলাধুলা, মানসিক আচরণ পরিবর্তনসহ একটি নিয়মের মধ্যে এনে সমন্বিতভাবে জীবনমুখী চিকিৎসা দিতে হয় মাদকাসক্ত ব্যক্তিদের। সুইয়ের মাধ্যমে মাদক গ্রহণ করেন, এমন নারীদের চিকিৎসা করছে কমিউনিটি হেলথ রিহ্যাবিলিটেশন, এডুকেশন অ্যান্ড অ্যাওয়ারনেস (ক্রিয়া)। ক্রিয়ার প্রধান নির্বাহী তরুণ কান্তি গায়েন জানান, কেন্দ্রে মাসে ২০ থেকে ৩০ জন ছিন্নমূল নারী চিকিৎসার জন্য আসেন।
উত্তরার বেসরকারি মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্র লাইট হাউস ক্লিনিকের সহকারী ব্যবস্থাপক তানভীর আহাদ প্রথম আলোকে বলেন, ৬০ শয্যার এ ক্লিনিকে সাত থেকে আটটি শয্যা নারীদের জন্য বরাদ্দ। এ কেন্দ্রটিতে মূলত উচ্চবিত্ত পরিবারের নারীরা আসছেন।
সূত্র - প্রথম আলো

