দুই বছরের শিশুকে কোলে নিয়ে বিমর্ষ চেহারায় হাসপাতাল ত্যাগ করছিলেন এক দম্পতি। তাদের দুই বছর বয়সী সন্তান সাদ্দাম স্নায়ুরোগে আক্রান্ত। শরীর হঠাৎ করেই ঝাঁকি দিয়ে বাঁকা হয়ে যায়। আবার সোজা হয়। তাড়াহুড়া করে ছেলেকে নিয়ে এসেছিলেন রাজধানীর মুগদা ৫০০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালে। হাসপাতালের নিউরোলজি বিভাগের চিকিৎসক পরামর্শ দেন, ঢাকা মেডিকেল কলেজ বা অন্য কোথাও ভর্তি করাতে। ওই সন্তানের পিতা কমলাপুর এলাকার ব্যবসায়ী আবদুর রহিম ক্ষোভের সঙ্গে বলেন, ‘এই হাসপাতালে আইসা কোন লাভ নাই। এটা নামে এবং দেখতে বড়, কাজে বড় না।’ বিষয়টি স্বীকার করেছেন হাসপাতাল কর্তৃপক্ষও। চিকিৎসা সরঞ্জামের অভাবে গুরুতর রোগীদের সেবা দিতে পারছেন না হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। চিকিৎসকসহ অন্যান্য জনবলেরও অভাব রয়েছে এই হাসপাতালে। গুরুতর কোন অসুখ নিয়ে রোগীরা এই হাসপাতালমুখী হন না। ৫০০ শয্যার এই হাসপাতালে দৈনিক ভর্তি হন না ১০ জন রোগীও। এখানে হয় না কোন অপারেশন। অথচ সঠিক ব্যবস্থাপনা থাকলে এটি হতো রাজধানীর পূর্বাঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ চিকিৎসা কেন্দ্র। সংসদ নির্বাচনের পূর্বে গত বছরের ১৯শে জুলাই তাড়াহুড়ো করে হাসপাতালটি উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী। ২০০৬ সালের ১৩ই জুলাই প্রায় ১০ একর ভূমিতে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া এর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছিলেন। ১১০ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মাণ করা হয়েছে ১৩ তলাবিশিষ্ট এই হাসপাতাল। অনেক হাঁকডাক করে এটি উদ্বোধন করা হলেও বাস্তবে রোগীদের সেবা দেয়ার মতো সক্ষমতা নেই হাসপাতালটির। বিশাল ভূমি ও ভবন থাকলেও মূলত এটি অন্তঃসারশূন্য। এই ৫০০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালে খাতাকলমে ২১টি বিভাগ আছে। কিন্তু গতকাল সরজমিন দেখা গেছে, পুরো হাসপাতালের মাত্র নয়টি শয্যায় রোগী ভর্তি আছেন। এর মধ্যে শিশু বিভাগে পাঁচ এবং মেডিসিন ওয়ার্ডে চার জন। বাকি বিভাগগুলো শূন্য। পরিষ্কার-পরিচ্ছন কক্ষগুলোতে সাজানো রয়েছে একের পর এক শয্যা। কর্মহীন অলস সময় কাটাচ্ছেন কর্তব্যরত নার্স ও অন্যরা। শিশু বিভাগে একই স্থানে ছয় জন নার্স আড্ডা দিচ্ছিলেন। রোগী না থাকায় এভাবেই গল্প-আড্ডায় সময় কাটান তারা। রোগীরা জানান, হাসপাতালে চিকিৎসার যন্ত্রপাতি না থাকায় এখানে ভর্তি হওয়ার সুযোগ নেই। কার্ডিলজি বিভাগের চিকিৎসকের কাছে এসেছিলেন মুগদা এলাকার নাজমা বেগম (৪৫)। স্লিপ হাতে ২২২ নম্বর কক্ষে দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়েছিলেন তিনি। ওই রুমে চিকিৎসক না থাকায় ২১৯ নম্বর কক্ষে ডা. রোকনুজ্জামানের কাছে যান নাজমা। চিকিৎসক তাকে ওষুধ লিখে দিয়েছেন। বলেছেন, প্রয়োজন হলে অন্য কোন হাসপাতালে ভর্তি হতে হবে। অন্য হাসপাতালে ভর্তির পরামর্শের কারণ অনুসন্ধানে জানা গেছে, এই ৫০০ শয্যার জেনারেল হাসপাতালে নেই কার্ডিওলজি মনিটর। রক্তচাপ নির্ণয় ও হৃদস্পন্দনের চিত্র দেখার মতো গুরুত্বপূর্ণ এই যন্ত্রটি না থাকায় হাসপাতালের কার্ডিওলজি বা হৃদরোগ বিভাগটি কার্যত অচল। হাসপাতালের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ নিবিড় পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র (আইসিইউ) এবং সিসিইউ বিভাগ বন্ধ। বিশালাকারের এই হাসপাতালে হয় না কোন অপারেশন। অপারেশন না হওয়ার কারণ এখানে এনেসথেসিয়ার কোন চিকিৎসক নেই। চোখ পরীক্ষা-নিরীক্ষা করার মতো কোন যন্ত্রপাতি নেই হাসপাতালে। তবে আছে চক্ষু বিভাগ ও এই বিভাগের চিকিৎসক। যন্ত্রপাতি না থাকায় চক্ষু ওয়ার্ডে কোন রোগী ভর্তি হন না। বহির্বিভাগেও চক্ষু রোগীর সংখ্যা অত্যন্ত কম। তবে মাঝে মাঝে শিশু, মেডিসিন এবং গাইনি ও প্রসূতি ওয়ার্ডে রোগীরা ভর্তি হন। সাধারণত দরিদ্র পরিবারের রোগীরা নিরুপায় হয়েই এখানে ভর্তি হন। তাদের সংখ্যা হাতেগোনা। জরুরি বিভাগেও সামান্য কাটা-ছেঁড়া ছাড়া উল্লেখযোগ্য কোন রোগী যান না। পরিদর্শনের দিন দুপুরে জরুরি বিভাগে কোন চিকিৎসককে পাওয়া যায়নি। সেখানে দায়িত্ব পালন করছিলেন চতুর্থ শ্রেণীর কর্মচারী আনোয়ার। তিনি জানান, রোগী খুব কম আসে এখানে। তাই চিকিৎসক সব সময় থাকেন না। জনবল সম্পর্কে হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, হাসপাতালের চিফ কনসালটেন্ট আট জনের পদই শূন্য। কনসালটেন্ট ২৪ জনের মধ্যে আছেন মাত্র নয় জন। তবে বিভাগীয় চিকিৎসক আছেন আট জন। মেডিকেল অফিসার আছেন ৪০ জন। সহকারী রেজিস্টার্ড ১৬ জন। নার্স রয়েছেন ১৯৫ জন। চতুর্থ শ্রেণীর কর্মচারী আছেন ১৩৯ জন। প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সরঞ্জামের অভাবে রাজধানীর বুকের বহুতল ভবনের এই হাসপাতালে সেবা দিতে বিব্রত হচ্ছেন চিকিৎসকরা। তবে কয়েক মাস আগে প্যাথলজি পরীক্ষাও হতো না এখানে। এখন তা হচ্ছে বলে জানান হাসপাতালের পরিচালক ডা. মুহাম্মদ মুস্তাফিজুর রহমান মিয়া। তিনি বলেন, আস্তে আস্তে সবই হবে। হাসপাতালটি পূর্ণাঙ্গভাবে চালু করতে পারলে স্বাস্থ্য সেবা পাবে রাজধানীর দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের মানুষ। চাপ কমবে ঢাকা মেডিকেলসহ অন্যান্য সরকারি হাসপাতালের।
সূত্র - দৈনিক মানবজমিন

