হাত বাড়ালেই কালোবাজারে সহজেই পাওয়া যাচ্ছে বিষাক্ত ফরমালিন। অসৎ ব্যবসায়ীরা বাড়তি মুনাফার লোভে খাদ্যপণ্যে এ বিষ ছড়িয়ে দেন। মানুষের মরদেহ বা লাশ, ব্যাক্স, পশু-পাখি ও সাপ হিমাগারে রাখতে ব্যবহার করা হয় ফরমালিন। বিভিন্ন পরীক্ষাগার, হাসপাতাল, ওষুধ তৈরি ও চামড়াশিল্পে ফরমালিনের ব্যবহার হচ্ছে। জনস্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর এ ফরমালিন আমদানি, ক্রয়-বিক্রয় ও ব্যবহারে নিয়ন্ত্রণ না থাকায় অসাধু ব্যবসায়ীরা খাদ্যপণ্য দীর্ঘদিন সতেজ রাখতে ব্যবহার করছেন। ফলে কম-বেশি অধিকাংশ খাদ্যপণ্যের সঙ্গেই ফরমালিনের বিষ খাচ্ছে মানুষ।
ফরমালিনে ক্ষতিকারক বিষক্রিয়া : বাংলাদেশ বিজ্ঞান ও শিল্প গবেষণা পরিষদের (বিসিএসআইআর-সংক্ষেপে সায়েন্স ল্যাবরেটরি) খাদ্য বিজ্ঞান প্রযুক্তি ইনস্টিটিউটের ঊর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা আবু তারেক মোহাম্মদ আবদুল্লাহ বাংলাদেশ প্রতিদিনকে জানান, ফরমালিন হলো ৩৭ ফরমাল ডিহাইড সলিউশন জাতীয় তরল পদার্থ। এটা এক ধরনের প্রিজারভেটিভ, যা ব্যবহার করা হয় পশুর চামড়া, মানুষের লাশ, মৃত পশুপাখি ও সাপের জন্য। পাশাপাশি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর বিজ্ঞানাগারেও ফরমালিনের ব্যবহার হয়। তবে জনস্বাস্থ্যের জন্য ফরমালিনের রয়েছে ভয়াবহ ক্ষতিকারক বিষক্রিয়া।
ফরমালিনের ব্যবহার যেখানে : ফরমালিন ব্যবহারের বিধিবিধান মানা হচ্ছে না। অসাধু ব্যবসায়ীরা তাদের পচনশীল খাদ্যপণ্য সতেজ রাখতে মাছ, তরিতরকারি, ফল ইত্যাদিতে ফরমালিন মেশান। ফলে পচনশীল খাদ্যপণ্য অনেক দিন তাজা দেখায়। বাজারের আমদানি করা আপেল, আঙ্গুরসহ অধিকাংশ পণ্যে ফরমালিন মেশানো হয়। ফলে সবচেয়ে বেশি পচনশীল আঙ্গুরও দীর্ঘদিন পচে যায় না। মাছের পচন রোধ করতেও ফরমালিন মেশানো হয়। সচেতনতার অভাবে মানুষ উচ্চমূল্যে এ ফরমালিন বিষ কিনে খাচ্ছে।
শাস্তির আওতায় আনতে হবে : অনুসন্ধানে জানা গেছে, অসাধু ব্যবসায়ীরা বিভিন্ন পচনশীল খাদ্যপণ্যে সারা বছরই ফরমালিনের ব্যবহার করছেন। বাংলাদেশ শিল্প ও বণিক সমিতি ফেডারেশনের (এফবিসিসিআই) সহ-সভাপতি মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন বলেন, অবাধ আমদানির কারণে হাত বাড়ালেই ফরমালিন পাওয়া যাচ্ছে। তবে যৌক্তিক কারণ ছাড়া কারও কাছে ফরমালিন পাওয়া গেলে তাকে শাস্তির আওতায় আনতে হবে। প্রস্তাবিত আইনটি পাস হলে ফরমালিনের অপব্যবহার নিয়ন্ত্রণ করা যাবে বলে মনে করেন তিনি।
'ফরমালিনমুক্ত বাজার' হয়নি : এর আগে এফবিসিসিআই ঘোষণা দিয়েছিল, ২০১৩ সালের মার্চে রাজধানী এবং ওই বছরের শেষ দিকে সারা দেশের বাজার ফরমালিনমুক্ত করা হবে। সংগঠনটি নগরীর কাঁচাবাজারগুলোয় ফরমালিন ডি-হাইড্রেড মেশিন স্থাপনের মাধ্যমে 'ফরমালিনমুক্ত বাজার' গঠনের কাজ করছে। তবে এফবিসিসিআইর ঘোষণা অনুযায়ী দেশের সব বাজার এখনো ফরমালিনমুক্ত হয়নি। এদিকে সরকারি মান নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠান বিএসটিআই মাঝেমধ্যে ফরমালিন মেশানো খাদ্যপণ্য ধরতে মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করলেও বন্ধ হয়নি খাদ্যপণ্যে ফরমালিনের ব্যবহার। এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশনের (বিএসটিআই) পরিচালক ড. সৈয়দ হুমায়ুন কবির বাংলাদেশ প্রতিদিনকে জানান, বাংলাদেশে ব্যাপকহারে ফরমালিন আসছে। ফরমালিন আমদানিতে কারও নিয়ন্ত্রণ নেই। আমদানি নিয়ন্ত্রণ করে ফরমালিনের অপব্যবহার কমাতে হবে। জানা গেছে, ফরমালিনের অপব্যবহার নিয়ন্ত্রণ করতে আমদানি পর্যায়ে শর্তারোপ করেছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। এ জন্য দেশে কারা ফরমালিন আমদানি করছে, কী পরিমাণে আমদানি হচ্ছে, তা তদারকি করা হচ্ছে। এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সচিব মাহবুব আহমেদ জানান, ফরমালিন এখন অনেকটা নিয়ন্ত্রণে এসেছে। প্রস্তাবিত আইনটি পাস হলে ফরমালিনের ব্যবহারের ওপর আরও নিয়ন্ত্রণ আসবে। তবে ভোক্তাদের সচেতনতাও জরুরি। শুল্ক বিভাগের তথ্যে জানা যায়, গত তিন অর্থবছরে ফরমালিন আমদানি কমলেও আমদানিকারকের সংখ্যা বেড়েছে। ২০০৯-১০ অর্থবছরে ২২টি প্রতিষ্ঠান ৫ লাখ ৪৪ হাজার ৮৪৬ কেজি ফরমালিন এনেছে। ২০১০-১১ সালে ২৩ প্রতিষ্ঠান ২ লাখ ৬৯ হাজার ৩৩২ কেজি ফরমালিন আনে। ২০১১-১২ সালে ২৮ প্রতিষ্ঠান ২ লাখ ৫ হাজার ৯৬ কেজি ফরমালিন আমদানি করে। তবে এ ফরমালিনের যথাযথ ব্যবহার নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সরকারি নিয়ম-নীতি না থাকায় ফরমালিনের অপব্যবহার হচ্ছে। ফলে ৬০ টাকা কেজির ফরমালিন এখন বিক্রি হচ্ছে ২ হাজার টাকায়।
সূত্র - দৈনিক বাংলাদেশ প্রতিদিন

