আট বছর ধরে বুড়িগঙ্গা নদীতে গোসল করেন হেলাল উদ্দিন (৪৪)। বুড়িগঙ্গাপাড়ের কেরানীগঞ্জের ইস্পাহানী নদীধারা এলাকার এই বাসিন্দা বলছিলেন, বর্ষার সময় নদীর পানি কিছুটা পরিষ্কার থাকে। তখন নদীতে গোসল করা যায়। কয়েক মাস ধরে নদীর পানি কালচে ও দুর্গন্ধ হয়ে গেছে। প্রতিবছর এ সময় এমন হয়। কিন্তু এবার নদীর অবস্থা খুবই খারাপ।
পরিবেশবাদী সংগঠন পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলন (পবা) সূত্রে জানা যায়, রাজধানী ও এর আশপাশের প্রায় দেড় কোটি মানুষের মলমূত্রসহ বিভিন্ন কল-কারখানা ও গৃহস্থালির ১০ হাজার ঘনমিটারের বেশি বর্জ্য প্রতিদিন বুড়িগঙ্গায় নিক্ষিপ্ত হচ্ছে, যার ৬০ শতাংশই অপরিশোধিত। সদরঘাট থেকে দেশের ৩৯টি নৌপথে চলাচলকারী চার শতাধিক নৌযান বুড়িগঙ্গা নদীতে বছরে ১ দশমিক ৭০ থেকে ২ দশমিক ৪০ বিলিয়ন টন বর্জ্য ফেলায় টনে টনে রাসায়নিক পদার্থ পলি নদীর তলদেশে জমা হচ্ছে। আর এসব কারণে বুড়িগঙ্গা দূষিত হয়ে যাচ্ছে।
কোনো কোনো এলাকায় এ দূষণের মাত্রা এতই বেশি যে সেখান দিয়ে নদীপথে চলাচলকারী হাজার হাজার যাত্রীকে প্রতিদিন নাকে-মুখে রুমালচাপা দিয়ে নদী পার হতে দেখা যায়।
মান্দাইল খালঘাট এলাকার গৃহবধূ সোহাগী বেগম জানান, বর্ষার সময় নদীতে থালাবাসন ধোয়া যেত। এখন নদীর যে অবস্থা তাতে থালাবাসন ধোয়া দূরের কথা, দুর্গন্ধে পানির কাছেও যাওয়া যায় না।
নদীপাড়ের শিল্পকারখানাগুলো থেকে অপরিশোধিত বর্জ্য বুড়িগঙ্গার দূষণের একটি বড় কারণ। পরিবেশবাদীদের অনেকেই অভিযোগ করেন, এসব কারখানায় শোধনযন্ত্র (ইটিপি) নেই।
কেরানীগঞ্জ ওয়াশিং ডায়িং ফ্যাক্টরি মালিক সমিতির সাবেক সভাপতি আমান উল্লাহ জানান, তাঁদের সমিতির আওতায় ৮০টি কারখানা আছে। তিনি স্বীকার করেন, ইটিপি স্থাপন করতে যে পরিমাণ জায়গা দরকার, সে পরিমাণ জায়গা কারখানাগুলোতে নেই। পবা তাদের এক সাম্প্রতিক জরিপে বলেছে, নদীর পানিতে দ্রবীভূত অক্সিজেনের (ডিও) মাত্রা এখন শূন্যের নিচে। পবা গত বছরের জুন থেকে প্রতি মাসে বুড়িগঙ্গার পানির মান পরীক্ষা করেছে বলে সংগঠনটির সাধারণ সম্পাদক আবু নাসের খান জানিয়েছেন। পবা ২০ মার্চ বুড়িগঙ্গার ছয়টি স্থানে পানি পরীক্ষা করে দেখেছে। কোথাও ডিওর পরিমাণ শূন্যের ওপরে ওঠেনি।
এ জরিপ অনুযায়ী, নদীর চাঁদনীঘাটে গত ফেব্রুয়ারিতে ডিওর পরিমাণ ছিল প্রতি লিটারে ০.৩২ মিলিগ্রাম। মার্চে একই জায়গার ডিওর পরিমাণ কমে দাঁড়ায় ০.২৭ মিলিগ্রাম। পরিবেশ সংরক্ষণ আইন অনুযায়ী, প্রতি লিটার পানিতে ডিওর পরিমাণ ৫ মিলিগ্রাম হওয়া উচিত।
নদীদূষণে আক্রান্ত হচ্ছে সাধারণ মানুষ। জিনজিরা শামসুল্লাহ ঘাটের মাঝি খলিল মিয়া (৫২) জানান, বুড়িগঙ্গায় গোসল করতে গেলে গা চুলকায়। তা ছাড়া কয়েক দিন ধরে তাঁর বাঁ চোখে চুলকানি ও চোখ লাল হয়ে গেছে। ডাক্তারের কাছে গেলে ডাক্তার চোখের ড্রপ ব্যবহার করতে বলেছেন।
স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ ও মিটফোর্ড হাসপাতালের চর্ম ও যৌনরোগ বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মো. আকরাম হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, পানিবাহিত রোগীর সংখ্যা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। বর্তমানে অ্যাজমা ও ছত্রাকজনিত রোগে আক্রান্ত রোগীরা বেশি আসছে। তবে অ্যাজমা রোগীর সংখ্যা বেশি। তিনি আরও বলেন, প্রতিদিন গড়ে দুই শতাধিক চর্মরোগী চিকিৎসা নিতে আসে।
সূত্র - প্রথম আলো

