রাজধানীর মহাখালী বক্ষব্যাধি হাসপাতালের গেটে চিশতিয়া হোটেলের দোতলায় ডক্টরস চেম্বার নামে ১৮ শয্যা বিশিষ্ট একটি ভুয়া ক্যান্সার হাসপাতালের সন্ধান পেয়েছে র্যাব। এ সময় ওই 'হাসপাতালের' নার্স বিউটি বেগম (৪৫) ও ওয়ার্ডবয় শাহাদাত হোসেনকে (২৪) দুই বছরের সাজা দেয় ভ্রাম্যমাণ আদালত। এছাড়া ওই 'হাসপাতালটি' সিলগালা করা হয়।
বুধবার বেলা ১১টার দিকে র্যাবের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট এএইচএম আনোয়ার পাশার নেতৃত্বে এ অভিযান পরিচালনা করা হয়। তিনি বলেন, "কোনো ধরনের সরকারি অনুমোদন, চিকিৎসক, সেবিকা বা টেকনিশিয়ান ছাড়াই বিউটি, শাহাদাত ও একজন পরিচ্ছন্নকর্মী এই 'হাসপাতালটিতে' রোগীদের সেবা দিচ্ছিলেন। বুধবার ওই 'হাসপাতালে' ১২ জন চিকিৎসাধীন ছিলেন। এদের বেশির ভাগেরই কেমোথেরাপি চলছিল।"
সাজা পাওয়া ব্যক্তিরা জানিয়েছেন, জাতীয় ক্যান্সার ইনস্টিটিউটের একজন ওয়ার্ডবয় নেতা ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের একজন স্টেনো টাইপিস্ট ওই 'হাসপাতালটির' মূল মালিক। তারাই জাতীয় ক্যান্সার ইনস্টিটিউটে দূর-দূরান্ত থেকে আসা রোগী ভাগিয়ে এনে ওই টিনের ছাপড়া দেয়া 'হাসপাতালে' নিয়ে আসেন।
র্যাব সূত্র জানিয়েছে, ওই 'হাসপাতালের' মালিক ওয়ার্ডবয় ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের স্টেনোর বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা করে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য ভ্রাম্যমাণ আদালত নির্দেশ দিয়েছেন।
এদিকে একটি নির্ভরযোগ্য সূত্র জানায়, 'হাসপাতালের' মালিক তৈয়বুর রহমান এবং সংশিষ্ট আরো দু’জন মাহবুবুল আলম ও নয়ন হাসান। তারা দু’জন ম্যানেজার। তবে অভিযান চলাকালে তাদের পাওয়া যায়নি। আটককৃত দু’জনের দেওয়া তথ্য ও সূত্র অনুযায়ী এ 'ক্যান্সার হাসপাতালের' সঙ্গে জাতীয় ক্যান্সার ইনস্টিটিউটের দু’জন ডাক্তারের সম্পৃক্ততা পাওয়া গেছে। তারা হলেন- ড. গোলাম মোস্তফা এবং ড. এআরএম রফিকুল ইসলাম।
ঝালকাঠি থেকে আসা ক্যান্সার রোগী কবির হোসেন জানান, জাতীয় ক্যান্সার হাসপাতালের ড. রফিকুলের কাছে গেলে তিনি দেখে বলেন, 'এখানে সিট খালি নাই। আমার আরেকটা চেম্বার আছে।' এই বলে মহাখালীর ওই ডক্টরস চেম্বার ক্যান্সার হাসপাতালে আসতে বলেন।
তিনি বলেন, "আমি প্রায় এক মাস যাবৎ এখানে আছি। প্রতি মাসে তিনি দু’বার ভিজিটে আসেন। প্রতি বার দুই হাজার করে টাকা দিতে হয় এবং প্রতিদিন সিট ভাড়া ৩০০ টাকা। এ পর্যন্ত আমার প্রায় ৩০ হাজার টাকা খরচ হয়ে গেছে। আমাদের ওষুধ নিতে হয় তাদের নির্ধারিত ফার্মেসি হাসপাতালের নিচে মায়ের দোয়া ফার্মেসি থেকে।"
এ বিষয়ে আনোয়ার পাশা বলেন, "এ হাসপাতালটি প্রায় ১৫ বছর যাবৎ অবৈধভাবে ব্যবসা করে আসছে। এর সাথে জড়িত প্রত্যেকের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। আমরা দু’জনকে আটক করে দু’বছরের জেল এবং হাসপাতাল সিলগালা করে দিয়েছি। হাসপাতালের রোগীদের নিকটস্থ ক্যান্সার গবেষণা ইনস্টিটিউট হাসপাতালে পাঠানো হচ্ছে। অবৈধ এ ব্যবসার সাথে জাতীয় ক্যান্সার হাসপাতালের যে দু’জন ডাক্তারের সম্পৃক্ততা পাওয়া গেছে তদন্তের মাধ্যমে তাদের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থাগ্রহণ করা হবে।"
'হাসপাতালের' ভেতরের অবস্থা : টিবি গেইটে চিশতিয়া হোটেলের পাশে মইয়ের মতো সরু লোহার খাড়া সিঁড়ি। এই সিঁড়ি দিয়েই কোলে করে মুমূর্ষু রোগীদের ওপরে ওঠানো হয়। ভেতরে হার্ডবোর্ড দিয়ে চারটি কক্ষ করা হয়েছে। ভেতরে ঢুকতেই নাকে ধাক্কা দেয় কটু গন্ধ। নোংরা টয়লেট, বিছানা ও অন্যান্য বর্জ্য আর ওষুধের গন্ধ মিলিয়ে উৎকট এক গন্ধ ভেতরে। বিছানাগুলোও এমনভাবে রাখা যে মাঝখান দিয়ে একজন কোনো রকমে হেঁটে যেতে পারেন। এখানেই শুইয়ে কোনো রোগীর শরীরে রক্ত, কারও শরীরে কেমোথেরাপির ওষুধ দেওয়া হচ্ছে। বিছানাগুলোও নোংরা ও তেল চিটচিটে।
নিচের হোটেলকর্মী ও দোকানদারেরা জানান, আগে এখানে ‘ঢাকা টিউমার ক্লিনিক’ নামের একটি বড় সাইনবোর্ড ছিল। কয়েক দিন আগে সেই সাইনবোর্ড নামিয়ে ফেলা হয়। এখন ‘ডক্টরস চেম্বার’ নামে এটি চলছে।
রোগী আবুল হাসেম জানান, তিনি সরকারি ক্যান্সার হাসপাতালে ভর্তি হতে এসেছিলেন। সেখান থেকে দালালেরা তাকে এখানে নিয়ে আসে। একেক কোর্স কেমোথেরাপি দিতে সাত থেকে ১০ হাজার টাকা করে নেওয়া হয়।
অভিযানে র্যাব-১-এর উপ-পরিচালক আসিফ কুদ্দুস ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের প্রতিনিধি যোগেশ চন্দ্র রায় উপস্থিত ছিলেন।
সূত্র - poriborton.com

