চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজকে (চমেক) বিশ্ববিদ্যালয় ঘোষণা করার সিদ্ধান্তের পক্ষে-বিপক্ষে আন্দোলনে নেমেছেন চিকিৎসক এবং কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। কর্মচারীরা বিশ্ববিদ্যালয় ঘোষণার সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করে ইতিমধ্যে কর্মবিরতি পালন করেছেন। অন্যদিকে চিকিৎসকেরা কর্মচারীদের আন্দোলনের বিরোধিতা করে সভা-সমাবেশ করেছেন।
উভয় পক্ষের কর্মসূচির কারণে দুর্ভোগের শিকার হচ্ছেন চমেক হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রোগীরা। বিশ্ববিদ্যালয় ঘোষণার বিরোধিতাকারীরা কাল সোমবার আরও কঠোর কর্মসূচি ঘোষণা করবেন বলে আলটিমেটাম দিয়েছেন। এটা হাসপাতালের চিকিৎসাব্যবস্থার ওপর হুমকি বলে মন্তব্য করেছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
চমেক অধ্যক্ষ সেলিম মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর বলেন, ‘রোগীদের জিন্মি করে আন্দোলন কারও কাছে কাম্য নয়। আর বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যাপারে এখনো লিখিত কিছুই আসেনি। এর মধ্যে কেন এই আন্দোলন? অধ্যক্ষ সেলিম আরও বলেন, ‘চিকিৎসক, শিক্ষকসহ চট্টগ্রামের সব পেশাজীবী মানুষ বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষে। বিশ্ববিদ্যালয় হলে বেতন কমে যাবে, চাকরি চলে যাবে এসব কাল্পনিক কথা। তবে দুর্নীতি কমে যাবে এটা সত্য।’
জানা গেছে, গত এক সপ্তাহ ধরে চট্টগ্রাম মেডিকেলকে বিশ্ববিদ্যালয় ঘোষণার সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করে কর্মকর্তা ও কর্মচারী সংগ্রাম ঐক্য পরিষদ আন্দোলন করে আসছে। এ সময় হাসপাতালের রোগী ফেলে তারা ঘণ্টার পর ঘণ্টা ক্যাম্পাসে মিছিল-সমাবেশ করে। অন্যদিকে চিকিৎসক ও সংশ্লিষ্ট অনেকে এই আন্দোলনকে অযৌক্তিক আখ্যা দিয়ে মাঝেমধ্যে মুখোমুখি অবস্থান নেন।
একপর্যায়ে ২ মার্চ তাদের আন্দোলন দেখে চিকিৎসকেরাও ক্যাম্পাসে নেমে আসেন। তাঁরা বিশ্ববিদ্যালয় ঘোষণাকে স্বাগত জানিয়ে মিছিল-সমাবেশ করেন। এ সময় দুই পক্ষ মুখোমুখি হন। পরদিন সোমবার কর্মকর্তা-কর্মচারীরা তিন ঘণ্টার কর্মবিরতি পালন করেন। ওই দিন চিকিৎসকদের সঙ্গে বাগিবতণ্ডাও হয় তাঁদের।
কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দাবি বিশ্ববিদ্যালয় হলে এখানে গরিব রোগীরা বিনা মূল্যে সেবা পাবেন না। টাকা দিয়ে সবকিছু করতে হবে। রোগীরা সেবাবঞ্চিত হবেন এমন ইস্যুকে সামনে এনে আন্দোলনে নামলেও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে মূল মাথাব্যথা তাঁদের সুযোগ-সুবিধা এখনকার মতো থাকবে কিনা তা নিয়ে।
এ বিষয়ে চমেক কর্মকর্তা-কর্মচারী সংগ্রাম ঐক্য পরিষদের সাধারণ সম্পাদক রতন কুমার নাথ বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয় হলে আমাদের চাকরি হুমকিতে পড়বে। আমাদের চাকরি চলে যাবে। বিশ্ববিদ্যালয় হোক আমরা চাই। তবে তা আলাদা কোনো জায়গায় হোক। আর রোগীদের জিন্মি করে আন্দোলন ডাক্তাররাও আগে করেছেন। এখনো করছেন।’
প্রসঙ্গত গত বছর এক চিকিৎসককে গ্রেপ্তারের প্রতিবাদে চট্টগ্রামের চিকিৎসকেরা রাজপথে নেমে আন্দোলন করেছিলেন। এ সময় হাসপাতালের রোগীদের দুর্ভোগ পোহাতে হয়।
জানা গেছে, কর্মকর্তা-কর্মচারী সংগ্রাম ঐক্য পরিষদ ১০ মার্চ পর্যন্ত আন্দোলন স্থগিত করেছে। তারা চমেক কর্তৃপক্ষের কাছে হাসপাতালকে স্বায়ত্তশাসিত করা হবে না এমন লিখিত প্রতিশ্রুতি চায়। কাল সোমবারের মধ্যে তা দেওয়া না হলে পুনরায় কঠোর আন্দোলন করা হবে বলে ঘোষণা দেয় পরিষদ।
তবে কর্মচারীদের আন্দোলনের পেছনে অন্য কোনো শক্তির মদদ থাকার পাশাপাশি দুর্নীতিবাজ কিছু কর্মকর্তা-কর্মচারীর প্রভাব রয়েছে বলে মনে করছেন অনেক চিকিৎসক। তাঁদের মতে, এখন চমেক হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা লোকজনকে ঘুষ হিসেবে অনেক টাকা খরচ করতে হয়। বিশ্ববিদ্যালয় হলে ওই অবৈধ আয়ের উৎসটি বন্ধ হয়ে যেতে পারে। এমন আশঙ্কা থেকে কতিপয় কর্মকর্তা-কর্মচারীর ইন্ধনে এ আন্দোলনে নেমেছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
এ বিষয়ে চট্টগ্রাম বিএমএর সভাপতি মুজিবুল হক খান বলেন, একটা অযৌক্তিক আন্দোলন করছেন তাঁরা। কতিপয় দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা-কর্মচারী জোর করে কর্মচারীদের আন্দোলনে আনছে। বিশ্ববিদ্যালয় হোক এটা চট্টগ্রামবাসীর দাবি। বিশ্ববিদ্যালয় হলে কারও চাকরি যাবে না। আর হাসপাতাল স্বায়ত্তশাসিত হবে না।
চমেক অধ্যক্ষ সেলিম মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর বলেন, ‘আমরা যাঁরা সরকারি ডাক্তার, কর্মকর্তা, কর্মচারী তাঁদের চাকরি বদলির চাকরি। আজ এখানে, কাল ওখানে। যদি আমরা স্বায়ত্তশাসিত থাকতে না চাই তাহলে বদলির সুযোগ থাকছেই।’
এদিকে বিশ্ববিদ্যালয় বাস্তবায়নের দাবিতে গতকাল শনিবার চমেক ক্যাম্পাসে চিকিৎসকেরা সমাবেশ করেন। এ সময় সেখানে নগর আওয়ামী লীগের নেতারাও যোগ দেন। বিশ্ববিদ্যালয় ঘোষণা করার ব্যাপারে সরকারের ইচ্ছাকে স্বাগত জানান চিকিৎসকেরা। এ ছাড়া, আজ রোববার এ বিষয়ে সংবাদ সম্মেলন ডেকেছে বিএমএ।
সূত্র - প্রথম আলো

