রাজধানীর মনোরম প্রকল্প হাতিরঝিলের তরল বর্জ্য পরিশোধনের জন্য পূর্বাঞ্চলীয় এলাকা দাসেরকান্দিতে যে পরিশোধন প্ল্যান্টটি হওয়ার কথা, তার বাস্তব কাজ এখন পর্যন্ত শুরুই হয়নি। গত বছরের ২ জানুয়ারি ‘নববর্ষের উপহার’ হিসেবে এই প্রকল্প উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এক বছরের বেশি সময় পার হলেও ঢাকা ওয়াসার বাস্তবায়নাধীন এই ময়লা পানি পরিশোধন প্ল্যান্টের প্রয়োজনীয় জমিও এখন পর্যন্ত অধিগ্রহণ করা হয়নি। মেলেনি পর্যাপ্ত টাকা। অর্থায়নে কোনো দাতা সংস্থাও খুঁজে পাওয়া যায়নি। অথচ এখনই যদি এই শোধনাগারের কাজ শুরু করা যায়, তাহলেও তিন বছর সময় লাগবে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষগুলোর সূত্রে এবং এলাকায় ঘুরে এই তথ্য পাওয়া যায়।
এদিকে প্রকল্প এলাকার কঠিন ও তরল সব ধরনের আবর্জনা পরিষ্কার করা নিয়ে সরকারি তিন সংস্থার মধ্যে রশি টানাটানি চলছে। এ নিয়ে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক), ঢাকা ওয়াসা ও ঢাকা সিটি করপোরেশন একে অন্যের ওপর দায় চাপাচ্ছে। প্রকল্পস্থল ময়লা-দুর্গন্ধময় এলাকায় এখন পর্যন্ত এ কাজের জন্য কোনো তহবিলও গঠন করা হয়নি। ফলে মনোরম এই প্রকল্পস্থল দিন দিন ময়লা দুর্গন্ধময় এলাকায় পরিণত হচ্ছে। এতে অস্বস্তিতে পড়ছেন দর্শনার্থীরা। অথচ উদ্বোধনের পর হাতিরঝিলের ১৭ কিলোমিটার দীর্ঘ সৌন্দর্যমণ্ডিত সড়কপথ, শোভিত সেতু, সারিবদ্ধ বৃক্ষরাজি, সবুজ চত্বর ও বেষ্টনী এবং স্বচ্ছ পানির ঝিল দেখে মুগ্ধ হয়েছিল মানুষ।
কিছু কাজ বাকি রেখে উদ্বোধন করার সময় খরচ হয় এক হাজার ৯৭১ কোটি টাকা। পরে আরও ২৬৫ কোটি টাকা যোগ হয়ে মোট বাজেট দাঁড়ায় দুই হাজার ২৩৬ কোটি টাকা। তার পরও দৈনন্দিন ময়লা-আবর্জনা অপসারণের জন্য কোনো তহবিল গঠন করা যায়নি। এখন যানজট নিরসনের জন্য রামপুরা ইউ লুপের কাজ চলছে, মেরুল-বাড্ডার অপর ইউ লুপের চলমান কাজ নিয়ে সমস্যা হচ্ছে।
অস্বস্তিতে দর্শনার্থী: গত রোববার বিকেলে প্রকল্প এলাকায় দেখা হয় কুমিল্লা থেকে আসা এক নবদম্পতির সঙ্গে। স্বামী বাবুল আখতার জানান, বিয়ের পর কোথাও বেড়াতে যাননি। ঢাকায় হাতিরঝিলে বেড়াতে এসে ভালো লাগছে। কিন্তু বাতাসে ভেসে বেড়ানো কেমন একটা গন্ধ তাঁদের অস্বস্তিতে ফেলেছে। মগবাজার প্রান্তে সেতুতে দাঁড়ানো বাবার কোলে পাঁচ বছরের বাচ্চা অমিয়। বাবার কাছে তার বায়না লেকে নামার। লেকে নামার ব্যবস্থা নেই। বাবা তাকে বোঝাচ্ছেন, ‘ওই পানিতে গোসল করলে গায়ে গোটা উঠবে।’
অনেক দর্শনার্থীই হাতিরঝিল দেখে মুগ্ধ। কিন্তু এই মুগ্ধতা ছিল নাকে রুমাল চেপে।
কিছু স্থাপনার নির্মাণকাজের জায়গায় পরিত্যক্ত আবর্জনা প্রকল্প এলাকায় পড়ে আছে। লেকের অনেক স্থানেই কচুরিপানায় ভরে আছে। চারপাশের পয়োবর্জ্য, গৃহস্থালির বর্জ্য এবং কারওয়ান বাজারের বারোয়ারি বর্জ্য এসে পড়ায় পানি নষ্ট হচ্ছে। প্রকল্পের পশ্চিমাংশে ঝিলে কঠিন বর্জ্য যাতে না পড়ে, সে জন্য বৈদ্যুতিক ছাঁকনি (মেকানিক্যাল স্ক্রিন) বসানো হয়েছে আগেই। সেই ছাঁকনিতে নিয়মিত পাওয়া যাচ্ছে মরা মুরগি, গরু-ছাগলের নাড়িভুঁড়ি, লেপ-তোশক-বালিশের অংশবিশেষ। এতে ছাঁকনিই অকেজো হয়ে যাওয়ার জোগাড় হয়েছে।
পরিশোধন প্লান্ট হবে কবে?: হাতিরঝিলে ডাইভারশন পয়োব্যবস্থা কার্যকর করা না গেলে এলাকার পরিবেশদূষণ ছড়িয়ে পড়বে—বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) পক্ষ থেকে এই হুঁশিয়ারি অনেক আগেই দেওয়া হয়েছিল। বুয়েটের অধ্যাপক এবং বেগুনবাড়ী-হাতিরঝিল উন্নয়ন প্রকল্পের মূল পরিকল্পনাকারী মুজিবুর রহমান বলেন, দাসেরকান্দির ময়লা পানি পরিশোধন প্লান্ট স্থাপন না হওয়ায় হাতিরঝিল প্রকল্পের অন্যতম উদ্দেশ্যই ব্যাহত হচ্ছে।
দায়িত্বশীল সূত্রমতে, দাসেরকান্দি প্লান্টটি ঠিক কবে শুরু হবে, তা এখন পর্যন্ত নিশ্চিতভাবে বলা যাচ্ছে না। আফতাবনগরের শেষ প্রান্তে দাসেরকান্দিতে এই প্লান্টটি হওয়ার কথা। বাস্তবায়নে খরচ হবে প্রায় দুই হাজার কোটি টাকা। জমির দরকার প্রায় ৬০ বিঘা।
প্রকল্পের দুই পাশে মূল ডাইভারশন ও স্থানীয় ডাইভারশন পয়োনালার নির্মাণ শেষ হয়েছে। রামপুরা সেতুর কাছে লিফট স্টেশন নির্মাণ করে ডাইভারশনের ডাউন স্টিমের পানি ও ময়লা লিফটিং করে দাসেরকান্দিতে পরিশোধন প্লান্টে নিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা ছিল। এ জন্যই হাতিরঝিল প্রকল্পের ‘সুয়েজ লিফটিং স্টেশন’র সঙ্গে যোগসাধন করে দাসেরকান্দির পরিশোধন প্লান্ট বাস্তবায়নের দায়িত্ব ছিল ঢাকা ওয়াসার ওপর।
ঢাকা ওয়াসার উপব্যবস্থাপনা পরিচালক (ডিএমডি) এ ডি এম কামরুল আলম প্রথম আলোকে বলেন, প্লান্টের নকশা ও সমীক্ষা শেষ হয়েছে। জমি অধিগ্রহণ ও অনুমোদনের জন্য ভূমি মন্ত্রণালয়ে আবেদন করা হয়েছে। অর্থ সংগ্রহেরও জোরচেষ্টা চলছে। চীনের একটি দাতা সংস্থা আশ্বাসও দিয়েছে।
হাতিরঝিল প্রকল্পের অন্যতম কর্মকর্তা রাজউকের নির্বাহী প্রকৌশলী জামাল আখতার বলেন, ‘দাসেরকান্দির বিষয়ে আমাদের হালনাগাদ তথ্য জানানো হয়নি।’
অন্যের ঘাড়ে দোষ: রাজউকের নির্বাহী প্রকৌশলী জামাল আখতার বলেন, ‘ঢাকার আবর্জনা পরিষ্কারের দায়িত্ব ঢাকা সিটি করপোরেশনের। আমরা উত্তর সিটি করপোরেশনকে বারবার চিঠি দিচ্ছি, কিন্তু তারা আমাদের কথা শুনছে না।’
ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগের প্রধান বিপন কুমার সাহা এ কথার জবাবে বলেন, ‘যারা হাতিরঝিলের মালিক, প্রকল্প এলাকা পরিষ্কার রাখার দায়িত্বও তাদের। না হলে হাতিরঝিল সিটি করপোরেশনের হস্তান্তর করে দিক, আমরা পরিষ্কার করব।’
ঢাকা ওয়াসার ডিএমডি এ ডি এম কামরুল আলম বলেন, ‘আবর্জনা অপসারণের ক্ষেত্রগুলো তৈরিতে রাজউককে অনেক সহযোগিতা করেছি। এখন তহবিল-সংকটে আছি।’
এ বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে অধ্যাপক মুজিবুর রহমান বলেন, একে অন্যকে দোষ না দিয়ে রাজউক, ঢাকা ওয়াসা ও ঢাকা সিটি করপোরেশন দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করলে সমস্যা কম হতো।
গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, হাতিরঝিলের আবর্জনা অপসারণসহ যাবতীয় সমস্যা বিষয়ে আলোচনার জন্য আন্তমন্ত্রণালয়ের সভা হওয়ার কথা ছিল ২ ফেব্রুয়ারি। কিন্তু মন্ত্রী মোশাররফ হোসেন অসুস্থ থাকায় হয়নি।
সূত্র - প্রথম আলো

