রাজধানীর আগারগাঁওয়ের ঢাকা শিশু হাসপাতালের জরুরি বিভাগের সামনে রাখা চেয়ারগুলোর একটিও ফাঁকা নেই। গত শুক্রবার সকাল সাড়ে ১০টায় এই ভিড় দেখা গেছে। শিশুদের কোলে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন কয়েকজন অভিভাবক। বেলা বাড়তে থাকলে বাড়ে রোগীর সংখ্যাও। টিকিট কাউন্টারে ১১টার মধ্যে ৯০টি টিকিট বিক্রি হয়ে গেছে বলে জানা গেল। বিক্রেতা জানালেন, শুক্রবারে এই সংখ্যায় রোগী সাধারণত দেখা যায় না। সাপ্তাহিক ছুটির দিনটিতে একজন চিকিৎসককেই সামলাতে হচ্ছে রোগীর চাপ।
দায়িত্বরত চিকিৎসক আয়েশা সকাল নয়টা থেকে সাড়ে ১১টা পর্যন্ত ৫৮ জন রোগী দেখে ফেলেছেন। আয়েশা বললেন, প্রায় ৭০ শতাংশ শিশু ঠান্ডাজনিত রোগে আক্রান্ত। শীতের শুরু থেকে ঠান্ডাজনিত রোগীর সংখ্যা বাড়ছে। এখন শীতের পড়তির এই সময়ে রোগী আরও বেড়ে গেছে বলে জানান তিনি। আগের শুক্রবারের তুলনায় এই সংখ্যা বেশি।
হাসপাতালের মেডিসিন কর্নারের বিক্রেতা মো. আল মামুন জানালেন, যে পরিমাণ ওষুধ বিক্রি করেছেন এর মধ্যে চার ভাগের তিন ভাগই সর্দি-কাশির ওষুধ।
রাজধানীর দারুস সালাম থেকে চার বছর বয়সী সায়েমকে নিয়ে এসেছেন বাবা কামরুল ইসলাম। ঠান্ডা লেগে এখন সর্দি ও কাশিতে আক্রান্ত শিশুটি।
রাজধানীর আশপাশের বিভিন্ন এলাকা থেকেও অসুস্থ শিশুকে নিয়ে এসেছেন অনেক উদ্বিগ্ন অভিভাবক। নারায়ণগঞ্জের পাগলা থেকে পারভীন আক্তার নিয়ে এসেছেন দেড় বছরের ফাহিম হোসেনকে। শীতের শুরু থেকে ছেলেটি কাশিতে ভুগছে। স্থানীয়ভাবে চিকিৎসা করিয়ে কোনো ফল না হওয়ায় শিশু হাসপাতালে এসেছেন তিনি। ঠান্ডাজনিত রোগে আক্রান্ত শিশুর প্রাধান্যই দেখা গেল ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের শিশু বিভাগ ও জরুরি বিভাগে।
ছুটির দিনে শিশু বিভাগ থেকেই বহির্বিভাগের রোগী দেখা হয় বলে জানান কর্তব্যরত চিকিৎসক সায়েম। তিনি বললেন, দুপুর ১২টা পর্যন্ত (শুক্রবার) যত সংখ্যক শিশুকে চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে, তার বেশির ভাগই শ্বাসকষ্টজনিত রোগে। ওয়ার্ডে ভর্তি হওয়া রোগীর সংখ্যা চার, প্রত্যেকেই শ্বাসকষ্টে আক্রান্ত। হাসপাতালের শিশু বিভাগের ২৮ নম্বর ওয়ার্ডে প্রতিটি শয্যায় দুই থেকে তিনজনও আছে। এর মধ্যে ৭০ ভাগ শিশু ঠান্ডাজনিত শ্বাসকষ্টে আক্রান্ত বলে জানান চিকিৎসক সায়েম।
ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগে দুপুর সাড়ে ১২টার সময় গিয়ে দেখা যায়, ৩২৮টি টিকিট বিক্রি হয়ে গেছে। গত কয়েক শুক্রবারে এমন ভিড় দেখেননি বলে জানালেন অফিস সহকারী এ কে এম তরিকুল ইসলাম। যে পরিমাণ রোগী এসেছে, এর মধ্যে প্রায় অর্ধেক শিশু।
এখন যেসব শিশু অসুখে পড়ছে এর মধ্যে ব্রংকাইটিসে (জ্বরহীন শ্বাসকষ্ট ও কাশি) ভোগার পরিমাণই বেশি বলে জানালেন ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের নবজাতক বিভাগের প্রধান আবিদ হোসেন মোল্লা। যেসব রোগী তিনি সাম্প্রতিক সময়ে পাচ্ছেন, এর মধ্যে ঠান্ডাজনিত এই রোগটি ছাড়াও আরও তিনটি রোগের প্রকোপ বেশি বলে জানান তিনি। এগুলোর মধ্যে আছে ঠান্ডা থেকে তৈরি হওয়া সাধারণ সর্দি-কাশি, নিউমোনিয়া আর একটু বেশি বয়সী শিশুদের হাঁপানি। এর পাশাপাশি কিছু ডায়রিয়া এবং জলবসন্তের রোগীও তিনি পেয়েছেন বলে জানান।
শীতের পাশাপাশি ধুলাবালি এবং অন্যান্য দূষণে শিশুদের শ্বাসকষ্ট বেড়ে যাচ্ছে বলে মনে করেন তিনি। ধুলাবালি এড়িয়ে চলাসহ ঠান্ডাজনিত রোগ নিরাময়ে অধ্যাপক মোল্লার রয়েছে কয়েকটি পরামর্শ। এর মধ্যে ছয় মাস বয়সী শিশুদের শুধু বুকের দুধ খাওয়ানো একটি জরুরি পন্থা। দুই বছর বয়স পর্যন্ত অন্যান্য খাবারের পাশাপাশি চলবে এই দুধ পান।
ঘরের ভেতরে দূষণ রোধ করতে রান্নাঘরের ধোঁয়া নিয়ন্ত্রণ করতে হবে এবং ঘরে ধূমপান পরিত্যাগ করতে হবে। শিশুদের ঘরের বাইরে নিয়ে গেলে ঠান্ডা যাতে লাগে, সেদিকে বিশেষ খেয়াল রাখাটাও জরুরি।
সূত্র - প্রথম আলো

