দাঁতের চিকিৎসা ও হেপাটাইটিস
12 January,14
Viewed#: 139
ওটোক্লেভ ব্যয়বহুল হওয়ায় এর ব্যবহার ক্লিনিক গুলোতে নগণ্য। শুধু সিদ্ধ কিংবা অন্য কোনো চোখ ধাঁধানো জীবাণুনাশক পদ্ধতির বদলে এই ওটোক্লেভকে জনপ্রিয় করা না গেলে তা আমাদের সমাজে উত্তরোত্তর ভয়াবহ বিপদ ডেকে আনতে পারে। শুধু দাঁতের স্কেলিং করতে গিয়েও একজন সুস্থ মানুষের শরীরে হেপাটাইটিসের মতো দুরারোগ্য রোগ সংক্রমিত হতে পারে আমাদের অবহেলায় কিংবা অসাবধানতায়।
আপনি জেনে অবাক হবেন, শুধু মুখের ভেতরে এক কোটিরও বেশি জীবাণুু থাকে। মুখ থেকে এই জীবাণুগুলোর মাধ্যমে সারা দেহে বিভিন্ন রকম রোগ বিস্তার ঘটতে পারে। হৃদরোগের মতো ভয়ঙ্কর ব্যাধিও মুখের জীবাণু দ্বারা সংক্রমিত হতে পারে খুব সহজেই। যদিও নিশ্চিত পরিসংখ্যান পাওয়া মুশকিল। এক নির্ভরযোগ্য পরিসংখ্যানে বাংলাদেশে প্রতি ১০ জনে একজন হেপাটাইটিস-বি, প্রতি ৩০ জনে একজন হেপাটাইটিস-সি এবং ১১,০০০ জনেরও বেশি এইডস ভাইরাস বহন করে বেড়াচ্ছে। আরেক পরিসংখ্যানে সারা পৃথিবীতে প্রতি ১২ জনে একজন হেপাটাইটিস-বি অথবা সি বহনকারী রয়েছে। হেপাটাইটিস রোগের প্রাদুর্ভাব বিশ্বের অন্যান্য দেশের তুলনায় বাংলাদেশে বেশি।
এ বছর বিশ্ব হেপাটাইটিস দিবসের প্রতিপাদ্য বিষয় ছিল_ 'আপনি কি নম্বর ১২?' অর্থাৎ হেপাটাইটিস বহনকারী প্রতি ১২ জনের মধ্যে আপনি কি একজন? এই রোগ বিস্তারের ভয়াবহতা সম্পর্কে বিশ্ববাসীকে সচেতন করে তোলাই এই স্লোগানের উদ্দেশ্য। এই রোগের বিস্তার ঠেকানোর জন্য ভ্যাকসিনেশনসহ প্রতিটি স্তরে জনসচেতনতা গড়ে তোলা অত্যন্ত জরুরি। পাশাপাশি সার্জারি চিকিৎসকরা, বিশেষ করে ডেন্টাল সার্জনদের এ ব্যাপারে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা এখন অবশ্যম্ভাবী হয়ে পড়েছে।
দাঁতের কাজ করতে গেলে অতি সহজেই মুখের লালা ও রক্তের সঙ্গে যন্ত্রপাতির সংস্পর্শ ঘটে। এসব যন্ত্রপাতি নির্ভরযোগ্য জীবাণুমুক্ত পদ্ধতিতে পরিষ্কার না করে ব্যবহার করলে রোগজীবাণু একজন থেকে আরেকজনে সংক্রমিত হতে পারে। বিশেষ করে যন্ত্রপাতিকে ভাইরাসমুক্ত করা কঠিন। আমাদের দেশে যন্ত্রপাতিকে জীবাণুমুক্ত করার সবচেয়ে সহজ পদ্ধতি সিদ্ধকরণ বা বয়েলিং ব্যবহৃত হচ্ছে। এর মাধ্যমে খুব তাড়াতাড়িই ৯০-১০০ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড তাপমাত্রায় সব ব্যাকটেরিয়া মরে যায়। কিন্তু ব্যাকটেরিয়া স্পোর, ভাইরাস মরে না। টানা ২৪ ঘণ্টা সিদ্ধ করলে ব্যাকটেরিয়া স্পোর মরে যেতে পারে; কিন্তু তখনও ভাইরাস মরে না। সুতরাং শুধু সিদ্ধ করলেই যন্ত্রপাতি জীবাণুমুক্ত হবে না।
অন্যান্য জীবাণুমুক্তকরণ পদ্ধতির মধ্যে হট এয়ার ওভেন এবং মাইক্রোওয়েভ ওভেন আছে। কিন্তু হট এয়ার ওভেন জীবাণুনাশক পদ্ধতিতে কমপক্ষে ২ ঘণ্টা গরম করতে হয় বলে অনুপযোগী। মাইক্রোওয়েভ ওভেন দিয়ে খাবার গরম করা হয়। কিন্তু যন্ত্রপাতি জীবাণুমুক্ত করার ক্ষেত্রে এখনও অনেক সীমাবদ্ধতা রয়েছে।
তাই সবদিক বিবেচনা করে যে পদ্ধতিটিকে এক কথায় আদর্শ জীবাণুমুক্তকরণ পদ্ধতি বলা হয়, সেটি হচ্ছে ওটোক্লেভ। পৃথিবীব্যাপী সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য এবং গ্রহণযোগ্য জীবাণুমুক্তকরণ পদ্ধতি হচ্ছে ওটোক্লেভ। এই পদ্ধতিতে ১৫ পাউন্ড প্রেসারে ১২১ ডিগ্রি তাপমাত্রায় ১৫ মিনিটে এবং ৩০ পাউন্ড প্রেসারে ১৩৬ ডিগ্রি তাপমাত্রায় ৫-১২ মিনিটে যন্ত্রপাতি খুব সহজেই জীবাণুমুক্ত করা যায়। এই ওটোক্লেভের মাধ্যমে ব্যাকটেরিয়া, স্পোর, ভাইরাস সব অতি অল্প সময়ে মেরে ফেলা যায়। কিন্তু ওটোক্লেভ ব্যয়বহুল হওয়ায় এর ব্যবহার ক্লিনিকগুলোতে নগণ্য।
শুধু সিদ্ধ কিংবা অন্য কোনো চোখ ধাঁধানো জীবাণুনাশক পদ্ধতির বদলে এই ওটোক্লেভকে জনপ্রিয় করা না গেলে তা আমাদের সমাজে উত্তরোত্তর ভয়াবহ বিপদ ডেকে আনতে পারে। শুধু দাঁতের স্কেলিং করতে গিয়েও একজন সুস্থ মানুষের শরীরে হেপাটাইটিসের মতো দুরারোগ্য রোগ সংক্রমিত হতে পারে আমাদের অবহেলায় কিংবা অসাবধানতায়। তাই আসুন, আমরা সমাজের প্রতিটি মানুষ আরও বেশি স্বাস্থ্যসচেতন হই এবং একটি সুস্থ রোগমুক্ত, সুখী ও সমৃদ্ধশালী বাংলাদেশ গড়ে তুলি।
সূত্র - দৈনিক সমকাল