
ঘটনা-১
বেশ কদিন ধরেই ঐশী (কাল্পনিক নাম) সর্দি কাশিতে ভুগছে। জ্বরও আছে। রাতে ঘুম নেই। ওষুধেও কাজ হচ্ছে না। তার অভিভাবকদের আশংকা এটা কি নিউমোনিয়া?
ঘটনা-২
স্কুলে শান্তুর (কাল্পনিক নাম) এক বন্ধুর নিউমোনিয়া হয়েছে। তার নিজেরও কয়েক সপ্তাহ আগে জ্বর ছিল। শান্তুরও কি নিউমোনিয়া হতে পারে?
নিউমোনিয়ায় শিশু মৃত্যুর হার এইডস, ম্যালেরিয়া ও অন্যান্য রোগের চেয়ে বেশি।
নিউমোনিয়া কী?
ভাইরাস ও ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণ থেকে নিউমোনিয়া হওয়ার আশংকা থাকে। শিশুদের শরীরের প্রতিরোধক ক্ষমতা বড়দের তুলনায় কম। পরিবেশগত ও অন্যান্য কারণেও তাদের নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হওয়ার আশংকা বেড়ে যায়।
নিউমোনিয়া হওয়ার ঝুঁকি কখন বাড়ে
* শিশুদের ফুসফুসের রোগ থাকলে যেমন অ্যাজমা, সিস্টিক ফাইব্রোসিস (যেখানে পাকস্থলী, প্যানক্রিয়াস প্রভৃতি জায়গায় দেহের মিউকোসাল সিক্রেশন চটচটে হয়)থাকলে ফুসফুসে ইনফেকশন হয়।
* শিশুর শ্বাসনালি ও খাদ্যনালি জোড়া অবস্থায় থাকলে নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বেশি থাকে। এক্ষেত্রে খাবার শ্বাসনালিতে ঢুকে যায়, শিশু যা খায় তা-ই বমি করে ফেলে দেয় বা খাবার পেট থেকে ফুসফুসে চলে আসে।
* পেশি দুর্বল থাকলে শিশু কাশি দিয়ে কফ বের করতে পারে না। খাবার শ্বাসনালিতে ঢুকলেও কাশি দিতে পারে না।
* অনেক ক্ষেত্রে জন্মগত ভাবেই প্রতিরোধ ক্ষমতা কম থাকে। এইডস, থেলাসেমিয়া হলেও প্রতিরোধ ক্ষমতা কম থাকায় নিউমোনিয়া হওয়ার ঝুঁকি বেড়ে যায়।
সাধারণ সর্দি কাশি ও নিউমোনিয়া
শিশুদের সর্দি কাশি, জ্বর প্রায়ই হতে দেখা যায়। বিশেষ কয়েকটি লক্ষণ থেকে বোঝা যায় শিশুর নিউমোনিয়া হয়েছে কিনা।
প্রথমত, সর্দি কাশি, জ্বরের সঙ্গে শিশু যদি দ্রুত নিঃশ্বাস নেয়। দুই বছরের কম বয়সের শিশু যদি প্রতি মিনিটে ৫০ বারের বেশি নিঃশ্বাস নেয় এবং দুই বছরের বেশি বয়সের শিশু যদি প্রতি মিনিটে ৪০ বারের বেশি নিঃশ্বাস নেয়, তাহলে বুঝতে হবে এটা সাধারণ সর্দি জ্বর নয়।
দ্বিতীয়ত, শান্ত বা বসে থাকা অবস্থায় শিশুর নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট হয় এবং নিঃশ্বাস নেওয়ার সময় ঘড় ঘড় আওয়াজ হয়।
নিউমোনিয়া কি ছোঁয়াচে
শিশুদের নাকে-কানে নিউমোনিয়ার ব্যাকটেরিয়া থাকে। রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে গেলে নিউমোনিয়া হওয়ার ঝুঁকি বাড়ে।
কখন ডাক্তার দেখাবেন :
* নিঃশ্বাস নেয়ার সময় শিশুর পেট ভেতরে ঢুকে গেলে।
* নিঃশ্বাস নেয়ার সময় নাক ফুলে উঠলে।
* মুখ ও ঠোঁটের চার পাশ নীল হলে, সঙ্গে কাঁপুনি দিয়ে জ্বর থাকলে।
* বুকে প্রচণ্ড ব্যথা হলে। এ অবস্থায় সাধারণত শিশুর বুকের যেদিকে ব্যথা করে সেদিকটা ধরে থাকে। এবং যে দিকে ব্যথা সেই দিকেই পাশ ফিরে শুয়ে থাকে। হাঁটু মুড়ে, হাঁটুকে বুকের কাছে এনে পাশ ফিরে থাকে।
* ঘন ঘন শুকনো কাশি হলে। কাশি হতে থাকলেও কফ বের করতে না পারলে।
* সব সময় মনে একটা অস্বস্তি, দুশ্চিন্তার মতো ভাব থাকলে।
চিকিৎসা
প্রথমেই রুটিন রক্ত পরীক্ষা এবং বুকের এক্স-রে করা দরকার। এক্স-রেতে জানা যায় রোগীর নিউমোনিয়া হয়েছে কিনা। রুটিন রক্ত পরীক্ষায় ভাইরাল না ব্যাকটেরিয়াল, কোন ধরনের নিউমোনিয়া হয়েছে বোঝা যায়। চিকিৎসকের পরামর্শ মতো যত শিগগির সম্ভব অ্যান্টিবায়োটিক শুরু করতে হবে।
শিশুকে স্টিম ভেপার দেয়া যেতে পারে।চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী কাফ মেডিসিনও নিতে হতে পারে। শিশুর রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা গড়ে তুলতে হলে খাওয়া-দাওয়া, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা, পরিবেশ- সবদিকেই লক্ষ্য রাখা দরকার।
খাওয়া-দাওয়া
মায়ের বুকের দুধ খাওয়ানো গুরুত্বপূর্ণ। অপুষ্টির হাত থেকে বাঁচতে শাকসবজি, তাজা ফল, টাটকা মাছ খাওয়ানোর অভ্যাস করতে হবে। ভিটামিন সিরাপও দেয়া যেতে পারে। গবেষণায় দেখা গেছে, খাবারে যেন যথেষ্ট পরিমাণে জিংক থাকে। এজন্য শিশুকে খাওয়ানো যেতে পারে কচি মুরগির মাংস, পনির, মসুর ডাল, শিম, কর্নফ্লেক্স, চিড়া ইত্যাদি।
পরিবেশ
লোকের ভিড়ে শিশুকে বেশি না নিয়ে যাওয়াই উত্তম। ধূমপান করা হয় এমন পরিবেশে শিশুরা থাকলে ফুসফুসে ইনফেকশন হওয়ার ঝুঁকি বেড়ে যায়।
ভ্যাকসিন
নিউমোনিয়া প্রতিরোধের জন্য ভ্যাকসিনের ব্যবহার বেড়েছে। মিজলস, হেমোফেলাস ইনফ্লুয়েঞ্জা, নিউমোক্কাল ও ইনফ্লুয়েঞ্জা ভ্যাকসিন নেওয়া ভালো। হেমোফেলাস ও নিউমোক্কাল ভ্যাকসিন দুই মাস বয়সে দেয়া হয়। মিজলস ও ইনফ্লুয়েঞ্জা ভ্যাকসিননয় মাস বয়সে দেয়া যায়।
এভাবে প্রতিরোধ করার চেষ্টা হলেও নিউমোনিয়া যে একেবারে হবে না তা কিন্তু নয়। বারবার নিউমোনিয়া হলে শিশুর মেনিনজাইটিস, অস্টিওম্যালাইটিস, আর্থাইটিস হওয়ার আশংকা থাকে।
সূত্র – যুগান্তর.কম

