পৃথিবীতে প্রতি হাজার জীবিত নবজাতকের মধ্যে ৪ থেকে ৮ জনকে এ রোগে ভুগতে দেখা যায়। নবজাতকের জন্মগত হৃৎত্রুটির মধ্যে অন্যতম হলো হৃৎপিন্ডের ফুটো। সাধারণত হৃৎপিন্ডের দুনিলয়ের মধ্যবর্তী দেয়ালে ফুটো থাকলেই বাচ্চারা অধিক হারে ঠান্ডা-কাশির রোগে ভুগতে পারে। আর যদি তার সঙ্গে হৃৎপিন্ডের গঠনেও ত্রুটি দেখা যায়, তবে সেক্ষেত্রে বাচ্চার আরো কিছু বাড়তি উপসর্গ দেখা দিতে পারে।
উপসর্গগুলো হলো:
১. অল্প পরিশ্রমেই সারা শরীর নীলচে হয়ে যাওয়া
২. ঠান্ডা বা গরমে তেমন কোনো অনিয়ম ছাড়াই বারবার বুকে কফ বসে যাওয়া
৩. ঘন ঘন শ্বাস নেয়া, অতিরিক্ত ঘাম হওয়া
৪. দৈহিক বৃদ্ধি ঠিকমতো না হওয়া
৫. ডান দিকের খাঁচার নিচের অংশে যকৃত বড় হয়ে যাওয়া
৬. অনেক সময়ই হৃৎপিন্ডের জন্মগত ত্রুটির সঙ্গে সঙ্গে শরীরের অন্যান্য অংশের গঠনেও ত্রুটিও থাকতে পারে
৭. রোগ জটিলতর পর্যায়ে গেলে হাত-পায়ে পানি আসা
কেন হয় : একেবারে নির্দিষ্ট কোনো কারণ নেই। তবে সমষ্টিগত ভাবে বিভিন্ন ব্যাপারে এসব সমস্যা তৈরি করে বলে চিকিৎসা বিজ্ঞানীরা ধারণা করে থাকেন
১. মায়ের বয়স ৩৫ বছরের বেশি হলে
২. ঋতুচক্রের শেষ দিকের ডিম্বাণু নিষিক্ত হলে
৩. মায়ের ডায়াবেটিস এবং উচ্চ রক্তচাপ রোগ থাকলে
৪. অপেক্ষাকৃত উঁচু এবং পাহাড়ি এলাকায় যারা বসবাস করে
৫. গর্ভাবস্থায় রুবেলা, মাম্পস, হাম, জলবসন্ত, টকসোপ্লাজমোসিস জাতীয় ভাইরাস জনিত রোগে আক্রান্ত হলে
৬. গর্ভবতী মা স্টেরয়েড, খিঁচুনির ওষুধ, থ্যালিডোমাইড ইত্যাদি ওষুধ সেবন করলে
৭. শতকরা আট ভাগ ক্ষেত্রে বংশগত কারণে হয়ে থাকে।
এ প্রসঙ্গে বলা প্রয়োজন, অনেক বাবা-মা প্রথম সন্তানটি হৃৎপিন্ডের জন্মগত ত্রুটি হওয়ার কারণে দ্বিতীয় সন্তান নেয়ার বেলায় বেশ দ্বিধাদ্বন্দ্বে ভুগে থাকেন। কিন্তু এ সম্ভাবনাটি বহুলাংশেই কম থাকে। তাদের পরবর্তী সন্তানের অনুরূপ সমস্যা হওয়ার সম্ভাবনা ২ থেকে ৫ ভাগ। আর দ্বিতীয় সন্তানেরও এ সমস্যা থাকলে তৃতীয়টির এ সমস্যা হওয়ার সম্ভাবনা ২০ থেকে ২৫ ভাগ।
চিকিৎসা : শরীর নীল হয়ে যাওয়ার মতো সমস্যা দেখা না দিলে বা অন্য বড় কোনো শারীরিক সমস্যা দেখা না দিলে চটজলদি কোনো কিছু করার জন্য ব্যস্ত হবেন না।বাবা-মাকে এক্ষেত্রে সুনির্দিষ্ট কিছু স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে হবে।সর্দি-কাশি হলে নিয়মিত তার চিকিৎসা করানো, নিয়মিত চিকিৎসকের নজরদারিতে থাকা, এটুকুই যথেষ্ট। কিন্তু বড় ধরনের কোনো সমস্যা দেখা দিলে বা শিশুর বৃদ্ধি ব্যাহত হলে তখন তো ব্যবস্থা নিতে হবেই। ভালো ব্যবস্থার অর্থ, বেলুন ভালভোপ্লাস্টি ডিভাইস থেকে শুরু করে পুরোদস্তুর ওপেনহার্ট অপারেশন প্রয়োজন হতে পারে। এর আগে হার্ট ফেইলিওরের অবস্থা থাকলে (হাত-পায়ে পানি আসা শ্বাসকষ্ট হওয়া) সে দিকেই আগে নজর দেবেন চিকিৎসকরা। তবে হৃৎপিন্ডের প্রায়দুই-তৃতীয়াংশ জন্মগত ত্রুটি অপারেশন দ্বারা সারিয়ে তোলা সম্ভব। অন্যান্য ক্ষেত্রে অপারেশনের প্রয়োজন পড়ে না। ইন্টারভেনশন ডিভাইস পদ্ধতিতে এসব ছিদ্র বন্ধ করা সম্ভব।
আর ভরসার কথা হলো, দুনিলয়ের মধ্যবর্তী দেওয়ালের ফুটো ৩০ থেকে ৪০ ভাগ ক্ষেত্রে এমনি এমনিই সেরে ওঠে। বাংলাদেশে এনআইসিভিডি, শেরে বাংলানগরে শিশু বিভাগে হরহামেশাই এ ধরনের শিশুর চিকিৎসা হয়ে থাকে। এছাড়া বেসরকারি ভাবে ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন, বিএসএমএমইউ, আর্মড ফোর্স মিলিটারি হাসপাতালেও সফলভাবে শিশুদের হৃদরোগের ত্রুটির চিকিৎসা করা হয়ে থাকে।
সুত্র - যায়যায়দিন

