শিশুকে কি শাল দুধ খাওয়ানো উচিত?
শাল দুধের হলুদাভ রং এবং ঘনত্ব দেখে অনেকেই মনে করেন, এই দুধ হয়তো শিশু হজম করতে পারবে না। শিশু খুব ভালোভাবেই শালদুধ হজমকরতে পারে এবং এ দুধে প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন-এ ও ডি এবং পরাগ প্রতিরোধেরঅনেক উপকরণ (এন্টিবডি) থাকে। শালদুধ খাওয়ানোর জন্য মায়ের জরায়ুর সংকোচনক্ষমতাও বৃদ্ধি পায় এবং মা দ্রুত স্বাভাবিক স্বাস্থ্যে ফিরে আসেন।
পৃথিবীর সব স্তন্যপায়ী প্রাণীই কিন্তু বাচ্চাকে শালদুধ খাওয়ায়- ফেলে দেয় না; মানুষের ক্ষেত্রেও এর ব্যতিক্রম হওয়ার নয়।কতক্ষণ পর পর শিশুকে বুকের দুধ খাওয়ানো উচিত? শিশু খাবারের জন্য কান্না করলেই তাকে বুকের দুধ খেতে দেয়া উচিত- তা যত ঘনঘনইহোক না কেন। তবে শিশু জন্মের প্রথম কয়েক সপ্তাহ তাকে মোটামুটিভাবে এক ঘণ্টাপরপর বুকের দুধ খেতে দেয়া উচিত। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে শিশুর পাকস্থলী বড়হতে থাকে ও মায়ের বুকের দুধের পরিমাণও বাড়তে থাকে এবং শিশুকে একবার বুকেরদুধ ভরপেট খাওয়ানোর পর আবার খাওয়ানোর বিরতির পরিমাণও বাড়তে থাকে- তবে এবিরতি ২ ঘণ্টার বেশি হয় না। শিশু যদি অসুস্থ থাকে, তাহলে তার খাবারেরচাহিদা স্বাভাবিকভাবেই কমে যেতে পারে।
শিশু যথেষ্ট পরিমাণে বুকের দুধ পাচ্ছে কি না কীভাবে বুঝবেন
সুস্থ-স্বাভাবিকশিশু সাধারণত যতক্ষণ ক্ষুধা থাকে, ততক্ষণ পর্যন্ত বুকের দুধ চুষতে থাকে।পেট ভরে গেলে দুধ চোষা বন্ধ করে দেয়। পেট ভরে গেলে শিশু ঘুমিয়ে পড়ে। শিশুরবয়স একটু বাড়লে পেট ভরার পরও দুধ ছাড়তে চায় না- দুধ মুখে নিয়েই ঘুমায় এবংদুধ সরাতে গেলেই আবার চুষতে থাকে; এটা শিশুর স্বাভাবিক ক্ষুধা নয়- এটাশিশুর একটা অভ্যাস যা প্রশ্রয় না দেয়াই ভালো। এতে শিশুর স্বাভাবিক ঘুম এবংহজমে সমস্যা হয়। মা ও শিশু সুস্থ-স্বাভাবিক থাকলে সাধারণত ১০-১৫ মিনিট (উভয়স্তনে) দুধ খাওয়ানোর পরই শিশুর পেট ভরে যায়।
বয়স অনুপাতে শিশুর ওজন ঠিক মতো বাড়ছে কি না- তাও লক্ষ্য করুন।
শিশুকে বুকের দুধ কীভাবে খাওয়ানো উচিত
শিশুকেমায়ের আসন পাতা কোলে শুইয়ে নিয়ে বুকের দুধ খাওয়াতে হবে। তার বুক এবং মাথাকোমর এবং পা থেকে কিছুটা উপরের দিকে তুলে তাকে দুধ খাওয়ানো উচিত; এতে শিশুস্বাভাবিকভাবে দুধ চুষতে এবং গিলতে পারে। বুকের দুধ পান করার সময় দুধেরবোঁটা এবং বোঁটার চারপাশের কালো অংশের পুরোটাই যেন শিশুর মুখের ভেতরেযায়; এতে শিশু সহজে দুধ চুষতে এবং গিলতে পারে এবং তার পেটে বাতাস কম ঢোকে।জোর করে শিশুর মুখের ভেতর স্তনের বোঁটাসহ কালো অংশ ঢুকিয়ে দেয়া ঠিক হবেনা।
বুকের দুধ খাওয়ানোর সময় শিশুর পেটে কম-বেশি বাতাস ঢুকতে পারে এবং এবাতাস বের না হলে শিশু অস্বস্তিতে ভোগে (যাকে অনেকেই পেট ফাঁপা বলেন) এবংএতে সে বমি করে দিতে পারে। তাই, দুধ খাওয়ানোর পর তাকে খাড়া করে মায়ের বুকেরসঙ্গে লাগিয়ে তার পিঠে হাতের তালু দিয়ে হালকা করে থাপ্পড় (ট্যাপিং) দিতেদিতে কিছুক্ষণ হাঁটাহাঁটি করলে তার পেটের বাতাস পাকস্থলীর ওপরের দিকে উঠেআসে এবং শিশু ঢেকুর দিয়ে তা বের করে দেয়। এতে শিশু আরাম বোধ করে।শিশুর জন্মের পর থেকে তাকে শুধু মায়ের বুকের দুধই খেতে দেয়া উচিত, অন্য কোনোখাবার নয়- এমনকি পানি, মধু বা ডাক্তারের পরামর্শ ছাড়া কোনো ওষুধও নয়।
মায়ের দুধের পাশাপাশি শিশুকে অন্য খাবার কখন দেয়া উচিত
অধিকাংশ বিশেষজ্ঞরাই শিশুর বয়স ৬ মাস হওয়া পর্যন্ত তাকে শুধু বুকের দুধ খাওয়ানোরপরামর্শ দেন। তবে এ নিয়ে কিছু ভিন্ন মতও আছে। অনেক বিশেষজ্ঞই ৬ মাসেরপরিবর্তে শিশুকে ৪ মাস বয়স পার হওয়ার পর থেকেই নিরাপদ বিকল্প খাবারেঅভ্যস্ত করানোর কথা বলেন। যারা ৬ মাসের পক্ষে বলেন, তাদের যুক্তি হল- একজনশিশু কমপক্ষে ৬ মাস বয়স পর্যন্ত পরিপূর্ণভাবে মায়ের বুকের দুধ পাওয়ারকথা-এর বাইরে শিশুর বিকল্প খাবারের কোনো দরকার নেই। যারা ৪ মাসের কথা বলেন, তাদের যুক্তি হল- সব মায়ের বুকেই শিশুর প্রয়োজন অনুযায়ী যথেষ্ট পরিমাণেবুকের দুধ ৬ মাস পর্যন্ত সব সময় তৈরি হবে- এমন গ্যারান্টি দেয়া যাবে না। এক্ষেত্রে শিশুর পরিপূর্ণ পুষ্টির অভাব হওয়ার আশংকাকে উড়িয়ে দেয়া যায় না।কাজেই শিশুর বয়স ৪ মাস হওয়ার পর থেকে তাকে পরিচ্ছন্ন এবং নিরাপদ খাবারেঅভ্যস্ত করালে সমস্যা হওয়ার কথা নয়।
যদি কোনো কারণে শিশু পরিপূর্ণপুষ্টি হচ্ছে না বলে মনে হয়, তাহলে ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী তার বয়স ৬মাস হওয়ার আগেও তাকে বাড়তি খাবার দেয়া যেতে পারে। কখনোই নিজের অনুমান, ইচ্ছা বা ‘অভিজ্ঞতা’র ওপর নির্ভর করে শিশুকে ৬ মাস বয়স পূর্ণ হওয়ার আগেবাড়তি কোনো খাবার দেয়া উচিত হবে না।
শিশু যদি শুধু বুকের দুধের ওপরনির্ভরশীল থাকে, তাহলে তার বয়স ৬ মাস হওয়ার আগে তাকে বাড়তি কিছুই খাওয়ানোউচিত হবে না, এমনকি পানিও না। গরমে যদি শিশু বেশি ঘামে তাহলে তাকে ঘনঘনবুকের দুধ খাওয়াতে হবে। কারণ বুকের দুধের ভেতর যে পানি থাকে তা দিয়েই শিশুরপানিশূন্যতা পূরণ হয়। তবে শিশু যদি বাড়তি খাবারে অভ্যস্ত হয়ে যায়, তাহলেডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে শিশুকে পরিচ্ছন্নভাবে এবংপরিমাণ মতো বাড়তি পানি খাওয়ানো যেতে পারেন।
মায়ের বুকে যদি যথেষ্ট পরিমাণে দুধ না আসে, তাহলে কী করতে হবে
মাযদি পানি বা পানি জাতীয় খাবার কম খান, মায়ের মানসিক অবস্থা যদি শান্ত নাথাকে, মা যদি শারীরিকভাবে অসুস্থ থাকেন, মা যদি বিশেষ কোনো ওষুধ খান- তাহলেবুকের দুধ কমে যেতে পারে। বুকে দুধ কম আসলে মা যে কাজগুলো করতে পারেন তাহল- বেশি পরিমাণে পানি, শরবত এবং রসালো ফল থেকে হবে, শাকসবজিও বেশি খেতেহবে এবং যতটুকু সম্ভব মানসিক টেনশন মুক্ত হয়ে নির্জন পরিবেশে একনিষ্ঠভাবেশিশুকে বুকের দুধ। শিশুকে বুকের দুধ খাওয়ানোর সময় মা অন্যমনস্ক থাকলে দুধখেতে শিশুর কোনো সমস্যা হচ্ছে কি না- সেটি তার নজরে আসে না।
শিশু যতদিনবুকের দুধ পান করে ততদিন পর্যন্ত মা যদি নিজে প্রতিদিন আধা লিটারের মতো দুধপান করেন, তাহলে মায়ের বুকে শিশুর জন্য বেশি পরিমাণে এবং অধিক পুষ্টিকরদুধ তৈরিতে সহায়তা হয়। তাছাড়া ছোট মাছ, কচুশাক, কাঁচাকলা, কলার মোচা ও থোড়-ইত্যাদিতে বেশি পরিমাণে ক্যালসিয়াম এবং আয়রন থাকে বলে এগুলো খেলেস্তন্যদানকারী মায়ের নিজের স্বাস্থ্য যেমন ভালো থাকে তেমনি শিশুও যথেষ্টপরিমাণে বুকের দুধ পেতে পারে। মা বিভিন্ন রকম দেশী ফল যেমন, বরই, আমলকী, আমড়া, বৈঁচি, পেয়ারা, জাম্বুরা, কামরাঙ্গা ইত্যাদি ফল প্রতিদিন পরিমান মতোযদি খান তাহলে মা এবং বুকের দুধ পানকারী শিশু।
মনে রাখা দরকার, শিশুরজন্মের পর থেকেই মাকে বেশি করে সব ধরনের মাছ-মাংস, দুধ, শাকসবজি এবং ফলখাওয়ালে মায়ের স্বাস্থ্য যেমন ভালো থাকে, তেমনি শিশুর জন্য বেশি পরিমাণেবুকের দুধও উৎপন্ন হয়।
শিশুকে বুকের দুধ খাওয়ালে কি মায়ের ‘ফিগার’ নষ্ট হয়ে যায়
এখনপর্যন্ত এ ব্যাপারে কোনো বিজ্ঞানভিত্তিক গবেষণা হয়েছে বলে জানা যায়নি।শরীর বিজ্ঞানের মধ্যে এমন কোনো তথ্য নেই যা থেকে উপসংহার টানা যেতে পারেযে, শিশুকে মায়ের বুকের দুধ খাওয়ালে মায়ের ‘ফিগার’ নষ্ট হয়ে যেতে পারে।
সূত্র – যুগান্তর.কম

