
মনঃরোগঃ ব্যক্তিত্ব সংকট
হিস্ট্রিওনিক বা ড্রামাটিক পারসোনালিটি ডিজঅর্ডার, বাংলায় যাকে আমরা বলতে পারি ‘নাটকীয় ব্যক্তিত্ব সমস্যা’ – একধরনের সমস্যা – যেখানে কপটতাযুক্ত বা আন্তরিকতাহীন অভিনয়ের ছাপ স্পষ্ট। এধরনের পারসোনালিটি ডিজঅর্ডারে সাধারনত কোন ব্যক্তির উগ্র, ক্ষণস্থায়ী এবং বিকৃত আবেগ-অনুভূতি ধরা পড়ে। অন্যের প্রশংসা কিংবা অনুমোদনের উপর নির্ভর করে তাদের নিজের সম্পর্কে উচ্চ ধারনা। যদিও তাতে নিজের সম্পর্কে সঠিক মূল্যায়ন প্রকাশ পায় না। তারা আচ্ছন্ন থাকে কিভাবে অন্যের দৃষ্টি নিজের দিকে আকৃষ্ট করা যায়। এর জন্যে সে সবসময় নাটকীয় কিছু আচরণ করার চেষ্টা করে যদিও তা যথাযথ নয় কিংবা অনুপযুক্ত।
এধরনের ব্যক্তিত্ব সমস্যা সাধারনতঃ পুরুষের তুলনায় মেয়েদের মধ্যে বেশি দেখা যায়। যার প্রকাশ ঘটে শৈশবে নয়তো বয়োঃসন্ধিকালে।
লক্ষণঃ
প্রায় ক্ষেত্রেই হিস্ট্রিওনিক পারসোনালিটি ডিজঅর্ডারের আক্রান্ত ব্যক্তিদের সামাজিক দক্ষতা থাকে অত্যন্ত চমৎকার। আর এই দক্ষতাই সে কাজে লাগায় নিজ কার্যসিদ্ধির জন্যে কিংবা নিজেকে অন্যের দৃষ্টির কেন্দ্রবিন্দুতে নিয়ে আসার কাজে।
আরো যা প্রকাশ পায়ঃ
v নিজেকে অন্যের দৃষ্টির বা আকর্ষনের কেন্দ্রবিন্দুতে নিয়ে না আসা পর্যন্ত সে অস্বস্তিতে ভুগতে থাকে।
v উস্কানিপ্রদ (রংচঙ্গে, উত্তেজক, উদ্ভট ধরনের) পোষাক পরিধান করে এবং সেটা অযাচিতভাবে প্রদর্শন করে
v প্রেমবিলাসি ও প্রলুব্ধকর আচরন করে।
v দ্রুত আবেগ পরিবর্তন করে।
v নাটকীয়ভাবে কাজ করে দর্শকদের মনযোগ আকর্ষনের চেষ্টা করে। তবে তার এই আচরনে অতিরঞ্জিত আবেগ প্রকাশ পায় যাতে আন্তরিকতা বা সততার অভাব স্পষ্ট।
v চেহারা-শরীর প্রদর্শনে অতি উৎসাহী।
v তার কাজ বা এই প্রদর্শন দর্শক/সহকর্মী/সহযোগীদের পছন্দ কি না তা বারবার জানতে চায়।
v এর ফলে সহজে প্রতারিত হয় এবং অন্যের দ্বারা খুব সহজে প্রভাবিত হয়।
v সমালোচনা একদম সহ্য করতে পারে না।
v হতাশায় ভেঙ্গে পড়ে এবং অল্পতেই বিরক্ত হয়। কোন কাজ বা প্রকল্প শুরুর পর শেষ না করেই অসমাপ্ত রেখে দেয় কিংবা কাজের একটা স্তর শেষ না করেই অন্য স্তরে চলে যায়।
v কাজ করার পূর্বে ভাবে না।
v হঠাৎ সিদ্ধান্ত নেয়।
v আত্মকেন্দ্রিক এবং খুব কম ক্ষেত্রেই অন্যের প্রতি মনযোগ প্রদর্শন করে।
v সম্পর্ক বজায় রাখতে পারে না। অন্যের সাথে বোঝাপড়ায় মেকী ভাব প্রদর্শন করে।
v কোন কিছু তার চাওয়ার বাইরে গেলেই আত্মহত্যার ভয় দেখায় বা আত্মহত্যার প্রচেষ্টা নেয়।
কেন হয়
হিস্ট্রিওনিক পারসোনালিটি ডিজঅর্ডার কেন হয়, এর সঠিক কারন এখনো অজানা। তবে অনেক মনঃরোগবিদই মনে করেন এটা শিশুকাল থেকেই দেখে আসা, শিখে আসা কোন নেতিবাচক ফল কিংবা বংশগত বা উত্তরাধিকারসূত্রে প্রাপ্ত। আবার পারিপার্শ্বিক কিছু ফ্যাক্টর এক্ষেত্রে দায়ী হতে পারে। যেমন বাবা-মা’র কিংবা অভিভাবকদের অতিরিক্ত প্রশ্রয়, সব কাজেই বাহবা দেয়া, নেতিবাচক আচরন বাবা-মা কর্তৃক এড়িয়ে যাওয়া ইত্যাদি। আমরা আগেই বলেছি যে, ব্যক্তিত্ব সমস্যা সাধারনত কোন ব্যক্তির শারীরিক বা মানসিক প্রকৃতি বা ধাত কেমন, সে কিভাবে শিক্ষা লাভ করেছে, তার মানসিকতার ধরন কেমন, চাপকে কিভাবে মোকাবেলা করে সে বড় হয়েছে ইত্যাদির উপর নির্ভর করে।
কিভাবে সনাক্ত করা যায়
উপরোক্ত লক্ষণ প্রকাশ পেলে একজন ডাক্তার পূর্নাংগ মেডিকেল এবং সাইকিয়াট্রিক ইতিহাস নিয়ে মূল্যায়ন করবেন। যদি শারীরিক সমস্যা বা লক্ষণ প্রকাশ পায়, সেক্ষেত্রে বিভিন্ন ধরনের শারীরিক পরীক্ষা-নীরিক্ষা, ল্যাবোরেটরী টেস্ট করিয়ে নিতে পারেন। আর শারীরিক সমস্যা না থাকলে কোন দক্ষ সাইকিয়াট্রিস্ট কিংবা সাইকোলোজিস্টের কাছে তাকে রেফার করতে পারেন। তিনি প্রয়োজনীয় টুল ও বিশেষ সাক্ষাৎকারের মাধ্যমে তার পারসোনালিটি ডিজঅর্ডারের ধরন নির্ণয় করবেন।
চিকিৎসা
সাধারনভাবে হিস্ট্রিওনিক পারসোনালিটি ডিজঅর্ডারের আক্রান্ত ব্যক্তিরা তার জন্য কোন থেরাপির প্রয়োজন আছে বলে বিশ্বাস করে না। যেহেতু রুটিন কাজে তাদের অনিহা থাকে সেহেতু তাদের জন্য নিয়ম মেনে চিকিৎসা গ্রহণ বা করানো বেশ কঠিন। তবে কখনো কখনো তারা সহায়তা চাইতে পারে বিশেষত যখন তারা সম্পর্ক ভেঙ্গে যাওয়াজনিত কিংবা ব্যার্থ হওয়াজনিত কারনে বা অন্য যেকোন কারনে হতাশায় নিমজ্জিত হয়।
সাইকোথেরাপি বা কাউন্সেলিং এর মাধ্যমে তার ভয়, চিন্তা-চেতনার বৈসাদৃশ্যমূলক অবস্থান তার কাছে তুলে ধরে তাকে বাস্তবতায় নিয়ে আসার চেষ্টা করা হয়। অন্যের সাথে ইতিবাচক পদ্ধতিতে তুলনা করে তার অবস্থানকে দেখিয়ে দেয়া হয় যাতে সে বাস্তবতা বুঝতে পারে। কোন কোন ক্ষেত্রে মেডিকেশনের দরকার হতে পারে। যেমন এ্যাঞ্জাইটি, ডিপ্রেশন ইত্যাদির ক্ষেত্রে কিছু কিছু ওষুধ কিংবা সাপ্লিমেন্ট দেয়া যেতে পারে।

