মেনিনজাইটিস লক্ষণ ও কারণ
০৩ মার্চ, ১৪
Viewed#: 181
জামালপুর শহরের ১০ বছরের রিয়া ৫ম শ্রেণীর ছাত্রী। হঠাৎ তার কানে, গলায় ও নাকে প্রচণ্ড ব্যথা হল এবং ব্যথানাশক ওষুধ সেবনে ভালো হয়ে গেল। পরের দিন আবারও সেই ব্যথা। শরীরের ভারসাম্য রক্ষা করতে পারছে না। রিয়ার আত্মীয়স্বজন তাকে নাক, কান ও গলা বিশেষজ্ঞের কাছে নিয়ে গেলেন। পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর ডাক্তার জানালেন রিয়ার মেনিনজাইটিসে আক্রান্ত হওয়ার মতো উপসর্গ দেখা দিয়েছে। দেরি না করে দ্রুত ময়মনসিংহ মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালে ভর্তি করান। মেনিনজাইটিসের চিকিৎসা শুরু হল।
লক্ষণ : অনেক ক্ষেত্রে লক্ষণ প্রকাশের ১২ ঘণ্টার মধ্যেই মেনিনজাইটিসের রোগী মারা যায়। তীব্র মাথা ব্যথার সঙ্গে থাকে স্মৃতি বিভ্রম, বমি-বমি ভাব, আলোর দিকে তাকাতে না পারা, অস্বস্তি, শরীরে বিশেষ দাগ। মূর্ছা যাওয়া, ঘুম পাওয়া, শরীরের ভারসাম্য হারানো এবং গলার মাংস শক্তি হয়ে যাওয়াও মেনিনজাইটিসের লক্ষণ।
কারণ ও প্রকারভেদ : অধিকাংশ ক্ষেত্রে মেনিনজাইটিসের কারণ হল বিভিন্ন ধরনের ভাইরাস, ব্যাকটেরিয়া, ফাঙ্গাশ, প্রোটোজোয়া প্রভৃতি। বিভিন্ন ধরনের ওষুধের প্রতিক্রিয়ায় বা ক্যান্সারের কারণেও মেনিনজাইটিস হতে পারে।
ব্যাকটেরিয়াল মেনিনজাইটিস : বয়সভেদে ভিন্ন ভিন্ন ব্যাকটেরিয়া ব্যাকটেরিয়াল মেনিনজাইটিসের জন্য দায়ী। সদ্যজাত থেকে শুরু করে ৩ মাস বয়সী শিশুর ক্ষেত্রে প্রধানত গ্র“প-বি স্ট্রেপটেকক্কাই ও লিস্টেরিয়া মনোসাইটোজিনেসিস দ্বারা মেনিনজাইটিস হয়ে থাকে।
ভাইরাল মেনিনজাইটিস : ভাইরাসজনিত মেনিনজাইটিস ব্যাকটেরিয়াজনিত মেনিনজাইটিসের চেয়ে কম ক্ষতিকারক। ভাইরাল মেনিনজাইটিসের জীবাণু এন্টেরোভাইরাসের বাইরেও কিছু ভাইরাস এ রোগ সৃষ্টি করে যা মশার মাধ্যমে একজনের থেকে অন্যজনের কাছে ছড়াতে পারে।
ফাঙ্গাল মেনিনজাইটিস : ফাংগাল মেনিনজাইটিসের জীবাণু ক্রিপটোকক্কাস নিউফরমান্স। রোগ প্রতিরোধকারী ক্ষমতা হ্রাসের ওষুধ সেবনকারী, এইডস/এইচআইভি আক্রান্ত রোগী ও বয়স্ক মানুষ ফাংগাল মেনিনজাইটিসের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। ফাংগাল মেনিনজাইটিসের প্রকোপ আফ্রিকা মহাদেশে বেশি ।
প্যারাসাইটিক মেনিনজাইটিস : মেরুদণ্ডের হাড় থেকে সংগৃহীত রসে বা সেরেব্রো স্পাইনাল ফ্লুইডে ইসোনোফিল পাওয়া যায়।
জীবাণুবিহীন মেনিনজাইটিস : জীবাণুর বাইরেও কিছু কারণে মেনিনজাইটিস হতে পারে। এর মধ্যে ক্যান্সারের কিছু বিশেষ ওষুধ সেবন (ব্যথা ও প্রদাহবিরোধী ওষুধ, ইমিউনোগ্লোবিন, জীবাণুবিরোধী ওষুধ), সারকোডিয়াসিস, কানেকটিভ টিস্যু ডিজঅর্ডার, সিস্টেমিক লুপাস ইরাথে মেটাসাস উল্লেখযোগ্য। কোনো কোনো ক্ষেত্রে মাইগ্রেন থেকেও মেনিনজাইটিস হতে পারে যদিও এ হার অনেক কম।
কীভাবে হয় : তিন স্তর বিশিষ্ট মেনিনজেস এবং সেরেব্রোস্পাইনাল ফ্লুইড মস্তিষ্ক ও স্পাইনালকর্ডকে আবরণ প্রদান করে প্রতিরক্ষা দেয়। ব্যাকটেরিয়াল মেনিনজাইটিসের ক্ষেত্রে রক্ত প্রবাহ বা নাসারন্ধ্রের মাধ্যমে ব্যাকটেরিয়া মেনিনজেসের সংস্পর্শে আসে এবং পরে প্রদাহ সৃষ্টি করে। নবজাতকের রক্ত গ্র“প-বি স্ট্রেপটোকক্কিতে আক্রান্ত হলে শতকরা ২৫ ভাগ ক্ষেত্রে মেনিনজাইটিস হওয়ার আশংকা থাকে। রক্ত প্রবাহে ব্যাকটেরিয়া প্রবশ করলে তা সাবএরাকনয়িড স্পেসে চলে যায় এবং এই স্পেসটি হল ব্লাড ব্রেইন বেরিয়ারের সবচেয়ে সংবেদনশীল এবং ঝুঁকিপূর্ণ স্পেস।
মেনিনজাইটিসে যে মারাত্মক প্রদাহ হয় তার কারণ ব্যাকটেরিয়ার সরাসরি আক্রমণ নয় বরং ব্যাকটেরিয়া কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্রে অনুপ্রবেশের ফলে শরীরের রোগ প্রতিরোধকারী সিস্টেমের প্রতিরোধের চেষ্টা হয়।
মস্তিষ্কে ব্যাকটেরিয়ার কোষের উপস্থিতি নিশ্চিত হলে শরীরের রোগ প্রতিরোধকারী সিস্টেম বেশি পরিমাণ সাইটোকাইন ও হরমোন জাতীয় পদার্থ নিঃসরণ করে- এতে ব্লাড ব্রেইন বেরিয়ার দুর্ভেদ্য থেকে ভেদ্য হয়ে উঠে এবং রক্তনালি থেকে তরল নির্গত হয়ে মস্তিষ্ক ফুলে ওঠে। এ অবস্থায় শ্বেত রক্ত কণিকা সেরেব্রো স্পাইনাল ফ্লুইডে প্রবেশ করে এবং প্রদাহ আরও তীব্রতর হয়ে ওঠে। একবারে শেষ পর্যায়ে মস্তিষ্কের কোষ অক্সিজেন প্রাপ্তি হতে বঞ্চিত হয় এবং তখন রোগী মৃত্যুবরণ করে।
কীভাবে ছড়ায় : সংস্পর্শে মেনিনজাইটিস দ্রুত ছড়াবে না, ভাইরাল ও ব্যাকটেরিয়াল মেনিনজাইটিস নাক ও গলার নিঃসরণের সরাসরি সংস্পর্শে একজনের কাছ থেকে অন্যজনের কাছে ছড়াতে পারে। মেনিনজাইটিস রোগের কোনো উপসর্গ ছাড়াই এ রোগের জীবাণু কেউ বহন করতে পারে এবং তার ব্যবহৃত গ্লাস, থালা-বাসন বা সিগারেট ভাগাভাগির মাধ্যমে অন্যজন সংক্রমিত করতে পারে। ভাইরাল মেনিনজাইটিস মলের মাধ্যমে একজন থেকে অন্যজনে ছড়াতে পারে।
টিকা : হেমোফিলাস ইনফ্লুয়েঞ্জা টাইপ-বি-এর টিকা অন্তর্ভুক্ত করেছে। কারণ এ জীবাণু ইনফ্লুয়েঞ্জার পাশাপাশি মেনিনজাইটিস সৃষ্টিতে ভূমিকা রাখে। মাম্পস ভ্যাকসিন মেনিনজাইটিস প্রতিরোধ করে। মেনিনগোকক্কাস ভ্যাকসিন গ্রুপ-এ, সি, ডাব্লিও-১৩৫ এবং ওয়াই মেনিনজাইটিসের বিরুদ্ধে কার্যকরী প্রতিরোধ গড়ে তোলে যা সর্বোচ্চ প্রতিরক্ষা নিশ্চিত করে।
সূত্র - দৈনিক যুগান্তর