যক্ষ্মা নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচির বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছেন শ্রমিকরা। বিশেষ করে ‘মাইগ্রেট’ শ্রমিকরা এখন জীবাণু বহনে ভূমিকা রাখছেন বেশি। তারা যখন কর্মস্থল থেকে গ্রামের বাড়ি বা অন্য কোথাও যাচ্ছেন, সঙ্গে নিয়ে যাচ্ছেন যক্ষ্মার জীবাণু। চিহ্নিত হওয়ার আগে এভাবেই তারা ছড়াচ্ছেন রোগটি। আক্রান্ত হচ্ছেন অন্য কেউ। যক্ষ্মা নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচির সঙ্গে সম্পৃক্ত কর্তৃপক্ষ এদের ‘ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠী’ হিসেবে বিবেচনা করছে। তারা বলছেন, সমপ্রতি বিষয়টি ধরা পড়েছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের যক্ষ্মা নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচির লাইন ডিরেক্টর ডা. মো. আশিক হোসাইন বলেন, বিষয়টি আমাদের নজরে এসেছে। এটা ঠিক, গার্মেন্টসহ বিভিন্ন শিল্পকারখানার শ্রমিকদের মধ্যে যক্ষ্মার জীবাণু বেশি। আর তারা যখন শহরের বাইরে যাচ্ছেন, তখন সেটি সঙ্গে করে নিয়ে যাচ্ছেন এবং এতে তার পরিবার কিংবা প্রতিবেশীরা আক্রান্ত হচ্ছেন। এটি যক্ষ্মা নিয়ন্ত্রণে অন্যতম বাধা। তাদের লক্ষ্য রেখে আমরা একটি ‘ওয়ার্ক প্লান’ তৈরি করছি। শিগগিরই কর্মীদের প্রশিক্ষণ দেয়া হবে এ ক্ষেত্রে কাজ করার জন্য। যক্ষ্মা নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচির সঙ্গে সম্পৃক্ত বেসরকারি সংস্থা ব্র্যাকের স্বাস্থ্য, পুষ্টি ও জনসংখ্যা কর্মসূচির মুন্সীগঞ্জের সিনিয়র জেলা ব্যবস্থাপক সুব্রত কুমার বিশ্বাস বলেন, মোটা দাগে মাইগ্রেট শ্রমিকদের বিষয়টি এখন আলোচনায় আসছে। বিভিন্ন স্থানে যক্ষ্মার জীবাণুর বাহক হিসেবে অনুসন্ধানে তাদের সম্পৃক্ততা নিশ্চিত হওয়া গেছে। এ জন্য কর্মসূচিতে তাদের স্বাস্থ্য সুরক্ষার প্রতি নজর বাড়ানোর প্রতি জোর দেয়া হচ্ছে। সমপ্রতি মুন্সীগঞ্জের গজারিয়া যক্ষ্মা নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচি দেখতে গেলে স্থানীয় স্বাস্থ্য সংশ্লিষ্টরা জানান, সেখানে যারা আক্রান্ত হচ্ছেন তাদের বেশির ভাগই মাইগ্রেট জনগোষ্ঠী। উপজেলার চর বাউশিয়া বড়কান্দির গাড়িচালক আবুল কাশেম (৫৫) কিংবা আলীপুরার আফজাল চৌধুরী (৪০) কেউই বাড়ি বসে যক্ষ্মার জীবাণুতে আক্রান্ত হননি। তাদের মতো অনেকই ঢাকা থেকে নিয়ে গেছেন এ জীবাণু। এ এলাকার আক্রান্ত অনেকে কাজ করেন ঢাকার গার্মেন্টে বা শিল্পকারখানায়। আক্রান্ত হওয়ার পর তারা বাড়িতে। আফজাল চৌধুরী বলেন, গাজীপুর ও ঢাকার বিভিন্ন গার্মেন্টের শ্রমিকরা বাড়ি আসার পর বা এখানকার স্থানীয় শিল্পকারখানায় কাজে যোগ দেয়ার পর রোগী হিসেবে ধরা পড়েছেন। তাদের মাধ্যমে রোগ ছড়িয়ে অন্যরা আক্রান্ত হচ্ছেন।
মেঘনা নদী অববাহিকার চর উপজেলা গজারিয়ায় সরকার ও ব্র্যাক যৌথভাবে যক্ষ্মা নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচিতে কাজ করছে। ওষুধ সরবরাহ, স্বাস্থ্যকর্মী, স্বাস্থ্যসেবিকা দিয়ে সেবাকার্যক্রম চালাচ্ছে ব্র্যাক আর ল্যাব সাপোর্ট দিচ্ছে সরকার। স্থানীয় উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ডটস কর্মসূচির আওতায় এ সেবা দেয় সরকার। ব্র্যাকের কর্মীরা স্থানীয়দের স্বাস্থ্যসচেতন করতে স্বাস্থ্য ফোরাম-এর মাধ্যমে কাজ করেন। তারা প্রসূতিসেবা, পরিবার পরিকল্পনা, টিকা, সেনিটেশন, পুষ্টিসহ বিভিন্ন বিষয়ে চরের মানুষকে সচেতন করেন। বিশেষ করে যক্ষ্মা নিয়ে ফোরামের প্রতি বৈঠকে আলোচনা করা হয়। উপজেলার ৮টি ইউনিয়নের ১১ জন স্বাস্থ্যকর্মীর একজন মীরা রানী। তাকে প্রতি মাসে একটি ফোরামে ৩টি করে ৬০টি বৈঠকে স্বাস্থ্যসচেতন করতে নিয়মিত কথা বলতে হয়। ‘কাউকে সচেতন করতে পারলে ভাল লাগে। যখন দেখি, কেউ আমার ছড়িয়ে দেয়া ‘মেসেজ’ অন্যের কাছে পৌঁছে দিচ্ছে। নিজেই বলতে পারছে কোন রোগের জন্য তাকে কি করতে হবে, তখন অনুভূতিটা হয় অন্যরকম-’ বললেন তিনি। প্রতি মাসে এভাবে ফোরাম করার কারণে মানুষ সচেতন হচ্ছে। যক্ষ্মা সম্পর্কে জানতে পারছে। কাশি-জ্বর-বুকে ব্যথা হলে কফ পরীক্ষা করতে আসছেন টডস সেন্টারে। অথচ আগে তাদের খুঁজে আমাদের যেতে হতো ঘরে ঘরে। একে কেউ আমলে নিতো না। কিন্তু এখন সেই দৃশ্য পাল্টে গেছে। তবে সংশ্লিষ্টরা গত ৩ বছরের পরিসংখ্যান দিয়ে বলছেন, এ উপজেলায় দিন দিন যক্ষ্মা রোগীর সংখ্যা বাড়ছে। ২০১১ সালে ১৮১ রোগীর সন্ধান পেলেও গত বছরে পাওয়া গেছে ২৬৭ জন। এ প্রসঙ্গে সিনিয়র উপজেলা ব্যবস্থাপক আমিরুল ইসলাম বলেন, কর্মসূচির আওতা বাড়ায় সংখ্যা বেড়েছে। পাশাপাশি সংক্রমণের হারও বেড়েছে। নতুন করে আক্রান্ত হচ্ছেন অনেকে। শ্রমিকদের মধ্যেই আক্রান্তের প্রবণতা বেশি। তিনি বলেন, বাড়ছে এটা ঠিক, তবে আমরা আশাবাদী একসময় রোগীর সংখ্যা কমবে।
সূত্র - দৈনিক মানবজমিন

