আধুনিক সমাজের নানান চাহিদায় দিন দিন ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে মানুষের সহজাত পরার্থপরতা। একটা শিশু বিশাল হূদয় নিয়ে জন্মালেও এই সমাজ একসময় তাদের স্বার্থপর দৈত্যে পরিণত করছে। ‘কনজিউমারিজম’ বা ভোক্তা-সংস্কৃতিতে অভ্যস্ত হওয়ার মধ্য দিয়েই শিশুরা এই নেতিবাচক পরিবর্তনের পথে হাঁটতে শুরু করে।
কোমলমতি একটা শিশুর পরার্থপরতা, মানুষ হিসেবে বেড়ে ওঠার সম্ভাবনার মৃত্যু ঘটতে থাকে, লোভ আর উদ্বেগের চাপে হাঁসফাঁস করতে শুরু করে সে। একসময় ওই শিশুই সামাজিক চাপে ন্যুব্জ এক প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তি হয়ে ওঠে। দীর্ঘদিনের গবেষণালব্ধ উপলব্ধিকে এভাবেই নতুন এক বইয়ে লিপিবদ্ধ করেছেন ব্রিটিশ মনোচিকিত্সক গ্রাহাম মিউজিক। দ্য গার্ডিয়ান বইটি সম্পর্কে জানিয়েছে।
মনোচিকিত্সক গ্রাহাম মনে করেন, দিন দিন নানা পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে আগের চেয়ে আরও বেশি বৈষম্যমূলক সমাজের দিকে ধাবিত হওয়ার এই যুগ আমাদের নির্লিপ্ত, কঠিন বানিয়ে দিচ্ছে। শিশু অবস্থায় আমরা অনেক বিশাল হূদয় নিয়ে জন্মালেও একসময় আমরা নির্লিপ্ত হূদয়ের শীতল ও স্বার্থপর মানুষে পরিণত হই।
লন্ডনের টাভিস্টক অ্যান্ড পোর্টম্যান ক্লিনিকের এই মনোচিকিত্সক বলেন, ‘সমাজের অন্যান্য মানুষের সঙ্গে আমাদের সম্পর্কের ক্ষেত্রে আমরা সহানুভূতি এবং বিবেচনাবোধ হারিয়ে ফেলছি।’
‘জীবনের গতি এবং তা থেকে সৃষ্টি হওয়া উদ্বেগের মারাত্মক প্রভাব পড়ে সমাজের অপরাপর মানুষের সঙ্গে আমাদের মেলামেশায়, অন্যদের সঙ্গে আমাদের সম্পর্কের ওপর। এর অনেক অনেক প্রমাণ তো আছেই আর নিজেদের জীবন থেকেও আমরা সবাই এটা জানি। আপনি এখন “কাকে কাকের মাংস খাওয়া” সমাজে বসবাস করছেন এবং মাত্রাতিরিক্ত চাপে থাকা এবং সারাক্ষণ চোখ-কান খোলা রাখা ছাড়া এখানে টিকে থাকার কোনো সুযোগই নেই। ওই চাপ থেকেই আচরণগত কিছু সত্যিকারের মৌলিক পরিবর্তন ঘটে যায়, আর স্বাস্থ্য থেকে শুরু করে আয়ুষ্কাল আর জীবনের সুখ, সবই ঘুরপাক খেতে থাকে ওই পাকের চক্রে।’
যুক্তরাষ্ট্রের মিশিগান বিশ্ববিদ্যালয়ের গত বছরের এক গবেষণায় উঠে এসেছে—বিনোদনের নামে টেলিভিশনের রিয়েলিটি শোগুলোতে দেখানো বিশ্রী ঝগড়াঝাঁটি আর পঙ্কিল বিচার দেখে দেখে শিশু-কিশোরেরা সামাজিকভাবে আরও বেশি আগ্রাসী হয়ে উঠছে। মনোচিকিত্সক গ্রাহাম মিউজিক বলেন, ‘আমরা কতটা নির্লিপ্ত হূদয় হয়ে গেছি তার নিদারুণ দৃষ্টান্ত হচ্ছে ব্রিটেনের “এক্স-ফ্যাক্টর” বা “গট ট্যালেন্ট”-এর মতো টেলিভিশন শোগুলো।’
দ্য গুড লাইফ: ওয়েলবিয়িং অ্যান্ড দ্য নিউ সায়েন্স অব অলট্রুইজম, সেলফিশনেস অ্যান্ড ইমমরালিটি নামে গ্রাহাম মিউজিকের নতুন বইটি এই মাসের শেষেই বাজারে আসার কথা। যুক্তরাজ্যে চলমান সামাজিক ভারসাম্যহীনতা বিষয়ে প্রকাশনায় সর্বশেষ সংযোজন বলা যেতে পারে একে। বিগত দশকগুলোর নানা সামাজিক গবেষণা এবং মনোচিকিত্সক হিসেবে গ্রাহামের নিজের অভিজ্ঞতার আলোকে পাশ্চাত্য সমাজের এক ধূসর ছবি উঠে এসেছে এ বইতে।
মনোচিকিত্সক গ্রাহাম মিউজিক বলেন, ‘আমাদের পরার্থপরতার ওপর জীবনের গতির ব্যাপক প্রভাব আছে। এটা পুরো সমাজের মতো আমাদের স্কুলগুলোতেও চলছে। মারাত্মকভাবে একাডেমি-নির্ভর পাঠ্যক্রম এবং একটা পরীক্ষার সংস্কৃতি চেপে বসেছে আমাদের স্কুলগুলোতে। আমার ক্লিনিকে আসা শিশুদের দেখে আমি সত্যিই ভীষণ চিন্তিত হয়ে পড়ি।’
এই লেখক ও মনোচিকিত্সক বলেন, ‘ভীষণ রকমভাবে অর্থনির্ভর পশ্চিমা বিশ্ব দিন দিন সামাজিক দায়বদ্ধতাগুলো থেকে আমাদের আরও বেশি বিচ্ছিন্ন করে ফেলছে।’
সূত্র - প্রথম আলো

