দেশে ক্যানসারের আধুনিক চিকিৎসার সুযোগ তৈরি হয়েছে। তবে খুব কম মানুষ এই সুযোগ পাচ্ছে। এই রোগের ব্যয়বহুল ও দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসায় অনেক পরিবার নিঃস্ব হয়ে যায়। স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম বলেছেন, দরিদ্র রোগীদের চিকিৎসায় সরকার স্বাস্থ্যবিমা চালুর উদ্যোগ নেবে।
গতকাল রোববার প্রথম আলো কার্যালয়ে ‘ক্যানসার চিকিৎসায় বাংলাদেশ’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে স্বাস্থ্যমন্ত্রী এ কথা বলেন। বেসরকারি ইউনাইটেড হাসপাতালের সহযোগিতায় প্রথম আলো এই বৈঠকের আয়োজন করে।
বৈঠকে অংশগ্রহণকারী বিশেষজ্ঞরা বলেন, সরকারি হাসপাতালে রোগীর চাপ বেশি। ক্যানসার চিকিৎসার ব্যয় বহন করা সরকারের একার পক্ষে সম্ভব না। সরকারের সঙ্গে বেসরকারি উদ্যোগের অংশীদারি গড়তে হবে। ধনী ব্যক্তিরাও সহায়তার উদ্যোগ নিতে পারেন। জনসচেতনতা বাড়ানোর মাধ্যমে ক্যানসার প্রতিরোধ করতে হবে।
বৈঠকের প্রধান অতিথি মোহাম্মদ নাসিম বলেন, আগে ধনাঢ্য ব্যক্তিরা স্কুল, কলেজ বা হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা করতেন। এখন গার্মেন্টস কারখানার মালিক ব্যবসায় লাভ করলে আরেকটি কারখানা খোলেন, কোনো হাসাপাতাল প্রতিষ্ঠা করেন না। তিনি বলেন, গত সরকারের আমলে জাতীয় স্বাস্থ্য কাউন্সিলের সভা মাত্র একবার বসেছিল। খুব শিগগির প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বাধীন কাউন্সিলের সভা আয়োজন করে তাতে দরিদ্রদের চিকিৎসা ব্যয় নির্বাহ করার জন্য স্বাস্থ্যবিমার বিষয়ে আলোচনা করা হবে।
এ দেশে প্রথম কুমুদিনী হাসপাতালে বিনা মূল্যে ক্যানসার চিকিৎসা শুরু হয় উল্লেখ করে বিএসএমএমইউর উপাচার্য অধ্যাপক প্রাণ গোপাল দত্ত বলেন, ব্যয় ভাগাভাগি (কস্ট শেয়ারিং) ছাড়া সরকারের একার পক্ষে দেশের ক্যানসার রোগীদের চিকিৎসা দেওয়া সম্ভব না। অংশীদারির কথা বলা হলেও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান সরকারের সঙ্গে কাজ করার জন্য এগিয়ে আসছে না।
ইউনাইটেড হাসপাতালের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ফরিদুর রহমান খান বলেন, ক্যানসার চিকিৎসায় নার্সের ভূমিকা বড়, তাঁদের প্রশিক্ষণ দরকার। ক্যানসার বিষয়ে গবেষণাও বেশি হওয়া দরকার। সরকারি- বেসরকারি হাসপাতাল চিকিৎসার ক্ষেত্রে একে অন্যকে সহায়তা করতে পারে। তিনি দাবি করেন, বিদেশে চিকিৎসা ব্যয়ের প্রায় অর্ধেক ব্যয়ে দেশে আধুনিক ও উন্নত চিকিৎসার সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। রোগীদের এখন ক্যানসার চিকিৎসায় বাইরে যাওয়ার প্রয়োজন অনেক কম।
ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের রেডিওথেরাপি বিভাগের প্রধান অধ্যাপক মো. মোয়াররফ হোসেন বলেন, প্রতি তিনজন মানুষের একজন জীবনের কোনো না কোনো সময়ে ক্যানসারের শিকার হয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মানদণ্ড অনুয়ায়ী প্রতি ১০ লাখ মানুষের জন্য একটি ক্যানসার কেন্দ্র দরকার। বাংলাদেশে ১৬০টি কেন্দ্র থাকা দরকার, আছে ২০টি।
জাতীয় ক্যানসার গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও হাসপাতালের (এনআইসিআরএইচ) পরিচালক শেখ গোলাম মোস্তফা বলেন, দেশে ১২-১৩ লাখ মানুষ ক্যানসারে আক্রান্ত। কিন্তু সরকারি পর্যায়ে ক্যানসার ইনস্টিটিউট ও মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় ছাড়া মাত্র আটটি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে এর চিকিৎসার সুয়োগ আছে।
ইউনাইটেড হাসপাতালের ক্যানসার কেয়ার সেবা কেন্দ্রের পরিচালক অধ্যাপক শান্তনু চৌধুরী বলেন, দেশে ক্যানসার রেজিস্ট্রি নেই। কত রোগী আছে, কোন রোগী কোন স্তরে আছে—এসব তথ্য এক জায়গায় নেই। তিনি বলেন, নার্স, মেডিকেল অনকোলজিস্ট ও মেডিকেল পদার্থবিদদের প্রশিক্ষণের দরকার। ভারতে বিনা মূল্যে কেমোথেরাপি দেওয়া হয় না। ‘জীবনদায়ী যোজনা’ কর্মসূচির আওতায় দরিদ্রদের বিনা মূল্যে বা কম মূল্যে ক্যানসার চিকিৎসা দেওয়া হয়।
অনুষ্ঠানের সঞ্চালক ও প্রথম আলোর সহযোগী সম্পাদক আব্দুল কাইয়ুম বলেন, সিটিস্ক্যান অতি ব্যবহারের কারণে ক্যানসারের প্রকোপ বাড়ছে বলে গবেষণায় দেখা গেছে। কিন্তু দেশে এর ব্যবহারে কোনো নীতিমালা নেই। তিনি ক্যানসার নিয়ে একটি জাতীয় জরিপের প্রয়োজনীয়তার কথাও বলেন। তাঁকে সঞ্চালনায় সহযোগিতা করেন ইউনাইটেড হাসপাতালের ক্লিনিক্যাল পরিচালক দবির উদ্দিন আহমেদ।
জাতীয় ক্যানসার ইনস্টিটিউটের মেডিকেল অনকোলজি বিভাগের প্রধান অধ্যাপক পারভীন সাহিদা আকতার বলেন, ক্যানসার চিকিৎসার জন্য রোগীকে শারীরিক, মানসিক ও আত্মিকভাবে প্রস্তুত করতে হয়। কিন্তু এর জন্য যে জনবল দরকার সরকারের তা নেই, বিশেষ করে নার্সের অভাব প্রকট। তিনি বলেন, ক্যানসার রোগীদের রক্তসহ অন্যান্য বিষয়ের পরীক্ষা-নিরীক্ষার দরকার হয়। কিন্তু ৯৫ শতাংশ পরীক্ষা হাসপাতালের বাইরে থেকে করাতে হয়। এটা রোগীর জন্য বড় চাপ।
হলি ফ্যামিলি রেড ক্রিসেন্ট মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সার্জারি বিভাগের প্রধান আহমেদ সাঈদ বলেন, কারও ক্যানসার নির্ণয় হলে সেই ব্যক্তি, তার পরিবার, সমাজ ব্যাপক দুশ্চিন্তার মধ্যে পড়ে। তিনি বলেন, প্রতিরোধ করাই শ্রেয় এবং তা সম্ভব। সাধারণ মানুষকে ক্যানসার বিষয়ে সচেতন করা দরকার। এ ক্ষেত্রে গণমাধ্যমের ভূমিকা অনেক। পাশাপাশি ধূমপান ও পরিবেশ দূষণ রোধে আইন প্রয়োগেরও প্রয়োজন আছে।
দীর্ঘদিন ক্যানসারের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে বেঁচে থাকা চট্টগ্রামের সানশাইন এডুকেশন গ্রুপের চেয়ারম্যান অধ্যাপিকা শাফিয়া গাজী রহমান বলেন, তাঁর ক্যানসার নির্ণয় হয় সিঙ্গাপুরের ন্যাশনাল হাসপাতালে। রোগ নির্ণয়ের পর চিকিৎসক শাফিয়াকে দেড় ঘণ্টা ধরে বুঝিয়েছিলেন আগামী দিনগুলোতে কোন কোন পরিস্থিতির শিকার হবেন, কীভাবে চিকিৎসা চলবে। চট্টগ্রামে কত কষ্ট দিয়ে তাঁর ডান হাতে সুই ফোটানো হয় তারও বর্ণনা দেন শাফিয়া।
ইউনাইটেড হাসপাতালের মেডিকেল অনকোলজির পরামর্শক ফেরদৌস শাহরিয়ার বলেন, চুল পড়ে যাওয়ার আশঙ্কায় অনেকে কেমোথেরাপি নিতে চান না।
এনআইসিআরএইচের হিস্টোপ্যাথলজির অধ্যাপক মো. গোলাম মোস্তফা বলেন, সরকার ছাড়া কেউ জনবল তৈরি করছে না। কিন্তু সরকারের জনবল বেসরকারি খাতে চলে যায়।
বিএসএমএমইউয়ের প্যালিয়েটিভ কেয়ারের বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক নিজাম উদ্দিন বলেন, একদিকে সর্বাধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে ও বিপুল ব্যয়ে চিকিৎসা হচ্ছে। অন্যদিকে দরিদ্র মানুষ চিকিৎসা নিতেই পারছে না। তিনি ক্যানসার গবেষণা কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা, কমিউনিটিতে ক্যানসার চিকিৎসার আয়োজন, স্বাস্থ্যনীতিতে প্যালিয়েটিভ কেয়ারের অন্তর্ভুক্তি ও ওষুধ সহজলভ্য করার দাবি জানান।
ইউরোলজি ট্রান্সপ্ল্যান্ট ফাউন্ডেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা অধ্যাপক মো. আবদুস সালাম বলেন, বেশির ভাগ ক্যানসারের নিয়ন্ত্রণ সম্ভব। প্রতিষ্ঠানগুলো নিজেদের মধ্যে বিশেষজ্ঞও বিনিময় করতে পারে। বিদেশ থেকে বিশেষজ্ঞ এনে দেশের চিকিৎসক, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মীদের প্রশিক্ষণ দিলে আর্থিক ব্যয় কম হয়।
অনুষ্ঠানের শুরুর দিকে প্রথম আলোর সম্পাদক মতিউর রহমান বলেন, স্বাস্থ্য ও শিক্ষার মতো বিষয়গুলো রাজনীতিক ঝগড়া-বিবাদের বাইরে রাখার জন্য ঐকমত্য হওয়া দরকার। রাজনীতির কারণে যদি হরতাল হয়ও তবে রোগী যেন হাসপাতালে যেতে পারে। তিনি বলেন, সরকারের একার পক্ষে সব করা সম্ভব না। বেসরকারি খাতকে এগিয়ে আসতে হবে।
বৈঠকের প্রধান অতিথি মোহাম্মদ নাসিম বলেন, সরকার খুব শিগগির ভেজাল ওষুধের বিরুদ্ধে অভিযানে নামবে। এ ব্যাপারে গণমাধ্যমের সহায়তা চান তিনি। স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, এখন গ্রামাঞ্চলে যোগাযোগব্যবস্থা ভালো, বিদ্যুৎ আছে। চিকিৎসকদেরও তাঁদের কর্মস্থলে থাকতে হবে। চিকিৎসকদের গ্রামে রাখার ব্যাপারে সরকার প্রণোদনা দেবে।
সূত্র -প্রথম আলো

