৪৩টি পাঁচতলা ভবনের নিচতলার এক-তৃতীয়াংশ পানিতে ডুবে আছে। দুটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রধান ফটকে জমে আছে হাঁটুপানি। তলিয়ে গেছে একটি মসজিদ। বড়সড় মাঠগুলো জলমগ্ন, নেই কোনো খেলাধুলা। সড়কেও পানি ছুঁই ছুঁই।
এই চিত্র রাজধানীর যাত্রাবাড়ীর ওয়াপদা কলোনির। কলোনির ভবনগুলোয় ৪০৯টি পরিবার এ অবস্থার মধ্যে অসহায় জীবন যাপন করছে। এর মধ্যে পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) ভবন ২১টি ও বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) ২২টি। এ ছাড়া কলোনির মধ্যে পাউবোর তিনটি স্টাফ কোয়ার্টারে ২৮০ জন কর্মচারী বসবাস করেন। টিনের এই ঘরগুলোর চারদিকেও হাঁটুপানি।
বাসিন্দাদের অভিযোগ, পাউবো ও পিডিবি কর্তৃপক্ষের গাফিলতিতে ওয়াপদাতে জলাবদ্ধতা স্থায়ী রূপ নিয়েছে। তাঁরা বলছেন, প্রতিবারই বর্ষা মৌসুম শেষে পানি নেমে যায়। এবার শীতকাল শেষ হতে চললেও পানি নামার লক্ষণ নেই।
কুতুবখালী খাল দখল, মেয়র মোহাম্মদ হানিফ ফ্লাইওভার নির্মাণের ফলে একটি সাইট ড্রেন (ওয়াপদা থেকে ডিএনডি বাঁধে পানি সরানোর নালা) সাময়িকভাবে বন্ধ থাকা ও যাত্রাবাড়ী মাছের আড়তসহ আশপাশের উঁচু এলাকার বাসাবাড়ির পয়োনিষ্কাশনের পানি ওয়াপদা কলোনিতে জমা হওয়ায় এ জলাবদ্ধতা হয়েছে বলে পাউবোর ভাষ্য।
পাউবোর (ঢাকা পওর বিভাগ-২) নির্বাহী প্রকৌশলী তারিক আবদুল্লা আল ফাইয়াজ উল্লিখিত কারণগুলো উল্লেখ করে প্রথম আলোকে বলেন, ‘বিকল্প পথ হিসেবে দোলাইরপাড়ের একটি ড্রেনের সঙ্গে সংযোগ স্থাপনের কাজ চলছে। আশা করি, শিগগিরই সমস্যার সমাধান হবে।’
সরেজমিন: গত রোববার সকালে কলোনিতে গিয়ে দেখা যায়, কলোনির ‘এইচ ডি নং’ ভবনের নিচতলার এক-তৃতীয়াংশ পানির নিচে ডুবে আছে। এর মধ্য দিয়েই নিচতলায় বসবাস করছে দুটি পরিবার। আর বাড়িটিতে প্রবেশের জন্য ভবনের দুই তলার সিঁড়িঘরের দেয়ালের একাংশ ভেঙে সড়ক থেকে কাঠের মই লাগানো রয়েছে। এই মই দিয়েই নারী, শিশুসহ ১০টি পরিবারের সদস্যরা ঘরে যাওয়া-আসা করেন।
দীর্ঘদিন ধরে জলাবদ্ধতার কারণে কলোনির পরিবেশ হয়ে উঠেছে নোংরা, পুঁতিগন্ধময়। রোগ-জীবাণুর বিস্তার ঘটছে। জামাল উদ্দিন নামে এক বাসিন্দা বলেন, ময়লা পানি জমে থাকায় মশা, মাছি ও পোকামাকড়ের উৎপাত বেড়ে গেছে। নিচতলার বাসিন্দাদের প্রতিদিনই ময়লা পানি পরিষ্কার করতে হচ্ছে।
কলোনিতে রয়েছে বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড প্রাথমিক বিদ্যালয়। জলাবদ্ধতার কারণে প্রায় আট মাস আগে বন্ধ হয়ে গেছে প্রতিষ্ঠানটি। পরে স্কুলসংলগ্ন পাউবোর তিনতলা একটি ভবনে কার্যক্রম চালু করা হয়। কিন্তু ওই ভবনের সামনেও হাঁটুপানি জমে আছে।
এদিকে পাউবোর ডুবে যাওয়া বিদ্যালয়টির পাশেই ওয়াপদা কলোনি জামে মসজিদ। প্রায় ৬০ লাখ টাকা ব্যয়ে কয়েক বছর আগে ওই মসজিদটি নির্মাণ করা হয়েছিল। জলাবদ্ধতায় মসজিদটির অর্ধেক ডুবে আছে। মসজিদসংলগ্ন সড়কে অস্থায়ীভাবে নির্মাণ করা হয়েছে আরেকটি নামাজের ঘর।
ওয়াপদা কলোনি কল্যাণ সমিতির সভাপতি আবদুস সাত্তার ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, সমস্যা সমাধানে একাধিকবার প্রশাসনকে লিখিতভাবে জানানো হলেও তেমন সাড়া পাওয়া যাচ্ছে না।
কলোনীর মধ্যে যাত্রাবাড়ী বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড উচ্চবিদ্যালয়ে যাওয়ার জন্য সড়কে তিন ফুট উঁচু করে বালু ফেলার কাজ চলছে। সম্প্রতি বিদ্যালয়ের মাঠেও প্রায় দুই ফুট করে বালু ফেলা হয়েছে। এ ছাড়া কলোনির আরও দুটি মাঠে জমে আছে হাঁটুপানি।
নোংরা পানি। পূতিগন্ধময় পরিবেশ। এর মধ্যে ভবনের ভেতর থেকে সারি সারি বালুর বস্তা ফেলে কোনোমতে বাইরে আসার ব্যবস্থা । ছবি: প্রথম আলোজলাবদ্ধ থাকায় এক বছর ধরে খেলাধুলা থেকে বঞ্চিত কলোনির শিক্ষার্থীরা। যাত্রাবাড়ী বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড উচ্চবিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক (ভারপ্রাপ্ত) ফরিদা ইয়াসমিন প্রথম আলোকে বলেন, এক বছর ধরে খেলাধুলা থেকে বঞ্চিত শিক্ষার্থীরা। সম্প্রতি স্কুলের মাঠে বালু ফেলা হলেও চারদিকে জমে আছে দুই থেকে আড়াই ফুট পানি।
‘জাতীয় শিশু পুরস্কার প্রতিযোগিতার’ অংশ হিসেবে ডেমরা শিক্ষা থানার ৫০ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের খেলাধুলার প্রতিযোগিতা হতো ওয়াপদা কলোনিতে। প্রতিবারের মতো এবারও ২২ জানুয়ারি এসেছিল শিক্ষার্থীরা। রাস্তার ওপর উচ্চলাফ ও দৌড় প্রতিযোগিতা করা হয়েছে কোনোমতে। মাঠে পানি থাকায় অন্য কোনো খেলা হয়নি। এ কথা জানান মাতুয়াইল দক্ষিণপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক এম এ সিদ্দিক মিয়া।
কর্তৃপক্ষের বক্তব্য: পাউবো চায় বিকল্প পথ হিসেবে দোলাইরপাড়ের একটি ড্রেনের সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করে কলোনির পানিনিষ্কাশন করতে। এ ব্যাপারে যোগাযোগ করা হলে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী প্রকৌশলী জাহাঙ্গীর আলম গতকাল বুধবার রাতে প্রথম আলোকে বলেন, ওয়াপদার পানি সরানোর জন্য দোলাইরপাড়ের ড্রেনে সংযোগ দেওয়া হলে পানির চাপ বেড়ে যাবে। তাতে অন্যান্য এলাকায় জলাবদ্ধতা তৈরি হবে, যা নিয়ন্ত্রণ করা খুব কঠিন হবে।
বিষয়টি সমাধানে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে জানাতে হবে বলে জানিয়েছেন জাহাঙ্গীর আলম।
রাজধানীর খালগুলোর রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব ঢাকা ওয়াসার। তবে কুতুবখালীসহ আশপাশের কয়েকটি খাল ডিএনডি বাঁধের সংলগ্ন হওয়ায় এগুলো রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব পাউবোর।
পাউবোর (ঢাকা পওর বিভাগ-২) নির্বাহী প্রকৌশলী তারিক আবদুল্লা আল ফাইয়াজ বলেন, ‘কুতুবখালী খাল দখলমুক্ত করতে আমরা জেলা প্রশাসনে চিঠি দিয়েছি। অনুমতি পেলেই কাজ শুরু করা হবে।’
সূত্র - প্রথম আলো

