আহা, কোথায় সে চির যৌবনের ঝর্ণা? মহিলাদের সর্বত্র সেই “ম্যাজিক” পিল বা ক্রিম খুঁজতে দেখা যায় যা তাদের বলিরেখা মুছে দিবে এবং সর্বদাই ২৫ বছর বয়সী দেখাবে।
কেমন হয় যদি আমরা সবাই দেখতে নবীন হতে চাওয়ার ইচ্ছা বদলে ফেলে অনুভূতিতে নবীন হতে চাই? একজন রেজিস্টার্ড ডায়েটিশিয়ান Elisa Zied তার লিখিত “Younger Next Week” নামক বইতে এ ধরণের একটি প্রস্তাবনা তুলে ধরেছেন যাতে পুষ্টি এবং জীবনযাপন পদ্ধতির পুনর্বিন্যাসিত কৌশল অবলম্বন করে আপনি আরও বেশী প্রাণবন্ত এবং অনুভবে নবীন হয়ে উঠতে পারেন।
আমরা Elisa Zied এর সাথে তার নতুন বইটি নিয়ে কথা বলেছিঃ
প্রশ্নঃ “Younger Next Week” বইটিতে আপনি বলেছেন নবীন হতে চাওয়ার বিষয়টি সাতটি মূল বিষয়ের সাথে সম্পর্কিত। সেগুলি কি এবং বইটি কিভাবে একজন নারীকে তা অর্জনে সাহায্য করবে?
উত্তরঃ যখন আমি ভাবতে শুরু করেছিলাম আসলে নবীন হতে চাওয়া কাকে বলে, এবং যখন আমি এতে গভীরভাবে মনোনিবেশ করলাম এবং দেখলাম বিশেষ খাদ্যাভ্যাস ও জীবনধারা বয়স বৃদ্ধি এবং দীর্ঘ জীবনের সাথে সম্পর্কিত, যা শেষ পর্যন্ত এ সিদ্ধান্তে নিয়ে আসে যে মানসিক চাপ হল প্রধান বয়স বৃদ্ধিকারী।
মানসিক চাপ কেবলমাত্র দেহকে কোষের পর্যায়ে প্রভাবিত করে না বরং এর জন্য আমাদের খাদ্য, সুস্থ্যতা এবং জীবনধারাকেও মুল্য দিতে হয়। এবং দুর্ভাগ্যবশত, যে উপায়ে আমরা সাধারণত মানসিক চাপ মোকাবেলা করার চেষ্টা করি একে আরও জটিল করে তোলে এবং আমদেরকে ভিতর বাহির সব দিকেই নিঃশেষ করে ফেলে। আমাদের সবাইকেই মানসিক চাপের মধ্যে চলতে হয়—এটা যেন আমাদের জীবনের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। কিন্তু আমি মনে করি না এর কাছে নতি স্বীকারের প্রয়োজন আছে (আমি জানি, এটা করার চেয়ে বলা বেশ সহজ)। আমি জীবনের লক্ষ্য পূরণের জন্য এমন সাতটি মূল ভিত্তি চিহ্নিত করেছি যার মাধ্যমে একজন নারী সহজেই এর সাথে সম্পর্কিত হতে এবং এর প্রতি সাড়া দিতে পারবে। এমন কয়েকটি “ভিত্তি”র মধ্যে আছেঃ
১. একটি জমকালো উপস্থিতি (সুন্দর ত্বক এবং উজ্জ্বল অবয়ব)।
২. সীমাহীন শারীরিক, মানসিক এবং যৌন শক্তি (কাজ কর্ম, চলা ফেরা, বাড়িতে এবং বিছানায় যথেষ্ট শক্তিশালী হতে পারা)।
৩. অনায়াস সাধ্য ওজন ব্যবস্থাপনা (খাওয়ার সময় আবেগের বদলে ক্ষুধাকে প্রাধান্য দেয়া—এবং দেহকে পর্যাপ্ত পুষ্টি সমৃদ্ধ খাবারের যোগান দেয়া এবং সঠিক উপায়ে শারীরিক কার্যকলাপ চালিয়ে যাওয়া যা আপনাকে একটি স্বাস্থ্যকর দৈহিক ওজন বজায় রাখতে সাহায্য করবে)।
৪. একটি শান্ত ধরণের এবং নিশ্চিন্ত অনুভূতি (ধীরস্থির হতে এবং আপনাকে নির্বিঘ্ন ও প্রশান্তময় ভাবে ঘুমিয়ে পরতে শেখাতে)।
প্রশ্নঃ এবার আসা যাক “ওজন ব্যবস্থাপনা” প্রসঙ্গে। বইটিতে আপনি বলেছেন, আসলে ডায়েটিং আমাদের জীবনে অন্তরায় (sabotage) সৃষ্টি করে। তা কিভাবে?
উত্তরঃ যখন আপনি তথাকথিত ডায়েট করতে যান এবং খুব বেশী পরিমাণে ক্যালরি গ্রহণ কমিয়ে দেন অথবা বিশেষ একটি খাবার বা ঐ জাতীয় খাবারগুলি খাওয়া কমিয়ে দেন, তখন হয়ত আসলে আপনি আপনার দীর্ঘ দৈনন্দিন কাজসমূহ করার জন্য প্রয়োজনীয় শক্তির ঘাটতি করে ফেলছেন। দ্রুত ওজন কমিয়ে ফেলা—এবং ফ্যাট কমিয়ে ফেলা, বিশেষত আপনার মুখমন্ডল থেকে—আপনাকে বয়স্ক দেখানোর মত অবয়ব এনে দিতে পারে।
কম পরিমাণে ক্যালরি গ্রহণ করা চালিয়ে যেতে থাকলে আপনার স্বাভাবিক খাবারের মাধ্যমে দৈনন্দিন পুষ্টি চাহিদা পূরণ করা এবং দেহের জন্য ব্যাপকভাবে প্রয়োজনীয় ভিটামিন, মিনারেল এবং উদ্ভিদজাত কেমিক্যাল যা সম্মিলিত ভাবে আপনার ব্রেনের এবং দৈহিক সক্ষমতা সর্বতোভাবে বজায় রাখে তার চাহিদা পূরণ করা বেশ কঠিন হয়ে পরে। এর ফলাফল স্বরূপ মানসিক চাপ মোকবেলার স্বাভাবিক যে উপায় আমাদের থাকে তা বাস্তবায়নের পথে অন্তরায় সৃষ্টি হয়।
ফলশ্রুতিতে, ডায়েটিং করার ফলে আপনার মধ্যে বঞ্চিত এবং ক্ষুধার্ত অনুভূতি এনে দিতে পারে এবং আরও কিছু দুশ্চিন্তা এবং মানসিক চাপ এর সাথে যোগ করতে পারে। গবেষণা এটা সুপারিশ করে যে অপ্রাসঙ্গিক ভাবে খাবার গ্রহণে অনীহা করলে—অথবা এমনকি কেবল কম ক্যালরি গ্রহণের চিন্তাভাবনা করলে—হয়ত কেবলমাত্র শারীরিকভাবে মানসিক চাপ বাড়িয়ে দিয়ে দেহকে ওজন বাড়াতে উৎসাহীতই করে না, বরং telomeres কমিয়ে দেয় যা আরও দ্রুত বুড়িয়ে যাবার সাথে বেশ সম্পর্কিত।
প্রশ্নঃ পাঠকরা হয়ত এটা দেখে অবাক হতে পারেন যে আপনার ৭ দিনের Vitality প্রোগ্রামে কোন খাবারকেই বাদ দিতে বা কমিয়ে খেতে বলা হয়নি। যদি ফ্রেঞ্চ ফ্রাই, ক্যান্ডি এবং কুকি খায় তবে কি মহিলারা আসলেই জীবনীশক্তি অর্জন করতে পারবে?
উত্তরঃ আমি মনে করি একজন মহিলার জন্য তার ডায়েট করার ইচ্ছা কবর দিয়ে এবং কোন রকম নেতিবাচক ও বিধিনিষেধের বেড়াজাল পরিত্যাগ করে ইতিবাচক এবং পুষ্টিকর উপায়ে খেতে শেখাটাই বেশ গুরুত্বপূর্ণ।
এর মানে কি আপনি যদি দেখতে এবং অনুভবে সুন্দর হতে চান, তবে কখনোই ফ্রেঞ্চ পাই, ক্যান্ডি এবং কুকি খাওয়া উচিত হবে না? আমার মতে, সকল খাবারই একটি সম্পূর্ণ স্বাস্থ্যকর ডায়েট এবং জীবনযাপন প্রণালীতে অন্তর্ভুক্ত হতে পারে। আমি বিশ্বাস করিনা যে, কেউ যদি কোন বিশেষ খাবার খেতে বেশ পছন্দ করে তবে সে খাবার খাদ্যতালিকা বাদ দেয়া বাস্তবসম্মত এবং ব্যবহারযোগ্য হবে, এমনকি সে খাবার যদি স্বাস্থ্যকর না হয়ে থাকে তবেও।
মহিলারা যেন বাস্তবসম্মত এবং সচেতনভাবে অনুসরণ করতে পারে তেমন করে আমি ৭ দিনের ভাইটালিটি প্ল্যানটি রচনা করেছি। স্বাস্থ্যকর দেহের জন্য ওজন অর্জন ও তা বজায় রাখতে এবং সর্বোচ্চ পরিমাণে সুন্দর দেখাতে ও অনুভব করতে নারীর যে পর্যাপ্ত ক্যালরি এবং পুষ্টি উপাদান পাওয়া প্রয়োজন অবশ্যই আমি তা চেয়েছি। কিন্তু খুব বেশী কড়াকড়ি করতে যেয়ে তা অনেক সময় ব্যার্থতায় পর্যবসিত হয়। আমি অল্প কিছু এরকমের বিষয় আলোচনা করেছি যা থেকে তারা পছন্দেরটি বেছে নিতে পারে, এমনকি যদি তারা চায় তবে প্রতিদিনই।
এসকল সমন্বিত এবং প্রাসঙ্গিক প্রোগ্রামগুলি মহিলাদের খ্যাদ্যাভাস এবং সমগ্র জীবনযাপন প্রণালীকে উজ্জীবিত করার মাধ্যমে সেগুলিকে নিয়ন্ত্রণ করা শুরু করে এবং কোনও রকম খাওয়াতেই সে যেন নিজেকে অপরাধী না মনে করে—এমনকি সে যদি কেবলমাত্র ডোনাট, আইসক্রিম বা চকোলেট খেতে চায়। আমরা তার সবগুলিই যুক্তি দিয়ে বুঝিয়ে দিতে পারি।
প্রশ্নঃ আপনি ‘Vital Moves’ এবং ‘Vital Relaxation’ এর উপরে বইটিতে বেশ গুরুত্ব দিয়েছেন। আপনি কি এ প্রোগ্রামের ঐসকল উপাদান গুলি ব্যাখ্যা করবেন?
উত্তরঃ সক্রিয় থাকা এবং প্রতি রাতে পর্যাপ্ত পরিমাণে ঘুমানোর উপকারিতা অসীম। আমরা কতটা সাফল্যজনকভাবে বেড়ে উঠছি তাতে এবং আমাদের প্রানশক্তিতে এগুলি গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা পালন করে।
উদাহরন স্বরূপ, শরীরচর্চার মাধ্যমে আমাদের দেহের সর্বাংশে, যার মধ্যে ত্বকও আছে (এতে উজ্জ্বলতা এনে দেয়ার মাধ্যমে) রক্তের প্রবাহ বাড়ায়; এটি মেদবিহীন মাংসপেশী গঠন ও তা বজায় রাখতে সাহায্য করে যা আপনার বিপাক ক্রিয়া বাড়িয়ে দেয়; এটি আপনাকে শক্তিমান করে তোলে; এটি আপনার মেজাজের উপর ইতিবাচক প্রভাব ফেলে এবং মানসিক চাপ কমায়; এটি আপনার ওজনকে নিয়ন্ত্রণে আনতে এবং আরও ভাল ঘুমাতে সাহায্য করতে পারে; এবং এটি বিভিন্ন রোগের ঝুঁকি এবং ঝুঁকির কারণ সমূহ কমাতে পারে। অতএব যখন শরীরচর্চা এতটা গুরুত্বপূর্ণ, অবশ্যই অলস হয়ে বসে থাকবেন না—খুব বেশী সময় অলস বসে থাকলে অসুস্থতার প্রবণতা দেখা যায় এবং আয়ুষ্কাল কমিয়ে দেয়।
পর্যাপ্ত পরিমাণে ‘ভাল রকমের ঘুম’ ও বেশ প্রয়োজনীয়, কারণ এটি অপর্যাপ্ত ঘুমের কারনের সাথে জড়িত কিছু জটিলতা এড়াতে সাহায্য করে। আমি ১১ অধ্যায়ে বর্ণনা করেছি, একেবারে অল্প ঘুমের কারণে, ত্বকে অস্বস্তি, প্রানশক্তির অভাব, হতাশাপূর্ণ মেজাজ, ওজন বৃদ্ধি ও মানসিক চাপ বৃদ্ধি করে এবং সামগ্রিক ভাবে ভালো থাকা এবং সুস্থ থাকার মাত্রা কমিয়ে দেয়।
প্রশ্নঃ পাঠকরা বইটি পড়ার মাধ্যমে এটি থেকে কি আহরণ করতে পারবে এবং তা তাদের জীবন গড়ার কাজে কিভাবে ব্যবহার করতে পারবে বলে আপনি আশা করেন?
উত্তরঃ আমার এ বইটি লেখার উদ্দেশ্য হল মহিলাদের কে অনুপ্রানিত করা এবং এমন ভাবে গড়ে তুলতে উদ্বুদ্ধ করা যাতে তারা যেকোনো রকমের মানসিক চাপ এবং বাধাবিঘ্ন সফলতার সাথে মোকাবেলা করে এগিয়ে যেতে পারে। তারা এটা করতে পারে পুষ্টিকর খাবার গ্রহণ করে, নিয়মিত শারীরিক কার্যক্রম ও শরীরচর্চা করে, পর্যাপ্ত পরিমাণে ঘুমিয়ে, এবং আনন্দিত ও হাসিখুশি থাকার মাধ্যমে জীবনকে উপভোগ্য করে তোলার মাধ্যমে। আমারা নারীরা কি এটা চাইনা? আমি মনে করি আমরা অবশ্যই তা চাই!

