শীতের রাত। সেদিন রোগী কম ছিল। ডা. রহমান চেম্বার শেষ করে বাসায় যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। এমন সময় এক ভদ্রলোক তাড়াহুড়ো করে ভেতরে ঢুকলেন। তার চেহারায় বিপদের ছায়া। ঢুকেই বললেন, স্যার, আমি বড় একটি সমস্যায় পড়েছি, কী করব বুঝতে পারছি না। ডা. রহমান বললেন, কী সমস্যা? ভদ্রলোক এক দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, ৫ দিন পর জরুরি ব্যবসার কাজে আমাকে চায়না যেতে হবে, ফ্লাইটও কনফার্ম হয়ে গেছে। সব কিছু ঠিক ছিল, কিন্তু আজ সন্ধ্যায় দেখি গলায় ফুসকুড়ির মতো বেরিয়েছে। এই দেখেন বলেই শার্টের গলা ফাঁক করে ফুসকুড়ির মতো চিহ্নটা দেখালেন। গায়ে আরও এ রকম চিহ্ন ফুটে উঠেছে তাও দেখালেন। ডা. রহমান বললেন, ও চিকেন পক্স! ভদ্রলোক বললেন, স্যার, ৫ দিন পর যদি আমি চায়না যেতে না পারি, তাহলে আমার অনেক লোকসান হয়ে যাবে। আপনার কাছে কি এর চিকিত্সা আছে? ডা. রহমান বললেন, অবশ্যই আছে এবং আপনি সুস্থ শরীরে সময়মতোই প্লেনে চড়বেন, ইনশাআল্লাহ্। বর্তমানে নতুন-নতুন অ্যান্টিভাইরাল ড্রাগ আবিষ্কারের ফলে আধুনিক বিশ্বে এমনকী বাংলাদেশেও অনেক চিকিত্সক সাফল্যের সঙ্গে এই রোগের চিকিত্সা করে আসছেন। এবার চিকেন পক্স সম্পর্কে কিছু জানা যাক—
চিকেন পক্স বা জলবসন্ত কী?
চিকেন পক্স ভয়াবহ রকমের ছোঁয়াচে। অসুখটি সাধারণভাবে নিরীহ মেজাজের। কিন্তু নবজাতক ও বয়স্ক মানুষের জীবনসংহারক হয়ে উঠতে পারে। ভ্যারিসেলা জোস্টার নামক ভাইরাসের সংক্রমণ থেকে রোগের সৃষ্টি। কেউ একবার এ রোগে আক্রান্ত হলে প্রায় সারা জীবনের জন্য প্রাকৃতিকভাবে রোগ-প্রতিরোধ শক্তি লাভ করে।
উপসর্গ
সাধারণত আক্রান্ত কোনও ব্যক্তির সংস্পর্শে এলে ২-৩ সপ্তাহ পরে এই রোগের লক্ষণ দেখা দেয়। প্রথম দিকে হঠাত্ করেই জ্বর আসে, পিঠের পেছনের দিকে ব্যথা হয় এবং গা ম্যাজ-ম্যাজ করে। জ্বর আসার ১-২ দিন পর প্রথমে শরীরের উপরের অংশে এবং পরে মুখ ও হাত-পায়ে প্রথমে ছোট ঘামাচির মতো ফুসকুড়ি দেখা যায়। এরপর সারা শরীরে ছোট-ছোট পানিযুক্ত লালচে গোটা ওঠে। সঙ্গে জ্বর, মাথাব্যথা, দুর্বলতা ও শরীরে ব্যথা দেখা দেয়। এই জ্বর ও গায়ে ব্যথা শিশুদের চেয়ে বড়দের বেলায় আরও বেশি হয়। তবে এটির সঙ্গে থাকা চুলকানিই মূলত অস্বস্তির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। চুলকাতে গিয়ে গোটা ফেটে এর অভ্যন্তরীণ লিকুইড চারদিকে ছড়িয়ে সংক্রমণ বাড়ায়। ফুসকুড়ি ২-১ দিনের মধ্যেই পেকে যায় বা এতে পুঁজ জমে। অল্প কিছু দিনেই এটি শুকিয়ে চল্টা পড়ে। এই রোগ হলে শরীর ক্রমেই দুর্বল হয়ে পড়ে। খাওয়ার রুচি একেবারে কমে যায়। সাধারণত টিকা দেওয়া হয়নি এ রকম শিশুদের এই রোগ হয়।
জটিলতা
এ রোগে আক্রান্ত হলে জটিলতা হিসেবে ত্বকের ইনফেকশন, স্কারলেট জ্বর, নিউমোনিয়া, হাড়ের সংক্রমণ, এনকেফেলাইটিস, গ্লুমেরুলোনেফ্রাইটিসসহ ইত্যাদি রোগ হতে পারে। সবচেয়ে বড় কথা হল— চিকেন পক্স ভালো হয়ে গেলেও তা মেরুদণ্ডের স্নায়ু উত্পত্তিস্থলে রয়ে যায়, যা পরবর্তীকালে হার্পিস জোস্টার নামক বেদনাদায়ক ফুসকুড়ি হয়ে দেখা দিতে পারে।
যা খাবেন
সাধারণ ভাত, মাছ, মাংস, স্যুপ খেতে পারবেন। মুখে ঘা থাকলে নরম ফল খাবেন। দিনে কমপক্ষে ৮ গ্লাস পানি।
যা কম খাবেন বা খাবেন না
স্যাচুরেটেড ফ্যাটযুক্ত খাবার যেমন— চর্বিযুক্ত মাংস ও ফুল-ফ্যাট দুধ। এতে থাকা ফ্যাট প্রদাহ বাড়িয়ে সেরে ওঠাকে ধীর করে ফেলে। লেবু খাবেন না যদি মুখের ভেতর গোটা থাকে। লবণাক্ত ও ঝাল খাবারও বাদ দেবেন। আরজিনিন নামক একটি এমাইনো এসিড, পক্স ভাইরাসের জীবন প্রণালিকে সাহায্য করে। আরজিনিনযুক্ত খাবার যেমন— চকলেট, বাদাম এবং বীজজাতীয় যে-কোনও খাবার। টক ফল খাবেন না।
পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা
হালকা গরম পানিতে গোসল করুন। সাবান পানি দিয়ে পক্স ধুতে পারবেন। বিদেশে পক্সের চুলকানি রোধে খুব জনপ্রিয় একটি প্রথা হল গোসলের পানিতে ওটমিল পাউডারের ব্যবহার। ১ বাথটাব হালকা গরম পানিতে ২ কাপ ওটমিল পাউডার ভিজিয়ে রেখে তা দিয়ে গোসল করতে পারেন।
দাগ মোচন কীভাবে করবেন?
নিয়মিত ভিটামিন ই অয়েল এবং অ্যালোভেরা জেল (ঘৃতকুমারি) লাগাতে পারেন। সিলিকনযুক্ত যে-কোনও ক্রিম দাগে লাগাতে পারেন। ওট এর পেস্ট লাগাতে পারেন। ডাবের পানি ও মধুও দাগ নির্মূলে সহায়তা করে।
প্রতিরোধ
প্রথম ডোজটি শিশুদের ১২-১৮ মাসের মধ্যে দিন। ২য় ডোজটি ৫-৬ বছরে দিতে হয়। কারও যদি টিকা দেওয়া না থাকে এবং চিকেন পক্স হয়, লক্ষণ প্রকাশের ৩ দিনের মধ্যে টিকা দিয়ে দিতে পারেন, রোগের প্রকোপ কমে যাবে। কারও একবার চিকেন পক্স হয়ে গেলে আর টিকার প্রয়োজন নেই।
সতর্কতা
গর্ভাবস্থার প্রথম ৬ মাসে চিকেন পক্স হলে গর্ভপাতের আশঙ্কা থাকে। তা ছাড়া শিশুর জন্মগত ত্রুটিও দেখা দিতে পারে। তাছাড়া এ সময়ে ওষুধও খাওয়া যায় না। সুতরাং ডাক্তারের নিবিড় তত্ত্বাবধানে থাকা উচিত। শিশুদের চিকেন পক্স হলে কখনও এসপিরিন খাওয়াবেন না।
চি কি ত্ সা
এই রোগের প্রাথমিক চিকিত্সা হল— ফুসকুড়ি না শুকানো পর্যন্ত রোগীকে আলাদা করে রাখা এবং উপসর্গভিত্তিক চিকিত্সা দেওয়া, যেমন— জ্বর, চুলকানি ও ব্যাকটেরিয়াল সংক্রমণ প্রতিরোধ করা। পাশাপাশি অ্যান্টিভাইরাল এজেন্ট অ্যাসাইক্লোভিরজাতীয় ওষুধ দিয়ে চিকিত্সা করা যায়। রোগীর বয়স ১২ বা অধিক হলে অবশ্যই এই চিকিত্সা দেওয়া উচিত।
সূত্র - দৈনিক আমাদের সময়

