গেঁটে বাত’ বা গাউট (Gout) এমন একটা রোগ, যা অসুস্থতার পাশাপাশি রোগীকে বুঝিয়ে দেয় তার আর্থিক সামর্থ্য কতটুকু রয়েছে। অভাবী বা অপুষ্টির শিকার কারও কখনও গেঁটে বাত হয় না। গেঁটে বাত পুরুষদের বেশি হয় এবং সাধারণত মধ্য বয়সে এ রোগের শুরু, এমনকি ষাট-সত্তর বছর বয়সেও এ রোগ হতে পারে। বাতকে প্রধানত দুুই ভাগে ভাগ করা হয়-
* প্রাইমারি বাত বা গাউট (Gout) : প্রদাহ জনিত কারণেই এই রোগ হয়। সাধারণত ৪০ বছর বয়সের উপরে এই রোগে আক্রান্ত হওয়ার প্রবণতা বেশি।
* সেকেন্ডারি গাউট : এটি প্রধানত কিডনি বিকলতা অথবা ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ায় হয়ে থাকে। মহিলাদের ক্ষেত্রে এ সমস্যা বেশি হয় এবং সাধারণত ৬৫ বছরের বেশি বয়সে দেখা যায়।
লক্ষণ : রোগটির উপস্থিতি প্রাথমিক পর্যায়ে খুব বেশি অনুভব করা যায় না। এ বাত শরীরের জয়েন্টগুলোকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। শরীরের জোড়া স্থানগুলো ফুলে ও লাল হয়ে যায় এবং যন্ত্রণাবোধ হয়। হঠাৎ করেই এর লক্ষণ প্রকাশ পায় এবং ২-৬ ঘণ্টার মধ্যে এর তীব্রতা প্রকাশ পায়। সকালে ঘুম থেকে ওঠার পর রোগী এ ব্যথা অনুভব করেন। পায়ের বুড়ো আঙুলে অথবা হাঁটুতে ব্যথা বেশি হয়। তখন একে চিকিৎসকদের পরিভাষায় পোডাগ্রা (Podagra) বলে। এ ছাড়া আক্রান্ত অন্য জয়েন্টগুলো হল-
* গোড়ালির জয়েন্ট,* মধ্য পায়ের জয়েন্ট,* হাঁটুর জয়েন্ট,* ছোট ছোট হাতের জয়েন্ট,* কব্জির জয়েন্ট,*
কনুইর জয়েন্ট
এ রোগ আপনা আপনি কমে যায় সাধারণত ৫-১০ দিনের মধ্যে।
কখনও কখনও এক ধরনের নকল গেঁটে বাত হতে পারে। এতেও গিরা ফুলে যায়, লাল হয় এবংব্যথা হয়। পরীক্ষা-নিরীক্ষা না করেই যদি কেউ এই নকল গেঁটে বাতের লক্ষণগুলো শুনেই চিকিৎসা পত্র দেন, তবে শুধু চিকিৎসা বিভ্রাটই হবে।
রোগের সৃষ্টি
রক্তে যখন ‘ইউরিক এসিড’ বেড়ে যায়, তখন এই এসিড অল্প অল্প করে শরীরের বিভিন্ন খাঁজে বা পকেট গুলোয় জমা হয় এবং ক্রিস্টাল (Monosodium urate) তৈরি করে।একদিন হঠাৎ করে দেখা যায়, জয়েন্ট ফুলে লাল হয়ে গেছে এবং সঙ্গে ব্যথাও রয়েছে। যেহেতু ইউরিক এসিড ক্রিস্টালগুলো দেখতে সুচের মতো- তাই যন্ত্রণা হওয়াটা স্বাভাবিক।
রক্তে ইউরিক এসিডের মাত্রা বেড়ে গেলেই যে গেঁটে বাত হবে এমন কোনো কথা নেই। এই ইউরিক এসিডের পরিমাণ স্বাভাবিকের চেয়ে বেড়ে গিয়ে যদি কিডনিতে জমা হয়, তবে তা থেকে রেনাল বা কিডনিতে স্টোন হতে পারে। যদি ত্বকের নিচে জমা হয় তবে তা থেকেও এ বাত হতে পারে।
রোগ সৃষ্টির ক্রিস্টাল সময় মূলত তিনটি কারণে গেঁটে বাত হয়-
* দৈনন্দিন খাদ্য তালিকায় খাসির মাংসসহ লাল জাতীয় মাংস, শুকনো শিম জাতীয়দানা, মটরশুঁটি, মাশরুম, মাছের ডিম, কলিজা, কচু, লালশাক, পুঁইশাক বাঅ্যালকোহলের পরিমাণ বেশি থাকলে রক্তে ইউরিক এসিড বাড়তে পারে।
* বংশানুক্রম বা জেনেটিক কারণে হতে পারে।
* শরীর হালকা বা মেদহীন রাখার জন্য কঠোর ডায়েটিং করেন তাদের ওজন অস্বাভাবিকভাবে কমে যাওয়ার কারণেও গেঁটে বাত হতে পারে।
* দীর্ঘদিন উপোস থাকার কারণে শরীরে রক্তের মধ্যে ইউরিক এসিডের মাত্রা বেড়ে যায়।
* কিডনির সমস্যার কারণে শরীর থেকে ইউরিক এসিড যখন প্রস্রাবের সঙ্গে বেরিয়ে যেতে পারে না, তখন গেঁটে বাত সৃষ্টি হয়।
পরীক্ষা-নিরীক্ষা
* যদি রক্তে স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি পরিমাণ ইউরিক এসিড থাকে, তবে ধরে নেয়া যায় এটা গেঁটে বাতের সংকেত দিচ্ছে। অনেক সময় গেঁটে বাত থাকা সত্ত্বেও রক্তপরীক্ষায় ইউরিক এসিডের মাত্রায় কোনো অস্বাভাবিকতা ধরা পড়ে না।
আবার দেখা যায়, গেঁটে বাত একেবারেই হয়নি কিন্তু পরীক্ষায় দেখা যায়, রক্তে ইউরিক এসিডের মাত্রা বেশি। তখন চিকিৎসকরা গেঁটে বাত আক্রান্ত রোগীর গিরা থেকে ‘জয়েন্টের ভেতর থেকে পানি’ (joint fluid) নিয়ে পরীক্ষা করে দেখেন যে, আক্রান্ত স্থানে ইউরিক এসিড ক্রিস্টাল আছে কিনা। এই পরীক্ষা করা হয় গিরায় গেঁটে বাতের মারাত্মক সংক্রামণের সময়।
* ২৪ ঘণ্টার প্রস্রাবে ইউরিক এসিডের মাত্রায় কিডনির কার্যকারিতার স্বাভাবিক পরীক্ষাগুলোও করা হয়।
* প্রাইমারি গাউট সন্দেহ হলে অভুক্ত অবস্থায় লাইপোপ্রোটিনের (Lipoprotein) মাত্রা দেখা হয়।
* রক্তের ইএসআরের (ESR) মাত্রা বৃদ্ধি, টোফিয়াস গাউটের (Topheous gout) ক্ষেত্রে দেখা যায়।
* আক্রান্ত জয়েন্টে এক্স-রে করা যেতে পারে।
চিকিৎসা
বাত সৃষ্টিকারী কারণ দমন করাই মূল লক্ষ্য। খাদ্য গ্রহণসহ দৈনন্দিন জীবনে বিভিন্ন ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। পাশাপাশি ব্যথা নিরাময় ও রোগ দমনের জন্য ওষুধ সেবন করা অপরিহার্য। চিকিৎসা সুবিধার জন্য নিুলিখিত তিন ভাগে চিকিৎসার বর্ণনা করা হল।
ক. হঠাৎ আক্রান্ত বাত (Acute Attack)
* এ ক্ষেত্রেদ্রুত কার্যক্ষম ননস্টেরয়েডাল এন্টিইনফ্লামেটরি ড্রাগ যেমন : ন্যাপ্রোক্সেন (Naproxen), ডাইক্লোফেনাক (Diclofenac), ইনডোমেথাসিন (Indomethacin) ব্যথা নিরাময়ে ভূমিকা রাখে।
* ওরাল কলচিসিন (Oral colchicines) ও ভূমিকা রাখতে পারে। এ ক্ষেত্রে বমি ও ডায়রিয়া হতে পারে।
* তীব্র ব্যথার সময় আক্রান্ত জয়েন্ট থেকে সিরিঞ্জের সাহায্যে তরল পদার্থ বের করে আনলে রোগী সুস্থ বোধ করেন। তরল পদার্থ বের করার পাশাপাশি ওই জয়েন্টে ইনজেকশনের সাহায্যে স্টেরয়েডও (steroid) দেয়া হয়।
খ. দীর্ঘস্থায়ী চিকিৎসা (Chronic Treatment)
রোগীকে শরীর থেকে মেদ কমানোর পাশাপাশি অ্যালকোহল গ্রহণে সতর্কতার কথা বলা হয়।দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসায় ইউরিক এসিডের মাত্রা কম রাখার জন্য ড্রাগ ব্যবহৃত হয়।সে ক্ষেত্রে
শর্তগুলো হল :
* বার বার গেঁটে বাতে আক্রান্ত হওয়া
* টফি (Tophi)-তে আক্রান্ত হওয়া
* হাড় ক্ষয় বা অস্থি সন্ধিতে (joint) সমস্যা
* গেঁটে বাতের সঙ্গে কিডনি সমস্যা
*বাত এবং তার সঙ্গে রক্তে ইউরিক এসিডের উচ্চমাত্রা।
গ১.অ্যালোপুরিনল (Allopurinol) : প্রারম্ভিক মাত্রা ১০০-৩০০ মি. গ্রা.প্রতিদিন। তবে কিডনি রোগে আক্রান্তদের ক্ষেত্রে মাত্রা কম হবে। ধীরে ধীরে এমাত্রা কমিয়ে আনতে হবে। মাত্রা কমানোর পাশাপাশি ওরাল কলচিসিন (colchicin) ০.৫ মি. গ্রা. করে ১২ ঘণ্টা পরপর প্রথম কয়েক সপ্তাহ চালিয়ে যেতে হবে।
গ২.প্রোবিনেসিড (Probenecid) : ০.৫ মি. গ্রা. থেকে ১ গ্রাম প্রতি ১২ ঘণ্টাপরপর অথবা সালফিন পাইরাজোন ১০০ মি. গ্রা. প্রতি ৮ ঘণ্টা পরপর দেয়া যেতেপারে। এসব ড্রাগের সঙ্গে স্যালিসাইলেটজাতীয় ওষুধ প্রয়োগ নিষেধ।
সতর্কতা
অন্যধরনের কতগুলো জয়েন্ট সম্পর্কিত অসুখের সঙ্গে গেঁটে বাতের বাহ্যিকলক্ষণগুলো প্রায় একই রকম হয়ে থাকে। ফলে এর সঙ্গে অন্য বাতের পার্থক্যপ্রাথমিকভাবে সহজে ধরা যায় না। বিপত্তিটা ঘটে তখনই। না বুঝে বা আনাড়িচিকিৎসকের হাতে পড়ে ওষুধ খাওয়া শুরু করলে মারাত্মক বিপর্যয় ঘটতে পারে।
অপরদিকেটোটকা চিকিৎসা, ঝাড়ফুঁক বা মালিশ তা যত বৈজ্ঞানিকই হোক না কেন, ব্যথা হয়তোসাময়িকভাবে উপশম হতে পারে; কিন্তু স্থায়ী কাজ হবে না। সতর্ক ও নিয়ম মাফিকজীবনযাপন করলে গেটে বাতকে দমিয়ে রাখা সম্ভব।
গেঁটে বাতের রোগীদের জন্য পরামর্শ
* ডায়েটিং করার নামে খাওয়া-দাওয়া একেবারে ছেড়ে না দেয়া। প্রচুর পরিমাণেনিয়মিত পানি পান করা, যাতে কিডনি স্বাভাবিক থাকে। নিয়মিত ব্যায়াম করলে অনেকসময় এই গেঁটে বাত থেকে হতে বাঁচতে পারা যায়।
* বেশি তেল-মশলাযুক্ত এবং বেশি প্রোটিনযুক্ত খাবার পরিহার করা।
* ওজন কমানোর জন্য বা অন্য কোনো কারণে দীর্ঘমেয়াদি উপোস থাকা উচিত নয়।
* প্রতিদিন প্রচুর পরিমাণে পানি খাওয়া দরকার। যারা হার্ট কিংবা কিডনির রোগে ভুগছেন তাদের জন্য এ পরামর্শ নয়।
* খাওয়া-দাওয়ার ব্যাপারে সতর্ক হতে হবে। যেসব খাদ্য শরীরে মেদ বা ওজন বাড়ায় তা একেবারেই বর্জন করতে হবে।
* রেড মিট মানে অতি লাল মাংস, শুকনো শিম, মটরশুটি, কচু, লাল পুঁইশাক এবং সি ফুড পরিহার করা উচিত।
* নিয়মিত ব্যায়াম করতে হবে।
সূত্র - যুগান্তর.কম

