হরতাল-অবরোধকালে পেট্রলবোমায় দগ্ধ হয়ে প্রাণ হারিয়েছেন অগণন মানুষ। পেট্রলবোমার চেয়েও ভয়ঙ্কর প্রাণের ‘মশলাবোমা’য় উচ্চমাত্রায় উদ্বিগ্ন কয়েকটি আন্তর্জাতিক সংস্থা ও দেশের পুষ্টিবিজ্ঞানীরা। প্রাণের বিরুদ্ধে মামলা দায়েরসহ আন্দোলন গড়ে তোলার কথা ভাবছে একাধিক সামাজিক সংগঠন। প্রাণ-এর এ বোমা খালি চোখে দেখা যায় না। এর জীবনবিধ্বংসী কার্যক্রম নীরবে চলতে থাকে মানবদেহে, একে-একে গিলে খায় অস্থি-মজ্জা।
এদিকে ক্ষতিকর এসব খাদ্যপণ্য বর্জনে জনসচেতনতা সৃষ্টির জন্য কয়েকটি বেসরকারি সংস্থা আগামী সপ্তাহে প্রধানমন্ত্রী, স্বাস্থ্যমন্ত্রী, বন ও পরিবেশমন্ত্রীসহ সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তরে স্মারকলিপি পেশ করবে বলে জানা গেছে। একই সঙ্গে মানববন্ধনের মতো কর্মসূচির জন্যও প্রস্তুতি নিচ্ছে সংস্থাগুলো।
প্রাণের গুঁড়া মশলাসহ বেশ কিছু পণ্যের গুণগতমান নিয়ে শুধু দেশের পুষ্টিবিজ্ঞানীরাই নন, উদ্বিগ্ন বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থাও। দ্য ইন্টারন্যাশনাল ফুড সেফটি অথরিটিস নেটওয়ার্ক (আইএনএফওএসএএন) প্রাণের বাজারজাতকৃত খাদ্যপণ্যের মান যাচাই-বাছাই করার জন্য বাংলাদেশের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অধীন জনস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটকে (আইপিএইচ) চিঠি দিয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) ও জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) সহযোগী হিসেবে সারা বিশ্বে খাদ্যনিরাপত্তা নিয়ে কাজ করে আইএনএফওএসএএন ।
এদিকে প্রাণের খাদ্যপণ্যে ভেজাল ও ক্ষতিকর ভাইরাস পাওয়া এবং আইএনএফওএসএএনের উদ্বেগে সরকারও বিব্রত। গত ১৫ জানুয়ারি হাইকোর্টের আদেশে প্রাণের গুঁড়া মশলায় ক্ষতিকর কোনও উপাদান আছে কি না, তা খতিয়ে দেখতে বলা হয়। জনস্বার্থে হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড পিস ফর বাংলাদেশের পক্ষে করা একটি রিট আবেদনের প্রাথমিক শুনানি শেষে বিচারপতি সালমা মাসুদ চৌধুরী ও বিচারপতি মো. হাবিবুল গণির হাইকোর্ট বেঞ্চ এ আদেশ দেন। রিটের পক্ষে শুনানি করেন সংগঠনটির প্রেসিডেন্ট অ্যাডভোকেট মনজিল মোরসেদ।
হাইকোর্টের আদেশে মরিচ, ধনে, রসুন, জিরাসহ বাজারে থাকা প্রাণের সব গুঁড়া মশলার নমুনা সংগ্রহ করতে বাংলাদেশ বিজ্ঞান ও শিল্প গবেষণা পরিষদের (বিসিএসআইআর) চেয়ারম্যান ও কেমিক্যাল টেস্টিং উইংয়ের পরিচালককে নির্দেশ দেওয়া হয় এবং বলা হয়, ওইসব পণ্য পরীক্ষা করে আগামী ১৫ ফেব্রুয়ারির মধ্যে হাইকোর্টে প্রতিবেদন দিতে। প্রাণ অ্যাগ্রো লিমিটেডের গুঁড়া মশলায় স্বাস্থ্যহানিকর উপাদান আছে কি না— তা পরীক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে বিবাদিদের নিষ্ক্রিয়তা কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না— তা জানতে চেয়ে একটি রুলও জারি করেছিলেন হাইকোর্ট। স্বাস্থ্যসচিব, খাদ্যসচিব, পুলিশ মহাপরিদর্শক, র্যাবের মহাপরিচালক, বিএসটিআইয়ের মহাপরিচালক ও বিসিএসআইআরের চেয়ারম্যান ও কেমিক্যাল টেস্টিং উইংয়ের পরিচালককে রুলের জবাব দিতে বলা হয়েছিল।
সূত্র জানায়, আইএনএফওএসএএনের চিঠি পাওয়ার পর-পরই প্রাণের বিভিন্ন খাদ্যপণ্য পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য এফএও-র ঢাকার ফুড সেফটি প্রোগ্রামকে দায়িত্ব দেয় আইপিএইচ। শর্তপূরণে ব্যর্থ হলে বিশ্বের বাজারে প্রাণের খাদ্যপণ্য রপ্তানি বাধাগ্রস্ত হতে পারে। উল্লেখ্য, বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটি ৯২টি দেশে খাদ্যপণ্য রপ্তানি করছে।
জানা যায়, সম্প্রতি প্রাণের কাঁচা আম ও জুসে ফরমালিনের অস্তিত্ব ধরা পড়েছে। প্রতিষ্ঠানটির রপ্তানিকৃত পণ্যে বিষাক্ত ভাইরাসের উপস্থিতির কারণে কানাডায় নিষিদ্ধ হয়েছে প্রাণের পণ্য। এ-সংক্রান্ত কয়েকটি প্রতিবেদন গুরুত্ব সহকারে বিবেচনায় নিয়েছে আইএনএফওএসএএন। কাঁচামাল সংগ্রহ থেকে শুরু করে সব পর্যায়ে প্রাণ যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ করছে কি না, তা জানতে চেয়েছে আইএনএফওএসএএন।
উল্লেখ্য, গত ২৮ মে কাঁচা আমে মানবদেহের জন্য ক্ষতিকর ফরমালিন মেশানোর দায়ে ভ্রাম্যমাণ আদালতে দণ্ডিত হন প্রাণের দুই কর্মকর্তা। মেহেরপুরের গাংনী উপজেলার কাজীপুর গ্রামে একই অভিযোগে প্রাণের কর্মকর্তাকে জেল-জরিমানা করা হয়। এছাড়া ঢাকা, চট্টগ্রামসহ দেশের কয়েকটি জেলায় প্রাণের জুসে ফরমালিন পাওয়া যায়। গুঁড়া দুধ বাজারজাতকরণেও আইন না মানায় স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের নজরদারিতে রয়েছে প্রাণ। প্রাণের ফ্রুট ড্রিংকস নিরাপদ নয়— এমন তথ্য বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশন (বিএসটিআই) থেকে জানানোর পর প্রাণের ৮টি পণ্যের উত্পাদন, বাজারজাতকরণ ও বিক্রি বন্ধের নির্দেশ কেন দেওয়া হবে না, তা জানতে চান আদালত। এছাড়া জনস্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর এসব পণ্য বাজারজাতকরণ বন্ধে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে নিষ্ক্রিয়তা কেন বেআইনি হবে না, তা জানতে চেয়ে রুল জারি করেন হাইকোর্ট। বিষয়টি একাধিক সামাজিক ও মানবাধিকার সংগঠনের নজরে এসেছে। এমনই একটি সংগঠন ‘মানুষ মানুষের জন্য’র সমন্বয়কারী লুত্ফর রহমান বলেন, প্রাণসহ সব ভেজাল-খাদ্য উত্পাদকদের বিরুদ্ধে মামলা দায়েরসহ সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলার কথা ভাবছি আমরা।
সূত্র - দৈনিক আমাদের সময়

