শীতকাল এলেই বাঙালির ঘরে ঘরে রসের পিঠা-পায়েস খাওয়া শুরু হয়। আগের চেয়ে খেজুরের রসের আকাল হলেও এখনো গ্রামগঞ্জে কম-বেশি পাওয়া যায়। এই রস প্রক্রিয়াজাত করার মাধ্যমেই পিঠা-পায়েস খাওয়া হয়, তবে কাঁচা রস খাওয়ার প্রতিও আগ্রহের কমতি থাকে না বাঙালির। তবে এই কাঁচা রস থেকেই ঘটতে পারে বিপত্তি। বিশেষ করে প্রাণঘাতী নিপাহ ভাইরাসে আক্রান্তের ঘটনা ঘটে এই কাঁচা রসের মাধ্যমেই। গত এক যুগে ২০০ জন আক্রান্ত, এর মধ্যে ১৫৭ জনেরই মৃত্যু- এই একটি তথ্যই প্রমাণ করে নিপাহ ভাইরাস কত বড় এক ঘাতক। কেবল পেছনের হিসাবই নয়, এবারও গত কয়েক দিনে দেশের বিভিন্ন এলাকায় নিপাহ ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়ছে। এক রকম মৃত্যুর সংখ্যা গণনা শুরু করে দিয়েছে সরকারের স্বাস্থ্য বিভাগ।
তবে সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউট- আইইডিসিআরের পরিচালক অধ্যাপক ড. মাহামুদুর রহমান গতকাল শনিবার কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘যেভাবে খবর ছড়াচ্ছে তা ঠিক নয়, কেবল গত মাসে মানিকগঞ্জে দুজনের মৃত্যু নিপাহ ভাইরাসের কারণে ঘটেছে বলে আমরা পরীক্ষার মাধ্যমে নিশ্চিত হয়েছি। এ ছাড়া রাজশাহীতে যে খবর ছড়ানো হচ্ছে এর মধ্যে একজনের নমুনা পরীক্ষা করে আমরা দেখেছি, তার শরীরে নিপাহ ভাইরাস ছিল না। বাকি তিনজনের নমুনা এখন পরীক্ষাধীন রয়েছে, যা আগামী দুই-এক দিনের মধ্যে সুরাহা হবে। ফলে নিশ্চিত না হয়ে এ বিষয়ে আগাম কিছু বলা ঠিক নয়।’
এদিকে এবার জনসচেতনতার লক্ষ্যে সরকারের স্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকে খেজুরের কাঁচা রসের ওপর আরোপিত হয়েছে নিষেধাজ্ঞা। কোনো আইন বা প্রজ্ঞাপন করে না হলেও ওই অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে সারা দেশে মাঠপর্যায়ে কর্মকর্তাদের দাপ্তরিক চিঠি পাঠিয়ে কাঁচা রস বিক্রি বা সেবন বন্ধে পদক্ষেপ নিতে বলা হয়েছে। একই সঙ্গে ‘নিপাহমুক্ত প্রতিটি গ্রাম’ প্রচারণাসহ মানুষের মধ্যে সচেতনতা বাড়াতে আরো বিভিন্ন কার্যক্রম হাতে নেওয়া হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলেন, নিপাহ ভাইরাসে আক্রান্তের মধ্যে ৭৮ শতাংশের বেশি মৃত্যুর ঝুঁকি থাকে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (রোগ নিয়ন্ত্রণ) অধ্যাপক ডা. বে-নজীর আহম্মেদ কালের কণ্ঠকে বলেন, সাধারণত খেজুর গাছে হাঁড়ি পেতে রাখার পর ভাইরাসবাহী বাদুড় ওই হাঁড়ির রস খেতে গিয়ে রসে নিপাহ ভাইরাস ছড়িয়ে দেয়। ওই কাঁচা রস কোনো মানুষ পান করলে তার রক্ষা পাওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম থাকে। এমনকি খুব বেশি মাত্রার তাপে ওই রস জ্বাল না দিলে এতে ওই ভাইরাস টিকে থাকতে পারে। কাঁচা খেজুরের রস পান করার সাত থেকে আট দিনের মধ্যে নিপাহ ভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার উপসর্গ দেখা দেয়।
ডা. বে-নজীর বলেন, ‘নিপাহ ভাইরাস থেকে মানুষকে রক্ষার জন্যই কাঁচা রস বিক্রি ও সেবন না করতে দেওয়া কার্যক্রম হাতে নিয়েছি। পর্যায়ক্রমে সারা দেশে এই কার্যক্রম চলবে। জ্বাল দেওয়া রস সেবনের জন্য মানুষকে সচেতন করা হচ্ছে।’ ডা. বে-নজীর জানান, নিপাহ ভাইরাস সংক্রমণের জন্য দেশের উত্তর ও মধ্যাঞ্চল বেশি ঝুঁকিপ্রবণ। এসব এলাকায় খেজুর গাছের সংখ্যা, গাছের মালিক, রস সংগ্রহকারী ও বিক্রেতাদের তালিকা তৈরি করা হয়েছে। সিভিল সার্জনদের মাধ্যমে প্রতিটি উপজেলা ও ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান-মেম্বার-সুধীজন, রস বিক্রেতা, সংগ্রহকারী এবং গাছের মালিকদেরও কাঁচা রসের বিরুদ্ধে উদ্বুদ্ধ করা হচ্ছে।
আইইডিসিআরের তথ্যমতে, ২০০১ থেকে গত বছরের মে মাস পর্যন্ত দেশের বিভিন্ন এলাকায় নিপাহ ভাইরাসে ২০০ জন আক্রান্ত হয়, যাদের মধ্যে ১৫৭ জনের মৃত্যু ঘটে। এর মধ্যে গত বছরের শুরুতে আক্রান্ত ২৪ জনের মধ্যে ২১ জনেরই মৃত্যু হয়। গত দুই বছরই শুরুর দিকে ফরিদপুর, রাজবাড়ী, মানিকগঞ্জ, কুষ্টিয়া, নওগাঁ, নাটোর, দিনাজপুর, গাইবান্ধা, ঢাকা, রাজবাড়ী, ঝিনাইদহ, মেহেরপুর, টাঙ্গাইল, ঠাকুরগাঁওসহ আরো কয়েকটি এলাকায় নিপাহ রোগী পাওয়া যায়। এবার নতুন বছর শুরু হতে না হতেই বিভিন্ন এলাকায় নিপাহ ভাইরাস নিয়ে দেখা দিয়েছে আতঙ্ক।
সূত্র - দৈনিক কালের কণ্ঠ

