একটি উপকারী কোলেস্টেরল থাকলেও বাকি তিনটিই ক্ষতিকর। কোলেস্টেরলের ভালো-মন্দ নিয়ে লিখেছেন ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগের প্রধান ও অধ্যাপক ডা. খান আবুল কালাম আযাদ
কোলেস্টেরল সাধারণত রক্তের ভেতর প্রবাহিত অবস্থায় থাকে। অঙ্গ-প্রত্যঙ্গেও জমা থাকে চর্বি ও স্নেহজাতীয় পদার্থ হিসেবে। চর্বিজাতীয় পদার্থ শরীরে দুভাবে থাকে- ফ্যাটি এসিড আর কোলেস্টেরল। আমরা চর্বিজাতীয় খাবার খাওয়ার পর স্বল্পদৈর্ঘ্য ও মাঝারি দৈর্ঘ্যের ফ্যাটি এসিড সরাসরি রক্তনালির মাধ্যমে শোষিত হয়। আর দীর্ঘ চেইনের ফ্যাটি এসিড কোলেস্টেরল ও লাইপোপ্রোটিন দিয়ে আবৃত হয়ে লসিকাগ্রন্থিতে প্রবেশ করে। পরে রক্তে মেশে। এই লাইপোপ্রোটিনের আকৃতি অনুযায়ী কোলেস্টেরলকে কয়েক ভাগে ভাগ করা যায়- এলডিএল বা লো ডেনসিটি লাইপোপ্রোটিন, ভিএলডিএল, এইচডিএল বা হাই ডেনসিটি লাইপোপ্রোটিন এবং ট্রাইগ্লিসারাইড।
কোলেস্টেরল কী কাজে লাগে?
যদিও আমাদের কাছে কোলেস্টেরল শুনলেই মনে হয় খারাপ কিছু, আসলে শরীরে এর কিন্তু বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ কাজ আছে। কোষে শক্তি উৎপাদনে, অ্যানজাইমগুলোর কার্যকারিতায়, কোষঝিল্লির গঠনে, হৃদযন্ত্রের বিপাকে এবং রক্তনালির গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। শরীরে জমা থাকা উদ্বৃত্ত চর্বি দীর্ঘ উপবাসের সময় ভেঙে গিয়ে শক্তি উৎপাদন করে জীবন সচল রাখে। চামড়ার নিচে অবস্থিত চর্বি শরীরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ করে।
সব কোলেস্টেরলই কি ক্ষতিকর?
প্রথম কথা হচ্ছে, পরিমিত মাত্রায় শরীরে থাকলে কোনো কোলেস্টেরলই ক্ষতিকর নয়। বরং বলা যায় পরিমিত মাত্রায় কোলেস্টেরল থাকাটাই ভালো। কিন্তু অতিরিক্ত মাত্রায় থাকলে একটি বাদে বাকি কোলেস্টেরলগুলো ক্ষতিকর। উপকারী সেই কোলেস্টেরলটি হলো এইচডিএল বা হাই ডেনসিটি লাইপোপ্রোটিন।
পরীক্ষা-নিরীক্ষা কিভাবে করতে হয়?
শিরায় প্রবাহিত রক্ত সংগ্রহ করে তাতে মোট কোলেস্টেরলের পরিমাণ, এলডিএল, এইচডিএল ও ট্রাইগ্লিসারাইডের পরিমাণ মেপে শরীরে অতিরিক্ত কোলেস্টেরল আছে কি না নির্ণয় করা হয়। সাধারণত আট ঘণ্টা উপবাসের পর রক্তের নমুনা সংগ্রহ করা হয়। কারণ খাওয়ার পরপরই রক্তে এমনিতেই কোলেস্টেরলের প্রবাহ বেড়ে যায়। তাই কখনো কোলেস্টেরলের পরীক্ষা ডাক্তার করাতে দিলে অবশ্যই সকালবেলা খালিপেটে করাবেন।
একেকজনের জন্য কোলেস্টেরলের স্বাভাবিক মাত্রা একেক রকম হতে পারে। কোলেস্টেরলের স্বাভাবিক মাত্রা জাতি, বর্ণ, লিঙ্গ ও বয়সভেদেও ভিন্ন হয়।
অতিরিক্ত কোলেস্টেরলের ক্ষতি
অতিরিক্ত কোলেস্টেরল রক্তনালির দেয়ালে জমা হতে থাকে। রক্ত সরবরাহে বাধা সৃষ্টি করে অথবা সম্পূর্ণ বন্ধও করে দিতে পারে। ফলে যেসব রোগ হতে পারে সেগুলো হচ্ছে-
* স্টেবল অ্যানজাইনা
* আনস্টেবল অ্যানজাইনা
* মায়োকার্ডিয়াল ইনফার্কশন
বা হার্ট অ্যাটাক
* স্ট্রোক
* টিআইএ বা ট্রানসেমিক ইসকেমিক অ্যাটাক
* পেরিফেরাল ভাসকুলার ডিজিজ বা পিভিডি
* হাইপারটেনশন বা উচ্চ রক্তচাপ।
কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণে রাখার উপায়
* পরিমিত খাদ্যাভ্যাস
* নিয়মিত ব্যায়াম
* কোলেস্টেরলের মাত্রা বেশি হলে নিয়মিত ওষুধ সেবন।
কোরেস্টেরল নিয়ন্ত্রণের কিছু ওষুধ
* স্ট্যাটিন গ্রুপ (এট্রোডাসটাটিন, রসুডাসটাটিন, পিটাডাসটাটিন)
* ফাইব্রেট গ্রুপ (ফেনোফাইব্রেট, জেমফাইট্রোসিল)
* নিয়াসিন (ভিটামিন বি থ্রি)
* ওমেগা থ্রি ফ্যাটি এসিড।
কোন খাবারে চর্বি বাড়ে?
যেকোনো খাবার পরিমিত পরিমাণে খেলে শরীরে চর্বি বাড়ার ঝুঁকি নেই বললেই চলে। তবে যেসব চর্বি আমাদের সাধারণ ঘরের তাপমাত্রায় জমে শক্ত হয়ে যায় সেসব চর্বি পরিহার করা উচিত। আর যেসব খাবার পরিমিত পরিমাণে খাওয়া দরকার সেগুলো হলো : চিংড়ি, কলিজা, মগজ, লাল মাংস, ডিমের কুসুম প্রভৃতি। প্রচুর
পরিমাণে শর্করাজাতীয় খাবারও পরিহার করা উচিত।
কোলেস্টেরল কমাতে ব্যায়াম
বলা হয় যে সপ্তাহে পাঁচ দিন প্রতিদিন আধা ঘণ্টা করে দৌড়ানো, সাইকেল চালানো, সাঁতার কাটা প্রভৃতি করলে শরীরে ক্ষতিকর ট্রাইগ্লিসারাইড কমে, উপকারী কোলেস্টেরল বা এইচডিএলের পরিমাণ বাড়ে। তার সঙ্গে ধমনির অভ্যন্তরে রক্ত চলাচল বাড়ে। ফলে হৃদরোগ ও স্ট্রোকের ঝুঁকি কমে।
সূত্র - দৈনিক কালের কণ্ঠ

