রিপোর্ট নিয়ে অহেতুক দুশ্চিন্তা
06 October,13
Viewed#: 231 Favorites#: 1
সকালথেকে নাঈমা বেগমের মনটা ভালো নেই। অফিসে যেন মন বসছিল না। সহকর্মীরা সবাইখেয়াল করেছেন ব্যাংকের সেকেন্ড অফিসারের মাথাটা বোধহয় বেশ গরম। বাড়িতেগ-গোল বাধিয়ে অফিস গরম করা ম্যাডামদের প্রধান কাজ। দূর থেকে পিয়ন মন্তব্যটাকরল। ওসব লোকজনের কথায় কান দেয়ার সময় নাঈমা বেগমের নেই। বাড়ি ফিরতে হবেতাড়াতাড়ি তারপর রিপোর্টটা ডাক্তার আপাকে না দেখালে দুর্ভাবনা কাটবে না।
অবশেষে বুকের ভেতর পাথরটা যেন নেমে গেল। ডাক্তার আপা নির্ভর থাকতে বললেন।আলট্রাসনোগ্রাম রিপোর্টে স্মল রেনাল সিস্ট উল্লেখ থাকলেও তার শরীরে কোনোরকমপ্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করবে না। কিন্তু বাসায় এসে দেখলেন তুলকালাম কা-কা-। সকালে অফিস থেকে রিপোর্টের কথা ছোট বোন সায়মাকে জানিয়েছিলেন সে সন্ধ্যায়সব ভাইবোনকে ডেকে হাজির করল। বলল ওসব গলির মোড়ের জিপির কথায় আশ্বস্ত হলেচলবে না। নেফ্রোলজিস্ট অর্থাৎ কিডনি রোগ বিশেষজ্ঞের মতামত নিতে হবে। যেইকথা, , সেইকাজ। তবে নাঈমা বেগমের সৌভাগ্য, নেফ্রোলজিস্ট রিপোর্ট দেখেখারাপ কিছু বললেন না। বরং উল্টো নাঈমা বেগমকে একটু-আধটু কোমড় ব্যথার জন্যসারা শরীর চেকআপ করা তথা নিজেকে অহেতুক কিডনি রোগী হিসেবে মনে করার জন্যহালকা বকাঝকা করলেন। নাঈমা বেগমের মতো এ রকম অনেকেই এ ধরনের রিপোর্ট পেয়েদিনের পর দিন দুর্ভাবনায় নাওয়া-খাওয়া ছেড়ে দেন। অথচ এক্স-রে, আলট্রাসনোগ্রাম, এমআরআই, সিটি স্ক্যানের অনেক রিপোর্টকে রেডিওলজিস্টরাস্বাভাবিক বলে থাকেন, যা কিনা সাধারণের চোখে অসুখ বা অসুস্থতার দলিল হিসেবেধরা পড়বে। সবাইকে আশ্বস্ত করতে এখানে আমরা এসব অস্বাভাবিক মনে হওয়া শরীরেরস্বাভাবিক চিত্রগুলো তুলে ধরছি।
বুকের এক্স-রে করলে অনেক সময় রুডিমেন্টারি বা এটিপিক্যাল রিবস ধরা পড়ে।প্রতিরক্ষা বাহিনীতে কাজের ক্ষেত্র ব্যতিরেকে এ ধরনের রিপোর্ট নিয়েব্যতিব্যস্ত হওয়ার কারণ নেই। এটিপিক্যাল রিবস বা বাড়তি হাড় আপনার শরীরেরজন্য কোনো বোঝা নয় বা আপনার শরীরে ভবিষ্যতে তা কোনো প্রভাব ফেলবে না।প্রতিরক্ষা বাহিনীতে অমরাস্ত্র বহনের ক্ষেত্রে এটিপিক্যাল বাধা হয়ে দাঁড়াতেপারে। এ জন্য অপারেশনের প্রয়োজন হয়।
এছাড়া বুকের এক্স-রে করলে অনেক সময় এনলার্জ হাইলার লিম্ফনোড, ক্যালসিফিকেশনএসব রিপোর্ট উল্লেখ করা হয়। পুরনো টিভি রোগ বা ফুসফুসের রোগ ভালো হয়ে গেলেতা ফুসফুসে সাদা ক্যালসিয়ামের দফা হিসেবে ধরা দেয়। এছাড়া ছোট শিশুদের বড়থাইমাস, হাইলার নোড একটু বড় থাকতেই পারে। এ ধরনের রিপোর্ট অস্বাভাবিক কিছুনয়। বাচ্চা শুয়ে থাকা অবস্থায় হার্টের এক্স-রে অপেক্ষাকৃত বড় হয়ে দেখাদিতে পারে। দাঁড়ানো অবস্থায় একই শিশুর এক্স-রে স্বাভাবিক হবে। পালে এক্স-রেকরলে অনেক সময় বাড়তি সিসেমরেড অস্থিসমূহ হাড় ভাঙার ভুল তথ্য দিতে পারে।আবার হাড়ের শেষ প্রান্তে জোড়া না থাকায় আন ফিউডস এপিফাইসিস রিপোর্ট পড়েঅনেকে অাঁতকে উঠতে পারে। ছোট শিশুদের ক্ষেত্রে আনফিউসড এপিফাইসিস যেমনস্বাভাবিক ঘটনা বড়দের ক্ষেত্রেও তা তেমন গুরুত্ব বহন করে না।
ডিজিটাল এক্স-রে, সিটিস্ক্যান করলে এন্ডাটক ক্যালসিফিকেশন বা মহাধমনীতেক্যালসিয়ামের স্তর দেখা দিতে পারে। বয়স্কদের জন্য এবং উচ্চরক্ত চাপের শিকারব্যক্তিদের রিপোর্ট এমন হওয়া অস্বাভাবিক কিছু নয়। আলট্রাসনোগ্রাম পরীক্ষাকরলে যকৃত এবং ফুসফুসের ক্যালসিফিকেশন ধরা পড়তে পারে। এ ধরনের রিপোর্টভয়ানক কিছুই নয়। স্থূল, ডায়াবেটিক এবং মদ্যপায়ীদের লিভার বা যকৃতে 'ফ্যাটিচেঞ্জ' এ ধরনের পরিবর্তন আলট্রাসনোগ্রাম পরীক্ষায় ধরা পড়তে পারে।শরীরের যত্ন নিলে এ ধরনের পরিবর্তন স্বাভাবিক হয়ে এলেও মনে রাখতে হবে।ফ্যাটিচেঞ্জ ক্রমান্বয়ে সিরোসিসে রূপ নিতে পারে। যেসব রোগীর অনেকদিন ধরেশুয়ে বসে থাকতে হয় বা হচ্ছে তাদের গলবস্নাডের আলট্রাসনোগ্রাম করলেগলবস্নাডার সস্নাজ ধরা পড়তে পারে। গতিশীল জীবন যাত্রায় সঙ্গে সঙ্গে এ ধরনেরমামুলি ব্যাপারগুলো থেকে মুক্তি পাবেন। লিভারের হেমানজিওমা, সিস্ট এসবকিছুকেও তেমন আমলে নেন না চিকিৎসকরা। গর্ভবতী মায়ের ছোট গলবস্নাডার পাথরধরা পড়তে পারে। ধীরে ধীরে গর্ভধারণের পর এ পাথরগুলো মিলিয়ে যেতে পারে।
গর্ভের অনাগত শিশুর প্রস্রাবের থলি বা বস্নাডার অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়ায়কিডনির গুরুত্বপূর্ণ অংশ (পেলভি ক্যালিসিয়াল সিস্টেম) ফুলে যেতে পারে। তবেএসব অস্বাভাবিক দৃশ্য স্বাভাবিক হয়ে আসে জন্মের পর। বড়দের কিডনিরআলট্রানোগ্রামে অনেক সময় ছোট সিস্ট, ভাস্কুলার ক্যালসিফিকেশন দেখা দিতেপারে। দেহে এসব সিস্ট কোনো ধরনের ক্ষতিকর প্রভাব ফেলবে না। গর্ভাশয়ে অনেকসময় সিটিস্ক্যান, আলট্রাসনোগ্রাম ছোট আকৃতির টিউমার বা মাইরোমা ধরা দিতেপারে। এসব রিপোর্ট দেখে মোটেও মন খারাপ করবেন না। এসব টিউমার শরীরের জন্যক্ষতিকর নয়। বয়স্কদের ব্রেনের সিটিস্ক্যানে মগজের আকৃতি ছোট হয়ে আসছে বাব্রেইন এট্রোফি এসব রিপোর্ট দেখে উৎকণ্ঠিত হওয়ার কিছু নেই। বয়সের সঙ্গেসঙ্গে এসব দৃশ্য দেখা দেয়াই স্বাভাবিক তাই বলে এ ব্যাপারটিকে সর্বক্ষেত্রে এলজিমারস ডিজিজ ভাবলে চলবে না।
এছাড়া ব্রেনের করোয়েড প্লেক্সাস, বেসালগ্যাঙ্গলিয়ন অথবা পিনিয়াল গ্রন্থিতে ফিজিওলজিক্যাল সিস্ট সিটি স্ক্যান ধরাপড়তে পারে। মোটেও ঘাবড়াবেন না। স্তনে টিউমার সদৃশ ফাইব্রোএডিনোমা, সিস্ট, স্তনদানকারী মায়ের স্তনের গ্রন্থিগুলো অস্বাভাবিক স্ফীত অবস্থায়আলট্রাসনোগ্রাম বা সিটি স্ক্যানে ধরা দিতে পারে। এসব রিপোর্ট হাতে পেয়েই মনখারাপ করা যাবে না। আনকোড়া হাতুড়ে ডাক্তার, ডায়াগনস্টিক ক্লিনিকেররিসিপশনিস্ট বা অতিউৎসাহী সর্ববিশারদ সাধারণ ব্যক্তির কাছে কোনোডায়াগনস্টিক রিপোর্টের মর্মার্থ উদ্ধার করতে যাবেন না। এক্ষেত্রে হিতেবিপরীত হবে। রিপোর্ট নিয়ে সরাসরি চিকিৎসকের শরণাপন্ন তিনিই আপনাকে আশ্বস্তকরবেন। অস্বাভাবিক চিন্তাগুলো তখন মাথা থেকেও দূর হয়ে যাবে।
সূত্র - যায়যায়দিন