ইয়াবার নামে বিক্রি হচ্ছে জন্মবিরতিকরণ পিল। বাজার থেকে কম মূল্যে উচ্চমাত্রার জন্ম বিরতিকরণ পিল লাল রং করে ইয়াবা হিসেবে বিক্রি করছে একটি চক্র। আর এই নকল ইয়াবা খেয়ে বন্ধ্যাত্বের ঝুঁকিতে পড়ছে ইয়াবা গ্রহণকারী তরুণ-তরুণীরা।
সাধারণত কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ুয়া শিক্ষার্থী, পপ ও ব্যান্ড সঙ্গীতশিল্পী, গিটার শিক্ষার্থী, নৃত্যশিল্পী, চিকিৎসক, প্রকৌশলী, তরুণ ব্যাংকারসহ নানা পেশায় নিয়োজিত ব্যক্তিরা ভ্রান্ত ধারণা থেকে শারীরিক উত্তেজনা ও কর্মশক্তি বাড়ানোর জন্য প্রতিদিন অসংখ্য তরুণ-তরুণী ইয়াবার গ্রহণ করে থাকে। কিন্তু তাদের সঙ্গে প্রতারণা করে ইয়াবার নামে সরবরাহ করা হচ্ছে এসব জন্ম বিরতিকরণ পিল।
হলি ফ্যামিলি রেড ক্রিসেন্ট হাসপাতালের প্রাক্তন স্ত্রীরোগ ও প্রসূতিবিদ্যা বিশেষজ্ঞ ডা. রওশন জাহান রোজী বাংলানিউজকে জানান, জন্মবিরতিকরণ পিল এস্ট্রোজেন ও প্রোজেস্টেরোন নামে দুই ধরনের হরমোনের সমন্বয়ে তৈরি। এগুলো নিয়মিত সেবনের ফলে মেয়েদের শরীরের ওজন বৃদ্ধি, পিরিয়ড বন্ধ ও অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ হয়। এতে মেয়েরা বিষণ্নতায় ভোগে ও তাদের যৌন আগ্রহ কমে যায়। এক পর্যায়ে মেয়েদের ঋতুস্রাব বন্ধ হয়ে তারা বন্ধ্যা (সন্তান জন্মদানে অক্ষম) হয়ে যায়।
শুধু মেয়েদের ক্ষেত্রেই নয়, ছেলেদের শরীরে উপরেও নকল ইয়াবার মারাত্মক প্রভাব পড়ে। নিয়মিত সেবনে পিঠে ব্যথা, পিঠ গোলাকার হয়ে যাওয়া, শরীরের বিভিন্ন হাড় ও জোড়ায় ব্যথা, সামান্য আঘাতে হাড় ভেঙে যাওয়ার মতো জটিল সমস্যা দেখা দিতে পারে বলে জানান তিনি।
সম্প্রতি নকল ইয়াবার কয়েকটি নমুনা সংগ্রহ করে সরবরাহকারীদের ধরতে অভিযান শুরু করেছে ডিবি পুলিশ। ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) দক্ষিণের অবৈধ মাদকদ্রব্য উদ্ধার ও প্রতিরোধ ইউনিটের সহকারী কমিশনার (এসি) মো. আসাদুজ্জামান বাংলানিউজকে জানান, কয়েকমাস আগে রাজধানীর বাসাবো থেকে বিপুলসংখ্যক ইয়াবা উদ্ধার করার পর ল্যাব টেস্ট করা হয়। এতে দেখা যায়, এগুলো জন্মবিরতিকরণ পিল।
শুধু তাই নয়, ইয়াবার নামে অনেক সময় ঘুমের ওষুধ বিক্রি করা হয়। ডিবি পুলিশের (উত্তর) অবৈধ মাদকদ্রব্য উদ্ধার ও প্রতিরোধ ইউনিটের এসি একেএম মাহবুবুর রহমান বাংলানিউজকে জানান, ঘুমের ওষুধে লাল রং দিয়ে ডব্লিউওয়াই (WY) লিখে বাজারে বিক্রি করে। মাত্র ৫০ টাকার এসব নকল ট্যাবলেট খেয়ে ইয়াবার কোনো কাজ হয় না বরং ঘুম আসে বলেন জানান তিনি।
নিয়মিত ইয়াবা গ্রহণ করেন সোহেল (ছদ্মনাম)। তিনি বাংলানিউজকে জানান, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র বিশেষ করে যারা আগে কখনো ইয়াবা খায়নি তাদের কাছে এটি বিক্রি করা হয়। অপরিচিত ও নতুন গ্রাহককে এসব নকল ইয়াবা দিয়ে প্রতারণা করা হয় বলে জানান তিনি।
সোহেল আরো জানান, যারা এসব নকল ইয়াবার ব্যবসা করে তাদের সবাই আগে নিয়মিত ইয়াবা খেত। এখন লাভের জন্য নিজেরাই ব্যবসা করে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, আরও একটি উপায়ে নকল ইয়াবা তৈরি হয়। সেই ইয়াবা তৈরিতে ক্যাফেইন ও সোডিয়াম বেনজোয়েট নামক দুই ধরনের ক্ষতিকারক কেমিক্যাল ব্যবহার করা হয়। ক্যাফেইন ও সোডিয়াম বেনজোয়েটের সঙ্গে ভ্যানিলা পাওডার মিশিয়ে এতে লাল রং দিয়ে তৈরি হয় নকল এসব ইয়াবা। নাম প্রকাশ না করার শর্তে মিটফোর্ডের এক কেমিক্যাল বাবসায়ী বাংলানিউজকে এ তথ্য জানান।
গোয়েন্দা বিভাগ হতে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী পুরাতন ঢাকার মিটফোর্ড, লালবাগ, উত্তরা, যাত্রাবাড়ী ও বিজিবি গেট সংলগ্ন হাজারীবাগের সুইপার কলোনি এলাকায় হাতে তৈরি হচ্ছে এগুলো নকল ইয়াবা। মিটফোর্ড, বংশাল এলাকায় বেশ কয়েকটি দোকানে পাওয়া যায় নকল ইয়াবা তৈরি করার এসব কেমিক্যাল।
কেমিক্যাল বিক্রির কথা অস্বীকার করলেও মিটফোর্ডের কেমিক্যাল ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, মিটফোর্ড এলাকার রূপালী কেমিক্যালস, আরাফাত ও রাজীব পারফিউমার অ্যান্ড কেমিক্যালসহ বংশালের বেশ কয়েকটি দোকানে নকল ইয়াবা তৈরির অন্যতম উপাদান সোডিয়াম বেনজোয়েট ও ক্যাফেইন বিক্রি হয়। ইয়াবায় ক্যাফেইন যোগ করলে মস্তিষ্ককে অতিরিক্ত উত্তেজনা সৃষ্টি হয়।
সারডা নামে মাদক নিরাময় কেন্দ্রের বিশেষজ্ঞ ডাক্তার তাহমিদ নাঈম বাংলানিউজকে জানান, ক্যাফেইন উত্তেজনা সৃষ্টি করে নিজের মধ্যে কৃত্রিম ভালো লাগার শুরু করায়। তবে ক্যাফেইন গ্রহণের ফলে অস্থিরতা, ঘুম না হওয়া, হাত-পায়ে কাঁপুনি, দ্রুত হৃৎস্পন্দন ও রক্তচাপ বৃদ্ধি, এমনকি সেবনকারী ব্যক্তি মারাও যেতে পারে।
ইয়াবা গ্রহণকারী শিল্পীদের দাবি, পার্ফরম্যান্সের আগে উত্তেজনা সৃষ্টি ও নিজেকে চাঙা রাখতে তারা ইয়াবা সেবন করে থাকে।
আসল ইয়াবা রেখে কেন নকল ইয়াবার দিকে ঝুঁকছে ব্যবসায়ীরা এমন প্রশ্নে একজন আসল ইয়াবা বিক্রেতা বাংলানিউজকে জানান, ঢাকায় প্রতিদিন দুই লাখ এবং সারা দেশে তিন লাখের মতো ইয়াবার চাহিদা রয়েছে। প্রতিনিয়ত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে ইয়াবার বড় চালান আটক হওয়ায় ও তাদের ব্যাপক তল্লাশির কারণে ইয়াবার আমদানি কমেছে।তাই চাহিদা মেটাতে নকল ইয়াবা তৈরি করা হচ্ছে। এই ব্যবসায়ী তার প্রকাশ করতে চাননি।
তাহের নামে এক কেমিক্যাল ব্যবসায়ী বলেন, ইয়াবার ব্যাপক চাহিদার কারণে প্রভাবশালী একটি মহল সিন্ডিকেটের মাধ্যমে দীর্ঘদিন ধরে পুরান ঢাকায় তৈরি করে আসছে নকল ইয়াবা। অসাধু বাবসায়ীরা এসব দোকান থেকে কেমিক্যাল কিনে গোপনে অস্থায়ী কারখানায় তৈরি করে সেখানে ইয়াবা বানাচ্ছে। তারপর নগরীর প্রায় শতাধিক এলাকার প্রায় দেড়শ যুব ও তরুণদের ক্লাবে এবং ধানমণ্ডি, গুলশান, মগবাজার, ফার্মগেটসহ গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় ইয়াবা সরবরাহ করছে।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের কুষ্টিয়া জেলার সহকারী পরিচালক আইয়ুব আলী মিয়া বাংলানিউজকে জানান, ইয়াবার পার্শপ্রতিক্রিয়া হেরোইনের চাইতেও ভয়াবহ। এতে মেথাঅ্যামফিটামিন নামক একটি উপাদান থাকে। যা অতিরিক্ত সেবনের ফলে মস্তিষ্কের কোষ ধ্বংস হয়ে স্ট্রোক ঘটায়।
আইয়ুব আলী আরো জানান, সাধারণ ইয়াবার চেয়ে নকল ইয়াবা আরও বেশি ক্ষতিকর। এই ইয়াবা অতিরিক্ত গ্রহণের ফলে দ্রুত কিডনি বিকল, মস্তিষ্কের নার্ভের কার্যক্ষমতা হ্রাস, হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বাধাগ্রস্ত, শ্বাসনালীতে ক্ষত এবং ফুসফুসে ছিদ্র হওয়াসহ মৃত্যুর কারণ হতে পারে।
সূত্র - বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম

