চুল পেকে যাওয়া, ত্বকে বলি রেখা, দৃষ্টিশক্তি ক্ষীণ হওয়া, শ্রবণ শক্তি কমে যাওয়া, সঙ্গে পেশি দুর্বল, হাড়ের ক্ষয় হয়, যকৃৎ এবং বৃক্কের কার্যক্ষমতা কমতে থাকা—বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এ রকম নানা সমস্যা দেখা দেয়। শারীরিক পরিবর্তনের কারণে কিছু কিছু রোগ প্রকৃতিগত ভাবে বয়স্কদেরই হয়ে থাকে। যেমন: তাদের রক্তনালি সরু হয়ে যায়। ফলে উচ্চ রক্তচাপ, হূদেরাগ, মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ প্রভৃতি হতে পারে। প্রবীণদের মস্তিষ্ক ছোট হয়ে আসে, চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় বলে ‘ব্রেন এট্রফি’। এর ফলে মস্তিষ্কের কার্যক্ষমতা ধীরে ধীরে কমতে থাকে। কেউ কেউ আলঝেইমার বা ডিমেনসিয়ায় আক্রান্ত হন। এসব রোগে স্মৃতিশক্তি কমে যায়, আবেগ, অনুভূতি, বিচার বুদ্ধি, বিবেচনা শক্তি, চিন্তা ক্ষমতা, কাজ করার ক্ষমতা ইত্যাদিতে পরিবর্তন আসে। আচার-আচরণে অনেকেই শিশুতে পরিণত হন।
এ ছাড়া মাথা ঘোরা, হাত-পা কাঁপা যাকে বলে ‘পার্কিনসন্সডিজিজ’ ইত্যাদি নানা ধরনের মস্তিষ্কের রোগও প্রবীণদের মাঝে দেখা যায়। বয়সের সঙ্গে সঙ্গে হাড় ক্ষয়ে যায়, যাকে বলা হয় অস্টিওপরোসিস। এতে শরীরের বিভিন্ন স্থানে ব্যথা বোধ করেন প্রবীণেরা। মাঝে মধ্যে সামান্য আঘাতেই হাড় ভেঙে যায় তাঁদের। চোখে ছানি পড়াটাও বয়স্কদের রোগ। পুরুষদের ক্ষেত্রে প্রস্টেটগ্রন্থি বড় হয়ে প্রস্রাবের জটিলতা দেখা দিতে পারে। অনেক বয়স্ক ব্যক্তির শরীরে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যায়। ফলে তাঁদের বিভিন্ন ধরনের সংক্রমণে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। যেমন: নিউমোনিয়া, যক্ষ্মা ইত্যাদি।
শুধু শারীরিক সমস্যা নয়, মানসিক ভাবেও তাঁরা অনেক সময় বিপর্যস্ত থাকেন। পরিবারে অনেক সময় প্রবীণেরা অবহেলা-অযত্নের শিকার হন। কখনো কখনো নিজের সন্তানেরাও তাঁদের বোঝা মনে করেন। তাই কারও কারও আশ্রয় হয় বৃদ্ধাশ্রমে। আমি মনে করি, বয়স্কদের স্বাস্থ্যগত সমস্যার প্রধান কারণ হলো, চিকিৎসা-সুবিধার অভাব। আবার গ্রামের প্রবীণ আর শহরের প্রবীণের সমস্যা অনেক সময় ভিন্ন হয়।
প্রবীণদের স্বাস্থ্য সমস্যা চিকিৎসা বিজ্ঞানের একটি বিশেষায়িত বিভাগ। কিছু কিছু রোগ আছে যা শুধু বয়স্কদেরই হয়। তাই ওষুধ ও খাবার—দুটির ক্ষেত্রেই বয়স্কদের সতর্ক থাকতে হবে।
আমাদের দেশে এখনো বয়স্কদের স্বাস্থ্য সেবা দেওয়ার জন্য বিশেষায়িত চিকিৎসা সেবা সীমিত। এই বয়সে অনেক রোগই দেখা যায়, সুনির্দিষ্ট উপসর্গ থাকে না বা বয়স্করা সেগুলো ঠিকমতো অনুভব করেন না বা ভালো ভাবে প্রকাশ করতে পারেন না। অনেক সময় দেখা যায়, খুব জটিল বা মারাত্মক অসুখে বৃদ্ধ রোগী সাধারণ অবসাদ, দুর্বলতা, অস্বস্তি এ ধরনের সমস্যার কথা বলছেন। এমন ক্ষেত্রে পরিবার থেকেও নজর দেওয়া হয় না, এমনকি অনেক চিকিৎসকও যথার্থ মনোযোগ দেন না, হয়তো বার্ধক্য জনিত বলে মনে করেন। এভাবে অবহেলার ফলে অনেক রোগ নিরাময় সম্ভব হয় না। এর মূল কারণ বৃদ্ধদের সমস্যা সম্পর্কে বিশেষায়িত জ্ঞানের অভাব।
প্রবীণ বা বয়স্ক ব্যক্তিরা সম্মানিত। আমাদের মনে রাখা উচিত, আজ যাঁরা প্রবীণ, তাঁরাও অতীতে তাঁর পরিবার, সমাজ, দেশ ও জাতির কল্যাণে অনেক কিছু করে গেছেন। তাঁদের যেন কোনো রকম অবহেলা করা না হয়, সেদিকে লক্ষ রাখতে হবে। আমরা যাঁরা নবীন, তাঁরা যেন ভুলে না যাই যে আমাদেরও একদিন এ অবস্থায় উপনীত হতে হবে। আজ যদি আমরা তাঁদের প্রতি অবহেলা করি, তাহলে আমাদেরও এই রকম অবহেলার শিকার হতে হবে। পৃথিবীর অনেক দেশেই প্রবীণেরা অবহেলিত, উপেক্ষিত, সমাজে ও পরিবারে অনেকের কাছে বোঝা স্বরূপ। এ অবস্থাথেকে পরিত্রাণ পেতে আমাদের সবার প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া অবশ্য কর্তব্য।
প্রথমে মনে রাখতে হবে, প্রবীণেরা পরিবারেরই অংশ। পরিবারের অন্যান্য সদস্যের মতোই তাঁর সঙ্গে আচার-আচরণ করতে হবে। আমাদের নৈতিক দায়িত্ব হওয়া উচিত, সব সময় প্রবীণদের আদর যত্ন দিয়ে শিশুদের মতো করে প্রতিপালন করা। তাঁদের প্রতিমায়া-মমতা, ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা দেখানো। কোনো ক্রমেই তাঁদের মধ্যে যেন এই ধারণা না হয়, যে তাঁরা আমাদের জন্য একটি বোঝা।
পৃথিবীর অনেক দেশে প্রবীণদের জন্য বৃদ্ধনিবাস বা ওল্ড হোমের পর্যাপ্ত ব্যবস্থা আছে। প্রয়োজনে সে রকম ব্যবস্থা আমাদের দেশেও করতে হবে। তাই বলে অযত্ন-অবহেলায়, দায় এড়ানোর জন্য তাঁদের যেন এসব বৃদ্ধ নিবাসে ঠেলে দেওয়া না হয়, সেদিকেও নজর রাখতে হবে।
* আমাদের দেশে শুধু সরকারি কর্মচারী চাকরি হতে অবসর নেওয়ার পর সামান্য পরিমাণ পেনশন ভাতা পেয়ে থাকেন। প্রবীণ কি শুধু তাঁরাই হবেন? সরকারি চাকরির বাইরে যাঁরা অন্য পেশায় আছেন বা খেতে-খামারে কাজ করেন, তাঁরা কি বৃদ্ধ হবেন না? এঁদের জন্যও এ ধরনের সুবিধা থাকা জরুরি। তা সরকারকে অবশ্যই ভেবে দেখা উচিত।
* পেনশন বা বয়স্ক ভাতা হিসেবে যে অর্থ দেওয়া হয়, তারপ রিমাণটাও সম্মানজনক হওয়া উচিত, যাতে তাঁরা খেয়ে-পরে চলতে পারেন এবং পরনির্ভরশীল হতে না হয়।
* প্রবীণেরা যাতে স্বল্প ব্যয়ে উন্নত চিকিৎসা লাভ করতে পারেন, সে জন্য পর্যাপ্ত হাসপাতালের ব্যবস্থা করতে হবে। সরকারি হাসপাতালে তাঁদের জন্য আলাদা বিছানা বরাদ্দ থাকা উচিত। বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষা এবং ওষুধ তাঁদের বিনা মূল্যে বা অল্প দামে দেওয়া উচিত। এছাড়া প্রবীণদের চিকিৎসার জন্য বড় হাসপাতাল গুলোয় বিশেষায়িত বিভাগ খোলা উচিত।
* পরিবারের সদস্যদের বা ছেলেমেয়েদের মনে রাখা উচিত, তাঁরা যেন তাঁদের নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা করার ব্যবস্থা গ্রহণ করেন।
* বিভিন্ন সামাজিক, পারিবারিক, ধর্মীয় এমনকি রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানে যথা সম্ভব প্রবীণদের আমন্ত্রণ জানানো উচিত, যাতে তাঁরা নিজেদের অপ্রয়োজনীয় ও অবহেলিত মনে না করেন।
সূত্র - প্রথম আলো

