খাগড়াছড়ির রামগড় উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসক এবং প্রয়োজনীয় ওষুধের অভাবে পর্যাপ্ত ও সুষ্ঠু চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে রোগীরা। উপজেলা স্বাস্থ্য প্রশাসকসহ মাত্র দুজন চিকিৎসক থাকলেও বিপুল জনগোষ্ঠীর সেবা দিতে রয়েছেন মাত্র একজন চিকিৎসক।
এদিকে চিকিৎসক ও ওষুধসংকটের কারণে রামগড় ১৬ বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) চিকিৎসক দল এ এলাকায় বিনা মূল্যে চিকিৎসাসেবা দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের এক্স-রে ও বিভিন্ন যন্ত্রপাতি ছয় বছরেরও বেশি সময় ধরে ব্যবহারের অনুপযোগী একটি স্যাঁতসেঁতে কক্ষে পড়ে আছে।
সরেজমিনে দেখা গেছে, উইপোকা বাসা বেঁধেছে ওই কক্ষে। ফার্মাসিস্ট নাসির উদ্দিন জানান, গত বছর এটি মেরামত বাবদ এক লাখ ২০ হাজার টাকা খরচ দেখানো হয়েছে। কিন্তু এতে জনগণের এক পয়সারও উপকার হয়নি। সমস্যা যা ছিল, তা-ই রয়ে গেছে। এখানকার গরিব রোগীরা পয়সার অভাবে বেসরকারি ক্লিনিক কিংবা জেলা সদরের হাসপাতালে গিয়ে এক্স-রে করাতে পারে না।
গত ৪ এপ্রিল দুজন চিকিৎসক তিন মাসের বুনিয়াদি প্রশিক্ষণে চলে যাওয়ায় সংকট আরও বেড়েছে। উপজেলা স্বাস্থ্য প্রশাসকসহ (টিএইচএফপিও) মাত্র দুজন চিকিৎসক বর্তমানে কর্মরত। এ কারণে রোগীদের সমস্যা আরও তীব্র হয়েছে। টিএইচএফপিও প্রশাসনিক কাজ তদারক করায় মাত্র একজন চিকিৎসকের পক্ষে একা সব রোগী দেখা সম্ভব হয় না। এ অবস্থায় পাহাড়ি এই জনপদের দূর-দূরান্তের অনেক রোগী স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে এসে চিকিৎসা না নিয়েই ফিরে যাচ্ছেন।
রামগড় উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা গোপাল চন্দ্র দাস বলেন, স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের চিকিৎসক-সংকটসহ বিভিন্ন সমস্যার ব্যাপারে জেলা সিভিল সার্জনকে জানানো হয়েছে।
এদিকে চিকিৎসক ও ওষুধসংকটের কারণে বিজিবির চিকিৎসক দল রামগড় এলাকায় চিকিৎসা সেবা দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে। গত ২৭ মে এলাকার ৭০০ গরিব রোগীকে তারা বিনা মূল্যে চিকিৎসা সেবা দিয়েছে।
রামগড় বিজিবির অধিনায়ক লে. কর্নেল মোহাম্মদ নাঈম বলেন, ওই দিন গরিব রোগীদের মধ্যে এক লাখ টাকার ওষুধ বিতরণ করা হয়। স্বাস্থ্য প্রশাসক মো. নুরুল আলম জানান, স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ১১ জন চিকিৎসকের পদ রয়েছে। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা, চিকিৎসা কর্মকর্তা, মেডিসিন বিশেষজ্ঞ, ডেন্টাল সার্জন, চক্ষুরোগ বিশেষজ্ঞ, সার্জারি বিশেষজ্ঞ, এনেসথেসিয়া বিশেষজ্ঞ ও গাইনি বিশেষজ্ঞের পদ শূন্য। তিনি বলেন, উপযুক্ত কক্ষ ও বিদ্যুৎ সরবরাহ পর্যাপ্ত না থাকায় এক্স-রে যন্ত্র সচল করা যাচ্ছে না।
এ প্রসঙ্গে বিদ্যুৎ বিভাগের আবাসিক প্রকৌশলী মো. মোস্তফা কামাল বলেন, ভোল্টেজ রেগুলেটর, পিএফআই প্ল্যান্ট (পাওয়ার ফ্যাক্টর ইমপ্রুভমেন্ট) ও উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন ট্রান্সফরমার না বসানোয় এ সমস্যার সমাধান হচ্ছে না। তিনি বলেন, বিদ্যুৎ সরবরাহব্যবস্থায় নিম্নমানের যন্ত্রপাতি ব্যবহূত হয়েছে। তাই দুই দিন পর পরই যান্ত্রিক সমস্যা হয়।
সম্প্রতি কালাডেবা গ্রামের আজিজুল হক ও উত্তর লামকু পাড়ার মো. হানিফ প্রচণ্ড জ্বর নিয়ে ভর্তি হন স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে। কিন্তু যথাযথ চিকিৎসা না পেয়ে তাঁদের স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ছাড়তে হয়। তাঁরা বলেন, বিদ্যুৎ চলে গেলে পুরো কমপ্লেক্সে ভুতুড়ে অবস্থা বিরাজ করে। মোমবাতি কিংবা হারিকেনের আলোতে স্যালাইন দেওয়া হয়। বাইরের ওষুধই রোগীদের ভরসা, এখানে দরকারি ওষুধ নেই। রোগীরা এখানে ভীষণ অসহায় অবস্থায় রয়েছেন। তাঁরা বলেন, উপসহকারী কমিউনিটি চিকিৎসা কর্মকর্তারাই এখন রোগীদের একমাত্র ভরসা।
এদিকে রামগড়ের হাফছড়ি ও পাতাছড়া ইউনিয়নের স্বাস্থ্যসেবাকেন্দ্র দুটির অবস্থাও করুণ বলে জানিয়েছেন এলাকাবাসী। দুটি স্বাস্থ্য সেবাকেন্দ্রে দুজন চিকিৎসা কর্মকর্তার পদ দীর্ঘদিন ধরে শূন্য। ওই এলাকাগুলোর দরিদ্র লোকজন ওষুধ ঠিকমতো না পাওয়ার অভিযোগ করেছেন।
পাতাছড়া ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মো. আলমগীর জানান, চিকিৎসা কর্মকর্তার অনুপস্থিতিতে গ্রামাঞ্চলে হাতুড়ে চিকিৎসকেরা চিকিৎসার নামে অপচিকিৎসা চালিয়ে প্রতারণা করার সুযোগ পাচ্ছেন।
এসব ব্যাপারে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে খাগড়াছড়ির সিভিল সার্জন হাসান ইমান চৌধুরী বলেন, পাহাড়ি এলাকায় চিকিৎসক এসে থাকতে চান না। শূন্য পদের বিপরীতে চিকিৎসক চেয়ে মন্ত্রণালয়ে চিঠি দেওয়া হয়েছে। তিনি স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের অনিয়মের খোঁজখবর নেওয়ার কথা জানান।
রামগড় উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা গোপাল চন্দ্র দাস বলেন, চিকিৎসক ও ওষুধের অভাবে প্রতিদিন অনেক রোগী চিকিৎসা না পেয়ে এখান থেকে ফিরে যান। সমস্যার সমাধানে তিনি সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন।
Source: The Daily Prothom Alo

