খবরটি শুনে আকাশ ভেঙে পড়ে কামাল হোসেনের (ছদ্মনাম)। এর জের ধরেই তাকে পড়তে হয় নানা বিড়ম্বনায়।
ঘটনাটি নারায়ণগঞ্জের এক পোশাক কর্মীর। কারখানার পাশের একটি ক্লিনিকে তার শরীরে এইচআইভির অস্তিত্ব ধরা পড়ার পর দ্রুতই খবরটি ছড়িয়ে পড়ে তার কর্মক্ষেত্রে।
এরপর কারখানা থেকে চাকরি হারান স্বামী-স্ত্রী। ছাড়তে হয় ভাড়ার বাসাও।
সামাজিক বিড়ম্বনা থেকে রেহাই পেতে কয়েক দিন আত্মগোপনে থাকার পর ঢাকায় একটি জায়গা খুঁজে পান এই দম্পতি।
বিশ্ব এইডস দিবসের আগের দিন শনিবার রাজধানীর একটি পুনর্বাসন কেন্দ্রে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের কাছে এই নিদারুন অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন হোসেন।
এইচআইভি সংক্রমণ শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনার পাশাপাশি এইডসে মৃত্যু এবং এইডস নিয়ে সামাজিক কুসংস্কার ও বৈষম্য শূন্যে নামিয়ে আনার লক্ষ্য অর্জনকে এবারের এইডস দিবসের প্রতিপাদ্য করা হয়েছে।
বাংলাদেশে এইচআইভি/এইডস রোগীর সংখ্যা খুব বেশি না থাকলেও সমাজের বেশ গভীরে এ নিয়ে কুসংস্কার রয়েছে। এমনকি স্বাস্থ্যসেবায় নিয়োজিতরাও তার বাইরে নয়। আর এটাই এইডস বিরোধী লড়াইয়ের লক্ষ্য অর্জনের জন্য বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে বলে সতর্ক করেছে ইউএনএইডস।
হোসেন বেশ স্বাস্থ্যবান।কিন্তু গত ফেব্রুয়ারিতে চিকিৎসকরা যখন তাকে এইচআইভির কথা জানান তখন ‘বুক শুকিয়ে যায়’ বলে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন তিনি।
চিকিৎসকরা তাকে বলেছিলেন, তিনি বেশি দিন বাঁচবেন না।
“তারা আমাকে বলেছিল, তুমি তাড়াতাড়ি মারা যাবে। যে শখ আছে তা পূরণ করে নাও। তোমার স্ত্রীও মারা যাবে,” বলেন হোসেন।
ক্লিনিকের চিকিৎসকরা হোসেনের স্ত্রীকে না দেখলেও রক্তের পাশাপাশি শারীরিক সম্পর্কের মধ্য দিয়ে এটা সংক্রমিত হয় বলে তারও এইচআইভি থাকার বিষয়টি ধরে নিয়েছিলেন।
সন্তান নেয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে চিকিৎসক তাকে বলেন, “তুমি তো বাঁচবে না। তাহলে সন্তান চাও কিভাবে?”
বিপর্যস্ত হয়ে ক্লিনিক থেকে বেরিয়ে আসেন হোসেন। কিন্তু অফিসে তার জন্য আরো খারাপ কিছু অপেক্ষা করছিল।
তিনি বলেন, “আমার কান্না আসছিল। কিন্তু অফিসে যাওয়ার জন্য নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করছিলাম। অফিসে পৌঁছাতে ১৫ মিনিটের পথে দুই থেকে তিন লিটার পানি খেয়েছিলাম।
“অফিসে ঢোকার পর আমাকে আলাদা একটি কক্ষে নেয়া হয় যেখানে আমার স্ত্রী বসেছিল। আমাদের সুপারভাইজার তার সঙ্গে কথা বলছিলেন। তার স্বাস্থ্যের অবস্থা সম্পর্কে খোঁজ নিচ্ছিলেন।”
দুপুরের খাবারের সময় হলেও তাদের খাবারের ক্যান্টিনে যেতে দেয়া হয়নি বলে জানান হোসেন।
“এক মাসের বেতন দিয়ে তারা আমাদের আর অফিসে আসতে বারণ করে দেয়। সহকর্মীদের কাছ থেকেও আমাদের বিদায় নিতে দেয়া হয়নি, যাদের সঙ্গে প্রায় ১০ বছর কাজ করেছি।”
এতো দ্রুত তার অফিস কিভাবে জানল যে তার শরীরে এইচআইভি রয়েছে?
হোসেন বলেন, “ক্লিনিক থেকে তাদের জানানো হয়। আমাদের থেকে যাতে আর কারো মধ্যে এ ভাইরাস না ছড়ায় সেজন্য ক্লিনিক থেকে আমাদের কথা জানিয়ে দেয়া হয়।
“আমার সঙ্গে কথা হওয়ার সময় তারা আমার অফিসের ঠিকানা নিয়েছিল।”
তিনি জানান, আশপাশে ও পরিচিত জনদের মধ্যে খবরটি এতো দ্রুত ছড়িয়েছিল যে, অনেকে তাদের শেষ দেখা দেখতে আসেন।
দুজনেরই এইচআইভি ধরা পড়েছে জানতে পেরে বাড়িওয়ালা ‘তাৎক্ষণিকভাবে’ বাসা ছেড়ে চলে যেতে বলেন।
“বেশ দূরের একটি জায়গায় আমরা কোনো রকমে কয়েক দিনের জন্য আত্মগোপন করেছিলাম। পরে আমার এক ছোট ভাই এই কেন্দ্রের কথা জানতে পারে এবং আমরা এখানে চলে আসি।”
কেন্দ্রে একটি চাকরিও হয় তার। দুজনই বিনামূল্যে ওষুধ পাওয়ায় বেশ ভালোই চলে তাদের।
কেন্দ্রে আবারো পরীক্ষা করা হলে দুজনের শরীরেই এইচআইভি পাওয়া যায়।
হোসেন জানান, তিন বছর আগে মস্তিষ্কে একটি বড় ধরনের অস্ত্রোপচারের সময় তার স্ত্রীর এইচআইভি সংক্রমণ হয়।
“২০১০ সালে তার অস্ত্রোপচারের সময় আমি ১০ ব্যাগ রক্ত যোগাড় করেছিলাম। কেনা ওই রক্তের মাধ্যমে এইচআইভি ভাইরাস তার শরীরে ঢোকে এবং পরে তা আসে আমার দেহে।”
“কিন্তু গত ফেব্রুয়ারির আগ পর্যন্ত আমরা এ বিষয়ে কিছুই জানতাম না। স্বাস্থ্যের অবনতি হলেও টিকে থাকার লড়াইয়ে কাজ নিয়ে ব্যস্ত ছিলাম আমরা।”
হোসেন বলেন, এইচআইভি সংক্রমণের কথা জানানোর আগে চিকিৎসক বারবার জানতে চান, “আমি এদিক-সেদিক অনিরাপদ শারীরিক সম্পর্ক করেছি কি না।”
“আমাকে বলে, তোমার এইডস হয়েছে। তুমি তাড়াতাড়ি মারা যাবে। তোমার স্ত্রীরও এইচআইভি সংক্রমণ হয়েছে।”
আশার আলো সোসাইটির নির্বাহী পরিচালক হাবিবা আক্তার বলেন, এইচআইভি সংক্রমণের প্রথম ঘটনা ধরা পড়ার পর ২০ বছরেরও বেশি সময় পার হলেও এ নিয়ে সমাজে ভ্রান্ত ধারণা রয়েছে। তবে সম্প্রতি তা কিছুটা কমে আসতে শুরু করেছে।
এইডস রোগীদের পুনর্বাসনে নিয়োজিত এই প্রতিষ্ঠানের অন্যতম কর্ণধার হাবিবারও এইচআইভি ধরা পড়েছিল।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, গত বছর পর্যন্ত বাংলাদেশে এইচআইভি আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা তিন হাজারের মতো।
তবে জাতিসংঘের মতে বাংলাদেশে আট হাজারের বেশি মানুষের দেহে এইচআইভি ভাইরাস রয়েছে। তার অর্থ দাঁড়ায়, সমাজের নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি উপেক্ষা করতে না পারায় অনেকে এখনো চিকিৎসার বাইরে রয়েছেন।
“স্বাস্থ্যকর্মীদের মধ্যেও ব্যাপকভাবে নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি রয়েছে। অনেকে এইচআইভি সংক্রমিতদের সরাসরি ক্লিনিক থেকে বের করে দেন। আবার অনেকে তাদের এক জায়গায় থেকে অন্য জায়গায় পাঠান।”
হাবিবা বলেন, চলতি বছরেই ঢাকার একটি বড় হাসপাতাল তাদের এক রোগীর পিত্ত থলির পাথর অপসারণের অস্ত্রোপচার করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে।
“তার প্রেসক্রিপশনে বড় হরফে এইচআইভি পজিটিভ লিখে ‘কোনো শয্যা খালি নেই’র একটি সিল দিয়ে দেন তারা।”
জাতীয় এইডস/এসটিডি কর্মসূচির লাইন ডিরেক্টর মো. আব্দুল ওয়াহেদ বলেন, এইডস নিয়ে আগের তুলনায় পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে।
“আমাদের এইচআইভি/এইডস রোগী খুব বেশি নয়। তাই তাদের চিকিৎসা দেয়া আমাদের জন্য কঠিন নয়।”
তিনি জানান, আগামী জানুয়ারি থেকে ঢাকা , চট্টগ্রাম, সিলেট, খুলনা ও রাজশাহীর পাঁচটি মেডিকেলে এইচআইভি রোগীদের ওয়ানস্টপ সার্ভিস দেয়ার লক্ষ্যে কাজ চলছে।
“তাই আমি মনে করি, ভবিষ্যতে আর কোনো সমস্যা হবে না।”
ওয়াহেদের এই আশাবাদের সঙ্গে একমত হতে পারেননি আশার আলো সোসাইটির হাবিবা আক্তার, যিনি হোসেনের মতো অনেক এইচআইভি আক্রান্তকে সেবা দিয়ে চলেছেন।
তিনি বলেন, “চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে আমি এ ধরনের একটি সেন্টার ঘুরে দেখেছি। অপরিচ্ছন্ন পরিত্যক্ত ছোট কক্ষে তা করা হয়েছে। রোগীরা সেখানে যাওয়া বন্ধ করে দেবে।”
এছাড়া সেখানে চিকিৎসকদের উপস্থিতি এবং এইচআইভি সংক্রমিতদের পরিচয় গোপন রাখার বিষয়টি নিশ্চিত করতে না পারলে এই সেন্টার কতোটা কার্যকর হবে তা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেন তিনি।
হাবিবার সঙ্গে সংশয়ের কথা জানান হোসেনও।
নিজের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে তিনি বলেন, “খবরটি শোনার পর ১০ দিনে আমার ২০ কেজি ওজন কমেছিল। ওই ক্লিনিক আমাকে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করে ফেলেছিল। আমি ভয়ও পেয়েছিলাম।”
“কিন্তু এখানে আমি দেখছি, এইচআইভি ধরা পড়ার পর ১৫ বছর, ২০ বছর এমনকি তার চেয়ে বেশি সময় অনেকে বেঁচে আছেন। তাদের স্বাস্থ্য দেখে আপনার মনে হবে না যে, তারা এইচআইভি নিয়ে বেঁচে আছে।”
তার স্ত্রী এখন সন্তান সম্ভবা জানিয়ে হোসেন বলেন, “ক্লিনিক থেকে আমাকে বলা হয়েছিল, আমরা বাঁচব না। তাই সন্তানের কথা চিন্তা করার দরকার নেই। কিন্তু এখানে এসে আমি জানতে পারি, ঠিক মতো ওষুধ নিলে আমার স্ত্রীর এখনো সুস্থ সন্তান হেতে পারে।”
সূত্র - bdnews24.com

