বৈশ্বিক উষ্ণায়ন রোধে একটি পথনকশার (রোডম্যাপ) প্রশ্নে সমঝোতায় পৌঁছতে পোল্যান্ডের রাজধানী ওয়ারশতে জাতিসংঘ জলবায়ু সম্মেলন গতকাল শনিবার পর্যন্ত গড়িয়েছে। শুক্রবার গ্রিনিচ মান সময় বিকেল পাঁচটায় সম্মেলন শেষ হওয়ার কথা থাকলেও শনিবার দিনমানজুড়ে মূল বিষয়গুলো নিয়ে একটি মতৈক্যে পৌঁছতে ব্যস্ত ছিলেন আলোচকেরা।
এদিকে বার্তা সংস্থা এএফপি জানিয়েছে, মূল বিষয়ে মতৈক্য না হলেও জাতিসংঘের সমঝোতাকারীরা গতকাল ২০১৫ সালের সম্ভাব্য জলবায়ু চুক্তির কয়েকটি বিষয়ে অংশগ্রহণকারী দেশগুলোর সঙ্গে ঐকমত্যে পৌঁছতে পেরেছেন। ১১ নভেম্বর এ সম্মেলন শুরু হয়। এতে ১৯৪টি দেশের প্রতিনিধিরা অংশ নেন। সম্মেলনে ক্ষতিকর কার্বন নির্গমনের দায়ভার গ্রহণ নিয়ে ধনী এবং উন্নয়নশীল দেশগুলোর মধ্যে মতানৈক্যের কারণে কোনো চুক্তিতে পৌঁছতে পারেননি জাতিসংঘের সমঝোতাকারীরা। ধনী ও দরিদ্র দেশগুলো কী পরিমাণ কার্বন নির্গমন কমাবে এবং জলবায়ু-ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোকে তহবিল সরবরাহের এ প্রশ্নে বিরোধের সৃষ্টি হয়।
গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমন ঠেকাতে ২০১৫ সালে পরিকল্পিত আন্তর্জাতিক চুক্তির এখনই একটি পথনকশা চায় উন্নয়নশীল দেশগুলো। কিন্তু ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ (ইইউ) উন্নত বিশ্ব এ নিয়ে গড়িমসি করছে। দুই পক্ষের মধ্যে এ নিয়ে কোনো সমঝোতা না হওয়ায় ওয়ারশ জলবায়ু সম্মেলনেও দেখা দেয় অচলাবস্থা।
একই ইস্যুতে সম্মেলনের শুরুতেও দুই পক্ষের মধ্যে বিরোধ দেখা দেয়। সম্মেলনে অংশ নেওয়া প্রতিনিধিরা বলছেন, বিরোধের কারণে বিষয়টি শেষ পর্যন্ত এবারও অনিষ্পত্তিই রয়ে গেল।
সম্মেলনের সভাপতি পোল্যান্ডের মারসিন করোলেক গতকাল সম্মেলনে যোগ দেওয়া প্রতিনিধিদের উদ্দেশে বলেন, ‘ওয়ারশে এই গুরুত্বপূর্ণ কাজটি (খসড়া প্রণয়ন) গ্রহণ এবং চূড়ান্ত না করার পরিণতি সম্পর্কে সতর্কভাবে বিবেচনার জন্য আমি আপনাদের অনুরোধ করছি।’ তিনি বলেন, সংশ্ল্লিষ্ট পক্ষগুলোর ইচ্ছার বিরুদ্ধে জোর করে কোনো সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়া হবে না।
সম্মেলনে অগ্রগতি না হওয়ায় বাংলাদেশসহ কিছু উন্নয়নশীল রাষ্ট্র তাদের অসন্তুষ্টির কথা তুলে ধরে। বাংলাদেশের প্রতিনিধি কামরুল চৌধুরী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, বাংলাদেশ ও স্বল্পোন্নত দেশগুলো এই যুদ্ধে হেরে গেছে। তিনি বলেন, ‘আবারও আমাদের স্বপ্নের মৃত্যু ঘটল। আমরা শোকাহত।’
এদিকে উন্নয়নশীল দেশগুলোর প্রতিনিধিরা এবং চীন বলেছে, তারা সৃষ্ট পরিস্থিতিতে ‘নিরুৎসাহিত’। জবাবে ইউরোপ বলেছে, প্যারিসের পথে খসড়াটি একটি ‘সূক্ষ্ম মীমাংসা’।
দাতা সংস্থা অক্সফামের প্রচারণা পরিচালক সেলিন শেভরেট বলেন, অর্থনৈতিক বিষয়ে আজ (শনিবার) অর্থবহ কিছুই ঘটবে না। সম্মেলনে আসা দেশগুলো সমস্যার তীব্রতা হ্রাসে এবং সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ গরিব দেশগুলোর সাহায্যে প্রয়োজনীয় অর্থসহায়তাও ধনী দেশগুলো দেবে বলে তাঁরা আশা করছেন না।
বৈশ্বিক উষ্ণতার হার নিজ নিজ অবস্থান থেকে গড়ে দুই ডিগ্রি সেলসিয়াস (৩ দশমিক ৬ ডিগ্রি ফারেনহাইট) কমানোর লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে মূলত ধনী ও দরিদ্র দেশগুলোর মধ্যে বিরোধ চলে আসছে দীর্ঘদিন ধরে। গ্রিন হাউস গ্যাস নির্গমন কমানোর এই লক্ষ্য পূরণে আগামী ২০১৫ সালে অনুষ্ঠেয় প্যারিস সম্মেলনে চুক্তি সইয়ের কথাও রয়েছে। এ চুক্তি সইয়ের পর ২০২০ সালের মধ্যে তা কার্যকরও হওয়ার কথা।
ধনী ও দরিদ্র দেশগুলো কী পরিমাণ কার্বন নির্গমন কমাবে এবং জলবায়ু-ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোকে তহবিল সরবরাহ প্রশ্নে সম্মেলনে অংশগ্রহণকারী দেশের প্রতিনিধিরা শুরু থেকেই তর্কে জড়ান। চীনের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলোর দাবি, যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের মাধ্যমে পরিবেশের সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হচ্ছে, অতএব তাদেরই সবচেয়ে বেশি হারে কার্বন নির্গমন কমাতে হবে। অন্যদিকে পশ্চিমাদের যুক্তি, চীন ও ভারতের মতো দ্রুত উদীয়মান দেশগুলো পরিবেশের ক্ষতি করছে বেশি। অতএব কার্বন নির্গমন হ্রাসেও তাদেরই নেতৃত্ব দিতে হবে। অন্যদিকে তহবিল সরবরাহের বিষয়টিও অমীমাংসিতই রয়ে গেছে।
শেষ পর্যন্ত মোটা দাগে এবারও বড় কোনো অগ্রগতি অর্জিত না হলেও ওয়ারশ সম্মেলনে কিছু সাফল্যও এসেছে বৈকি। ক্রান্তীয় বনাঞ্চল রক্ষাসংক্রান্ত একটি নতুন আইনে সম্মত হয়েছে সব পক্ষই। পরিবেশ থেকে কার্বন ডাই-অক্সাইড নিঃসরণে এই বনাঞ্চলের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। তা ছাড়া গাছ পচে গেলে কিংবা কেটে ফেললেও পরিবেশে কার্বন নির্গমন হয়। এএফপি, দ্য গার্ডিয়ান, বিবিসি।
সূত্র - প্রথম আলো

