জনসমক্ষে ধূমপান আমাদের দেশে হরহামেশাই দেখা যায়। পৃথিবীর অন্যান্য অনেক দেশের মতো বাংলাদেশেও জনসমক্ষে ধূমপান নিষিদ্ধকরণ আইন প্রণয়ন হয়েছে। কিন্তু বেশির ভাগই এ আইন মানে না। এতে অধূমপায়ী ও শিশুরা ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে। তবে, প্রকাশ্য ধূমপানে সবচেয়ে বেশি ক্ষতির শিকার হয় শিশুরা। এদিকে, প্রকাশ্য ধূমপান নিষিদ্ধ আইনের ফলে ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকায় ‘অকালজাত শিশু’ জন্মের হার প্রায় ১০ ভাগ কমে গেছে বলে সাম্প্রতিক এক গবেষণার বরাত দিয়ে জানিয়েছে বিবিসি।
ব্রিটেনে গাড়িতে শিশু থাকা অবস্থায় ধূমপান করাকে বেআইনি ঘোষণা করার কথা ভাবছেন দেশটির মন্ত্রীরা। ছবি:বিবিসিইউরোপ ও উত্তর আমেরিকায় পরিচালিত পূর্ববর্তী ১১টি গবেষণার তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করা হয়েছে এ গবেষণায়। গবেষকেরা জানিয়েছেন, জনসমক্ষে ধূমপান নিষিদ্ধকরণ আইন শিশুস্বাস্থ্যের ক্ষেত্রে ইতিবাচক প্রভাব ফেলছে। ধূমপানমুক্ত আইনের জন্য বছরে ‘অকালজাত শিশু’ (প্রিম্যাচিউর বেবি) জন্ম এবং শিশুদের মারাত্মক হাঁপানি প্রায় ১০ ভাগ কমে গেছে। পাশাপাশি প্রায় ছোট আকৃতি নিয়ে শিশুজন্মের হারও কমেছে প্রায় ৫ ভাগ। এ গবেষণা প্রতিবেদনকে দৃষ্টান্ত হিসেবে উল্লেখ করে ‘রয়্যাল কলেজ অবসেট্রেসিয়ানস অ্যান্ড গাইনোকোলজিস্টস’ থেকে বলা হয়েছে, ‘ধূমপান নিষিদ্ধকরণ বয়স্ক ও শিশু উভয়ের জন্যই মঙ্গলজনক।’
এ গবেষণায় অংশ নিয়েছেন এডিনবরা বিশ্ববিদ্যালয়, মাসট্রিখট বিশ্ববিদ্যালয়, হাসেল বিশ্ববিদ্যালয়, হার্ভার্ড মেডিকেল স্কুল এবং ব্রিগহাম অ্যান্ড উইমেন হাসপাতালের চিকিত্সা গবেষকেরা। প্রায় ২৫ লাখ শিশুর জন্ম-সংক্রান্ত খোঁজখবর রাখা হয়েছে। শিশুকালে হাঁপানি আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে চিকিত্সা নিয়েছেন এমন প্রায় দুই লাখ ৫০ হাজার শিশুর চিকিত্সা-সংক্রান্ত তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করা হয়েছে। নেদারল্যান্ডসের মাসট্রিখট মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক জ্যাসপার বিন জানিয়েছেন, এ ক্ষেত্রে কেবল ১২ বছরের চেয়ে কম বয়সী শিশুদের তথ্যই ব্যবহার করা হয়েছে।
সুস্পষ্ট প্রমাণ
আইন অনুসারে জনসমক্ষে, বিশেষ করে গণপরিবহন, বার, রেস্তোরাঁ এবং কর্মক্ষেত্রে ধূমপান নিষিদ্ধ। বিভিন্ন রাষ্ট্রে ধূমপানবিরোধী আইন প্রয়োগের ফলে সংশ্লিষ্ট অঞ্চলে বসবাসকারী শিশুদের স্বাস্থ্যে কতটা প্রভাব ফেলেছে মূলত সে বিষয়টি নিয়েই প্রাথমিকভাবে গবেষণাটি করা হয়েছে। গবেষকেরা জানিয়েছেন, এ আইনের ফলে ইতোমধ্যে বয়স্কদের ক্রমাগত ধূমপানের প্রবণতা কমে গেছে।
গবেষক জ্যাসপার বিন বলেন, ‘আমাদের গবেষণা সুস্পষ্টভাবে প্রমাণ করে যে ধূমপান নিষিদ্ধকরণ শিশুস্বাস্থ্যের ক্ষেত্রে ব্যাপক সুফল বয়ে এনেছে। এটি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সুপারিশ জাতীয় পর্যায়ে ধূমপানমুক্ত জন-পরিবেশ সৃষ্টি করতে ব্যাপক সমর্থন জোগাবে।’
যুক্তরাষ্ট্রের বোস্টনের ব্রিগহাম অ্যান্ড উইমেন হাসপাতালের অধ্যাপক এবং গবেষণাপত্রটির সহ-লেখক আজিজ শেখ বলেন, ‘যেসব দেশ এখনো ধূমপান নিষিদ্ধ আইনের আওতায় আসেনি, সেই সব দেশ এই গবেষণা ফলাফলের আলোকে স্বাস্থ্যনীতি-বিষয়ক এই গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের উত্তর খুঁজে পেতে পারে।’
এ ধরনের আগের গবেষণাগুলোতে দেখা গেছে, পরোক্ষ ধূমপানে (অন্যের ধূমপানের ফলে) দুনিয়াজুড়ে প্রায় ৪০ ভাগ শিশু শ্বাস-প্রশ্বাসজনিত রোগে ও হাঁপানিতে আক্রান্ত হয়ে থাকে। সাম্প্রতিক সময়ে ইউরোপের বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, ক্রমাগত এমন পরোক্ষ ধূমপানে শিশুদের ধমনি মোটা হয়ে যেতে পারে, ফলস্বরূপ পরবর্তী জীবনে স্ট্রোক ও হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি বাড়ে। বিশেষজ্ঞরা বলেন, পরোক্ষ ধূমপানে শিশুরা অধিক ঝুঁকিতে পড়ার কারণ হচ্ছে তাদের ফুসফুস ও রোগ প্রতিরোধকারী বিভিন্ন কোষ পূর্ণভাবে বিকশিত থাকে না।
বর্তমানে সারা বিশ্বের প্রায় ১৬ ভাগ মানুষ ধূমপান নিষিদ্ধ আইনের আওতায় এসেছেন। স্কটল্যান্ডে ২০০৬ সালে এবং ইংল্যান্ডে ২০০৮ সালে জনসমক্ষে ধূমপান নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
‘রয়্যাল কলেজ অবসেট্রেসিয়ানস অ্যান্ড গাইনোকোলজিস্টস’-এর অধ্যাপক রনি ল্যামন্ট বলেন, ‘গর্ভাবস্থায় ধূমপান করলে ভ্রূণ বিকাশের ক্ষেত্রে প্রতিকূল প্রভাব ফেলে। গর্ভবতী মায়েদের সুস্থ জীবনযাপনে অভ্যস্ত হওয়া উচিত এবং তাঁদের এ বিষয়ে জানা প্রয়োজন।’
সূত্র - প্রথম আলো

