মিরপুরের ব্যাপ্টিস্ট মিশন ইন্টিগ্রেটেড স্কুলে গত বছরও দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী মেয়েরা প্রায় বিনা মূল্যে পড়ার সুযোগ পেয়েছে। মাসে ওদের খরচ হতো সর্বোচ্চ এক হাজার ৩০০ টাকা। তবে বর্তমানে সেই একই প্রতিষ্ঠানের হোস্টেলে থেকে লেখাপড়া করতে কারও কারও ক্ষেত্রে বছরে ২৪ হাজার টাকার বেশি খরচ হবে। বেশির ভাগ অভিভাবকেরই এত বেশি টাকা খরচ করে পড়ানোর সংগতি নেই।
প্রতিষ্ঠানটিতে প্রথম থেকে সপ্তম শ্রেণী পর্যন্ত প্রতিষ্ঠানের ভেতরে এবং এরপর মিরপুরের আইডিয়াল গার্লস ইনস্টিটিউটে এ প্রতিষ্ঠানের তত্ত্বাবধানে দশম শ্রেণী পর্যন্ত পড়াশোনা ও এসএসসি পরীক্ষা দেওয়ার সুযোগ রয়েছে।
মিরপুর ১০ নম্বরের এ প্রতিষ্ঠানে ১০০ জন দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী মেয়ের জন্য আবাসিক ব্যবস্থা আছে। তবে বর্তমানে সেখানে আছে ৫৫ জন। হোস্টেলের বাইরে থেকেও অভিভাবকেরা মেয়েকে এ প্রতিষ্ঠানে পড়ানোর সুযোগ পাচ্ছেন। সব মিলে প্রথম থেকে দশম শ্রেণী পর্যন্ত মোট শিক্ষার্থী ৮৫ জন। প্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষ বলছে, দাতাগোষ্ঠীর পক্ষ থেকে আর্থিক সহায়তা মিলছে না। তাই প্রতিষ্ঠানটিকে টিকিয়ে রাখতেই এ ব্যবস্থা। তবে অভিযোগ রয়েছে, প্রতিষ্ঠানটিকে বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহারের জন্যই মেয়েদের তাড়ানোর চেষ্টা চলছে।
পাঁচজন দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী মেয়েকে নিয়ে ভাড়া বাসায় প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম শুরু হয় ১৯৭৭ সালে। ১৯৮৩ সালে জার্মানির ক্রিস্টোফেল ব্লিনডেন মিশন স্কুলের জমি, ১০০ জনের থাকার জন্য হোস্টেল এবং একটি ব্রেইল প্রেসের ব্যবস্থা করেন। গত বছর পর্যন্ত হোস্টেলের এবং বাইরের মেয়েরা বিনা মূল্যে ব্রেইল বই পেয়েছে। এবার বাইরের মেয়েদের বই কিনতে বলা হয়েছে। জানা গেল, বই না করে ব্রেইল প্রেস থেকে মাসিক ম্যাগাজিন বের করার উদ্যোগ নিয়েছে কর্তৃপক্ষ।
হোস্টেলে থাকা শিক্ষার্থীর একজন অভিভাবক বলেন, ‘মেয়েকে হোস্টেলে আর পাঠাব কি না, তাই চিন্তা করতেছি। হোস্টেলে গেলেই তো অনেক টাকা লাগব।’
তবে প্রতিষ্ঠানের অধ্যক্ষ মমতা বৈরাগী বলেন, কোনো দাতা সংস্থার পক্ষ থেকে সহায়তা মিলছে না। এ অবস্থায় যে অভিভাবকদের আর্থিকভাবে সামর্থ্য আছে, তাঁদের কাছ থেকেই টাকা নেওয়া হচ্ছে।
একাধিক অভিভাবকই জানান, তাঁদের এ ধরনের কথা কখনোই বলা হয়নি। বরং বিভিন্ন খাতে টাকা দেওয়ার জন্য সবাইকেই তাগাদা দেওয়া হয়েছে।
খরচ: প্রতিষ্ঠানের দেওয়া লিখিত তথ্য অনুযায়ী, প্রথম থেকে দশম শ্রেণী পর্যন্ত ভর্তি ফি ৫০০ টাকা, সেশন ফি দুই হাজার ৫০০ টাকা, বইয়ের জন্য তৃতীয় শ্রেণী পর্যন্ত দুই হাজার ৫০০ টাকা, চতুর্থ থেকে সপ্তম শ্রেণী পর্যন্ত চার হাজার টাকা এবং অষ্টম থেকে দশম শ্রেণী পর্যন্ত ছয় হাজার টাকা লাগবে। তবে অভিভাবকদের কাছে চাওয়া হয়েছে এর চেয়ে অনেক বেশি টাকা।
এ ছাড়া ব্যাগ, পোশাক, লেখার ফ্রেম, জুতা, কলমসহ অন্যান্য জিনিসের জন্য লাগবে দুই হাজার টাকা। মাসিক ফি তৃতীয় শ্রেণী পর্যন্ত ৪০০ টাকা এবং দশম শ্রেণী পর্যন্ত সাড়ে ৪০০ ও ৫০০ টাকা দিতে হবে। প্রতিষ্ঠান থেকে আইডিয়াল স্কুলে যাওয়ার ভ্যান ভাড়া আগে দিতে হতো ৩০০ টাকা, এখন দিতে হবে ৫০০ টাকা। এ ছাড়া হোস্টেলের সিট ভাড়া, খাবার, চিকিৎসাভাতা, দৈনিক খরচসহ নার্সারি থেকে তৃতীয় শ্রেণী পর্যন্ত শিক্ষার্থীদের বছরে খরচ হবে ২২ হাজার ৭৫০ টাকা এবং দশম শ্রেণী পর্যন্ত লাগবে ২৪ হাজার ১৫০ টাকা।
জাতীয় প্রতিবন্ধী ফোরামে কাজ করেন নাজমা আরা বেগম। তিনি ব্যাপ্টিস্ট মিশন স্কুলে পড়াশোনা করেছেন। ১৯৮৬ সালে স্কুলে প্রথম শ্রেণীতে ভর্তি হওয়া নাজমা প্রথম আলোকে বলেন, ‘চট্টগ্রাম থেকে বাবা আমাকে হোস্টেলে দিয়ে যেতেন। সে জন্য প্রতিষ্ঠান থেকে বাবাকে যাতায়াত ভাতাও দিয়ে দেওয়া হতো। খাবার, তেল, সাবানসহ অন্যান্য খাতেও খরচ ছিল না। তারপর আস্তে আস্তে কিছু টাকা নেওয়া হলেও একবারে হুট করে কখনোই এত বেশি টাকা চাওয়া হয়নি।’
স্কুল ব্যবস্থাপনা কমিটির চেয়ারম্যান ক্রিস্টোফার অধিকারী বলেন, ভবিষ্যতে আর্থিক সহায়তা পাওয়া গেলে আবার মেয়েদের বিনা মূল্যে পড়ানো হবে।
তবে প্রতিষ্ঠানের অধ্যক্ষ মমতা বৈরাগী বলেন, ‘তা কীভাবে সম্ভব? একবার টাকা নেওয়া শুরু করে পরে আর তা বাতিল করা যাবে না।’
সূত্র - প্রথম আলো

