অদৃশ্য শত্রুর সঙ্গে লড়াই করে বাঁচতে হবে ওদের। যুঝতে হবে ক্যানসারের মতো মরণব্যাধির সঙ্গে। বাড়িতেই হোক আর স্কুলে, খেলা যাবে না খোলা আকাশের নিচে! বড়রাই শিশুদের বলবেন, ‘যাবে না আলো-বাতাসে!’ আর তিন বছরের শিশুও জানতে চাইবে, ‘এটাতে কি তেজস্ক্রিয়তা আছে?’ নির্মম এই নিয়তি সে দেশের, যারা পরপর দুইবার ইতিহাসের ভয়ংকরতম আণবিক বোমা হামলার শিকার হয়েছে; এ জীবন জাপানের ফুকুশিমার শিশুদের।
জাপানের হিরোশিমা ও নাগাসাকিতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আণবিক বোমা ফেলেছিল প্রায় সাত দশক আগে। আর জাপানের ফুকুশিমাতেই গত সিকি শতাব্দীর মধ্যে পৃথিবীর সবচেয়ে ভয়াবহ পারমাণবিক দুর্ঘটনা ঘটে ২০১১ সালের ১১ মার্চ। সুনামি ও ভূমিকম্পের যুগপত্ আঘাতে ফুকুশিমার দাইচি পারমাণবিক প্রকল্পের ছয়টি পরমাণু চুল্লির তিনটি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে তেজস্ক্রিয়তা ছড়িয়ে পড়তে শুরু করে। ক্ষয়ক্ষতি কমিয়ে আনা এবং তেজস্ক্রিয়তা ছড়িয়ে পড়া রোধে জাপানের সর্বাত্মক প্রচেষ্টার পরও এখনো মারাত্মক হুমকি হয়ে রয়েছে ফুকুশিমা। পরিবেশগত বিপর্যয় এবং অর্থনৈতিক ক্ষতির বাইরেও জনজীবনে এই দুর্ঘটনার প্রভার বিস্তর। বিশেষ করে ফুকুশিমার শিশুরা বেড়ে উঠছে মরণব্যাধির ঝুঁকি নিয়ে এক মূর্তিমান আতঙ্কের দুনিয়ায়।
ঘরবন্দী শিশু, উদ্বেগের জনপদ
ফুকুশিমা পারমাণবিক প্রকল্পের পার্শ্ববর্তী করিয়ামার শিশুরা জানে না খোলা আকাশের নিচে খেলতে কেমন লাগে, তেজস্ক্রিয়তার আতঙ্কে ওদের ছোট্ট জীবনের বেশির ভাগটাই কেটেছে ঘরবন্দী হয়েই। প্রশাসন বাইরে চলাফেরার ওপর নিষেধাজ্ঞা তুলে নিয়ে জীবনযাপন স্বাভাবিক করার প্রয়াস নিয়েছে। আশপাশের অনেক স্কুলও ধীরে ধীরে নিয়ম-কানুন শিথিল করছে। কিন্তু অভিভাবকদের আতঙ্ক কাটছে না।
আতঙ্ক কাটার কথাও না। কেননা ইতোমধ্যেই পারমাণবিক তেজস্ক্রিয়তার প্রভাব অত্যন্ত স্পষ্টভাবেই সামনে আসতে শুরু করেছে। ফুকুশিমার শিশুরা ভয়াবহ দুর্বলতার শিকার, তাদের শরীরে বল নেই, একটা বাইসাইকেল চালানোর শক্তিও নেই গায়ে। ওদের অনেকেই কোনোকিছু গুছিয়ে করতে পারে না, খুব অল্পতেই চটে যায়, অস্থিরতায় ভোগে। অভিভাবক, প্রশাসনিক কর্মকর্তা আর স্কুলের শিক্ষকেরাই এ কথা জানিয়েছেন।
করিয়ামার এম্পোরিয়াম কিন্ডারগার্টেনের পরিচালক মিত্সুহিরো হিরাগুরি বলেন, ‘অনেক শিশু আছে যারা খুবই ভীত-সন্ত্রস্ত থাকে। কিন্তু অনেক শিশুই বাইরে খেলাধুলার জন্য মরিয়া হয়ে থাকে।’ হিরাগুরি বলেন, ‘ওরা বলে, “আমরা বালিতে খেলব, কাদা দিয়ে বল বানাব”। কিন্তু আমরা ওদের বলতে বাধ্য হই—না, আমরা দুঃখিত। তোমরা বরং ঘরের মধ্যে রাখা বালির বাক্সেই খেলো।’
একসময় ধান, পিচফল আর গরুর মাংসের জন্য বিখ্যাত কৃষিপ্রধান ফুকুশিমার বিস্তীর্ণ অঞ্চলে তেজস্ক্রিয়তা ছড়িয়ে পড়ে স্থানীয় জনজীবন এবং সংস্কৃতিকে আমূল পাল্টে দিয়েছে। দাইচি পারমাণবিক প্রকল্পের ৩০ কিলোমিটার পরিধির অঞ্চলকে আগেই ‘প্রবেশ নিষিদ্ধ এলাকা’ ঘোষণা করা হয়েছে। ঘরবাড়ি থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে এক লাখ ৬০ হাজার মানুষকে। এই জনগোষ্ঠীর অনেকেই প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে এখানেই বাস করছিলেন। আর নিষিদ্ধ এলাকার আশপাশের বিভিন্ন এলাকায় ২০১১ সালে দুর্ঘটনার পর থেকেই রাস্তাঘাট, উদ্যান, ময়দান, স্কুল-কলেজসহ জনসমাগমের স্থানগুলোকে তেজস্ক্রিয়তামুক্ত করতে চেষ্টা চালানো হয়েছে।ফুকুশিমার পার্শ্ববর্তী নাইহোনমাতসুর একটি ক্লিনিকে পাঁচ বছর বয়সী একটি মেয়ের থাইরয়েড পরীক্ষা করছেন চিকিত্সক। ছবি: রয়টার্স
‘বাতাস ছুঁয়ো না’
পারমাণবিক দুর্ঘটনার পর করিয়ামা নগর কর্তৃপক্ষ নাগরিকদের নিয়ম করে দেয় দুই বছর বয়স পর্যন্ত শিশুদের দিনে ১৫ মিনিটের বেশি বাইরের খোলা বাতাসে না রাখতে। আর তিন থেকে পাঁচ বছর বয়সী শিশুদের জন্য এই সময় দিনে ৩০ মিনিট পর্যন্ত। গত বছরের অক্টোবরে এই নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া হয়েছে। কিন্তু অভিভাবকদের শঙ্কার সঙ্গে সহমত পোষণ করে কিন্ডারগার্টেন এবং নার্সারি স্কুলগুলো এখনো এই বিধি-নিষেধ মেনে চলছে।
করিয়ামার একটি কিন্ডারগার্টেনে খেলার ঘরে সন্তানকে রেখে বিদায় নেওয়ার সময় উদ্বিগ্ন এক মা তাঁর ছেলেকে বলছিলেন, ‘বাইরের বাতাস এড়িয়ে চলার চেষ্টা করো।’
শিশুর মুখেও ‘তেজস্ক্রিয়তা’
১৯৮৬ সালে রাশিয়ার চেরনোবিল পারমাণবিক দুর্ঘটনার পর শিশুদের মধ্যে থাইরয়েড ক্যানসার দেখা দিলেও গত বছরের মে মাসে জাতিসংঘ বলেছে, ফুকুশিমায় ক্যানসারের হার বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা নেই।
করিয়ামার এম্পোরিয়াম কিন্ডারগার্টেনের পরিচালক হিরাগুরি জানিয়েছেন, বিদ্যায়তনটির আশপাশে তেজস্ক্রিয়তার মাত্রা এখন প্রতি ঘণ্টায় ‘শূন্য দশমিক ১৪ মাইক্রোসিয়েভার্টস’। দুর্ঘটনার পরপর এই হার ছিল প্রায় ‘৩ দশমিক ১ থেকে ৩ দশমিক ৭ মাইক্রোসিয়েভার্টস’। জাপানে সরকারিভাবে নির্ধারিত তেজস্ক্রিয়তার নিরাপদ মাত্রা ‘বছরে ১,০০০ মাইক্রোসিয়েভার্টস’ থেকে কম। কিন্তু এই তেজস্ক্রিয়তা যেকোনো সময় কমতে-বাড়তে পারে।
এই পরিস্থিতিতে কোনোভাবেই ভীতি থেকে মুক্তি পাচ্ছেন না অভিভাবকেরা। তিন সন্তানের জননী ৩৪ বছর বয়সী আয়ুমি কানেতা বলছিলেন, ‘আমি বাইরে যাওয়া থেকে বিরত থাকার চেষ্টা করি। পারতপক্ষে জানালা খুলি না। আর খাবারদাবার কিনে আনি ফুকুশিমার বাইরে থেকে। এটাই আমাদের প্রতিদিনের জীবন।’
এ জীবনেই বেড়ে উঠছে ফুকুশিমার শিশুরা। অভিভাবকদের কাছ থেকে শুনে শুনে এখন তিন বছরের শিশুর মুখেও নিত্যদিন ফেরে ‘তেজস্ক্রিয়তা’ শব্দটি। কোনোকিছু খাওয়ার আগে ওরা জিজ্ঞেস করে, ‘এটাতে কি তেজস্ক্রিয়তা আছে, এটা কি খেতে পারব।’
করিয়ামার এম্পোরিয়াম কিন্ডারগার্টেনের খেলার ঘরে বালির বাক্সে খেলছে শিশুরা। ছবি: রয়টার্সচাপ বাড়ছে শিশুদের
খোলা আলো-বাতাসে যেতে না পারায়, খেলাধুলা করতে না পারায় ফুকুশিমার শিশুদের ওপর ব্যাপক মনো-দৈহিক প্রভাব পড়ছে। করিয়ামা নগর সরকারের কর্মকর্তা তোশিয়াকি ইয়াবে জানান, ‘দুর্ঘটনার আগের সময়ের সঙ্গে তুলনা করলে শিশুদের শারীরিক সক্ষমতা অনেক কমেছে—দৌড়ানো, বল নিক্ষেপ করা, কোনোকিছু আঁকড়ে ধরার মতো সাধারণ শারীরিক পরীক্ষাতেই এটা ধরা পড়ছে।’
ফুকুশিমা প্রিফেকচার বোর্ড অব এডুকেশন এক জরিপে দেখতে পেয়েছে, প্রতিটি বয়স-গ্রুপেই এখানকার শিশুদের গড় ওজন জাপানের জাতীয় গড়ের চেয়ে বেড়ে গেছে। এদিকে, স্কুলের কর্মকর্তা হিরাগুরি জানিয়েছেন, অনেক শিশুই যথাযথভাবে সাড়া দিতে পারে না। ওরা অসতর্ক হয়ে থাকে। ওরা কোনোকিছুতেই উদ্দীপনা পায় না।
করিয়ামার জনসমাগমস্থল এবং উদ্যানগুলোর মাটি একাধিকবার পাল্টে ফেলা হয়েছে, খেলাধুলার সামগ্রী ও রাস্তাঘাটের নানা ব্যবহার্য স্থাপনা পাল্টানোর কাজও শেষ পর্যায়ে। কিন্তু করিয়ামার নগর কর্মকর্তা তোশিয়াকি ইয়াবে বলেন, ‘আগে অভিভাবকেরা অনেক বেশি উদ্বিগ্ন ছিলেন তেজস্ক্রিয়তা নিয়ে। এখন তাঁরা উদ্বিগ্ন তাঁদের শিশুরা বাইরে বেরোতে চায় না বলে।’
স্কুল কর্মকর্তা মিত্সুহিরো হিরাগুরি বলছিলেন, ‘মাঝেমধ্যেই আমি ভাবি ফুকুশিমায় শিশুদের রাখা আদৌ ঠিক কি না। কিন্তু অনেকের পক্ষেই তো এখান থেকে চলে যাওয়া সম্ভব না। আমি খুব দৃঢ়ভাবেই বিশ্বাস করি, এ শিশুদের জন্য আমার পক্ষে সম্ভব সবকিছুই করা উচিত।’
সূত্র - প্রথম আলো

