পাবলিক ড্রাগস টেস্টিং ল্যাবরেটরিতে ২০১০ সালে দেশে উৎপাদিত পাঁচ হাজার ওষুধের নমুনা সংগ্রহ করে তা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হয়। এতে তারা ৩০০টি ওষুধ মানহীন ও ভেজাল বলে শনাক্ত করে। ২০১২ সালে একই প্রতিষ্ঠান আড়াই হাজার নমুনা পরীক্ষা করে শতকরা ১২ ভাগ ওষুধই মানহীন ও ভেজাল বলে মত দেয়।
তবে আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাংলাদেশে নকল ও নিম্নমানের ওষুধের সংখ্যা আরো বেশি। যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব উইসকনসিনের কয়েকজন গবেষক উন্নয়নশীল দেশের ওষুধের ওপর গবেষণা চালান। তারা বাংলাদেশের প্রায় ৫০০ ওষুধের নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেন। এতে ২৭ শতাংশ ওষুধই মানহীন ও ভেজাল বলে চিহ্নিত হয়।
সরকারি ও বেসরকারি সূত্র বলছে, দেশে ওষুধ শিল্পের আকার একদিকে যেমন বড় হচ্ছে, অন্যদিকে সমান্তরালভাবে বড় হচ্ছে নকল ও নিম্নমানের ওষুধের বাজার। বর্তমানে ওষুধ শিল্পের আকার ১০ হাজার কোটি টাকার। এর মধ্যে নকল ও নিম্নমানের ওষুধের দখলে রয়েছে দেড়-দুই হাজার কোটি টাকার বাজার। বিভিন্ন সূত্র ও গবেষণায় এমন তথ্যই উঠে এসেছে।
নিম্নমানের ওষুধ প্রস্তুত ঠেকাতে ২০০৯ সালে সরকারের পক্ষ থেকে দেশের চালু ১৯৩টি ওষুধ কারখানা পরিদর্শন করা হয়। পরিদর্শক ও গবেষকরা কারখানাগুলোকে ‘এ’ থেকে ‘এফ’ গ্রেডে ভাগ করেন। এতে যেসব কোম্পানি ‘এ’ থেকে ‘সি’ গ্রেডে রয়েছে, তাদের ওষুধ ভালো মানের বলে শনাক্ত হয়। আর ‘ডি’ থেকে ‘এফ’ গ্রেডের কোম্পানির ওষুধ মানহীন। ওই পরিদর্শনের ভিত্তিতে স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সংসদীয় কমিটি মানহীন ৬২টি ওষুধ কোম্পানির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে সুপারিশ পাঠায়। তবে এখন পর্যন্ত বেশির ভাগ কোম্পানির বিরুদ্ধে তেমন কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয়নি।
এ প্রসঙ্গে ওষুধ প্রশাসন অধিদফতরের মহাপরিচালক মেজর জেনারেল জাহাঙ্গীর হোসেন মল্লিক বণিক বার্তাকে বলেন, সংসদীয় কমিটি যেসব কোম্পানির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে সুপারিশ করেছিল, সে বিষয়ে মন্ত্রণালয় থেকে কোনো সিদ্ধান্ত আসেনি। মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা পাওয়া গেলে আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে।
নকল, ভেজাল ও মানহীন ওষুধের পরিমাণ বাড়ার বিষয়টি স্বীকার করে ওষুধ প্রশাসন অধিদফতরের মহাপরিচালক জানান, মানহীন ওষুধ তৈরি এবং বিক্রির সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে প্রায়ই তারা অভিযান চালাচ্ছেন। আবারো অভিযান জোরদার করার প্রক্রিয়া চলছে।
ওষুধ শিল্প সমিতির মহাসচিব ইনসেপ্টা ফার্মাসিউটিক্যালসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আবদুল মোক্তাদির এ প্রসঙ্গে বলেন, কিছুসংখ্যক প্রতিষ্ঠান মানহীন ও ভেজাল ওষুধ তৈরি করতে পারে। তবে এর সংখ্যা হাতেগোনা। সংসদীয় কমিটি যেসব কোম্পানির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার সুপারিশ করেছিল, তার অধিকাংশই এখন উৎপাদনে নেই।
একই দাবি বাংলাদেশ ফার্মেসি কাউন্সিলের সভাপতি ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ওষুধবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক আ ব ম ফারুকের। তিনি বলেন, দেশের ৩-৪ শতাংশ ওষুধ ভেজাল বা মানহীন।
তবে ওষুধ শিল্প সংশ্লিষ্টরা যতই দাবি করুক, রাজধানীসহ দেশের আনাচ-কানাচ মানহীন ও ভেজাল ওষুধে ছেয়ে যাচ্ছে। ভেজালবিরোধী ভ্রাম্যমাণ আদালত, ওষুধ প্রশাসন অধিদফতর, র্যাব, পুলিশ ও গোয়েন্দা পুলিশ বিভিন্ন সময় অভিযান চালিয়েও বিপুল পরিমাণ নকল ভেজাল ও মানহীন ওষুধ জব্দ করেছে।
ফার্মাসিস্টরা জানান, বাজারে যেসব কোম্পানির ওষুধ বেশি চলে, সাধারণত সেগুলোই নকল হচ্ছে। সরকারি পর্যায়ে দেশে মাত্র দুটি টেস্টিং ল্যাবরেটরি রয়েছে; যা প্রয়োজনের তুলনায় নগন্য।
বাংলাদেশ কেমিস্ট অ্যান্ড ড্রাগিস্ট সমিতির উপসচিব এসএম মনির হোসেন এ বিষয়ে বলেন, দেশের গুটিকয় কোম্পানি ভালো মানের ওষুধ তৈরি করছে। অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানই মানহীন ওষুধ তৈরির দিকে ঝুঁকে আছে। দেশে কী মানের ওষুধ তৈরি হচ্ছে, তার কোনো হিসাব ওষুধ প্রশাসনের কাছে নেই। কারণ সরকারের ওষুধ পরীক্ষা-নিরীক্ষার ল্যাবরেটরি পুরনো আমলের।
অনুসন্ধানে পাওয়া গেছে, বিশ্বের কোথাও আর্সেনিকের ওষুধ আবিষ্কার হয়নি। অথচ রাজধানীর পুরান ঢাকার মিটফোর্ডে আর্সেনিক নিরাময়ের ওষুধ পাওয়া যায়। এ নিয়ে অনেকের মধ্যেই কৌতূহল দেখা গেছে। পরে ওষুধ প্রশাসন অধিদফতর অভিযান চালিয়ে কয়েকটি নমুনাও সংগ্রহ করে। শুধু দুরারোগ্য ব্যাধি নয়, বাজারে অহরহ পাওয়া যাচ্ছে মানহীন ইনসুলিনও।
গত কয়েক বছরে নকল ও ভেজাল ওষুধ তৈরি এবং বিক্রির সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে কয়েক দফা অভিযান চালায় র্যাব ও ওষুধ প্রশাসন অধিদফতর। তবে এসব পণ্যের জোগান ও বিক্রিতে অভিযানের তেমন কোনো প্রভাব পড়েনি।
ওষুধের মান নিয়ন্ত্রের জন্য যে সংস্থাটি দায়িত্বপ্রাপ্ত, তাদের সক্ষমতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। ওষুধ প্রশাসন অধিদফতরের হিসাব অনুযায়ী, দেশব্যাপী তাদের অনুমোদিত পদ রয়েছে ৩৭০টি। এর বিপরীতে কর্মরত মাত্র ১৪৩ জন। একজন মহাপরিচালক, তিনজন পরিচালক, চারজন উপপরিচালক, ১১ জন সহকারী পরিচালক, একজন সহকারী লাইসেন্স অফিসার, ২১ জন ড্রাগ সুপার ও চারজন পরিদর্শক মিলে মোট ৪৮ জন কর্মকর্তা এবং ৯৫ জন কর্মচারী রয়েছেন অধিদফরে। ২১ জন ড্রাগ সুপার ও চারজন পরিদর্শক নকল-ভেজাল ওষুধ শনাক্ত ও নমুনা সংগ্রহের কাজে নিয়োজিত। মান নিয়ন্ত্রণে ঢাকা ও চট্টগ্রামে দুটি টেস্টিং ল্যাবরেটরি রয়েছে। মান পরীক্ষক মাত্র দুজন।
ওষুধ প্রশাসন অধিদফতরের মহাপরিচালক জাহাঙ্গীর হোসেন মল্লিক তাদের সামর্থ্য বাড়ানোর নানা উদ্যোগ চালু আছে বলে উল্লেখ করেন। তিনি জানান, ভেজাল ও মানহীন ওষুধের নিয়ন্ত্রণে গত কয়েক বছরে ১৩টি কোম্পানির লাইসেন্স বাতিল করা হয়েছে।
জানা গেছে, বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার গাইডলাইন অনুসরণ না করে ওষুধ উৎপাদন, অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনার কারণে সাতটি কোম্পানির লাইসেন্স স্থায়ীভাবে বাতিল করা হয়। দুটির উৎপাদন ও বাজারজাত স্থগিত এবং চারটির লাইসেন্স সাময়িকভাবে বাতিল করা হয়।
সূত্র -newslivebd.com

