বাংলাদেশের ইতিহাসে বৃহত্তম টিকাদান কর্মসূচির আয়োজন হতে যাচ্ছে ২৫ জানুয়ারি থেকে ১৩ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত। এ কর্মসূচির আওতায় নয় মাস থেকে ১৫ বছর বয়স পর্যন্ত দেশের পাঁচ কোটি ২০ লাখ শিশুকে হাম ও রুবেলা টিকা দেওয়া হবে।
গতকাল সোমবার বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের মিলন হলে এক সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য দিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। এর আগে এত বেশিসংখ্যক শিশুকে একযোগে একটি কর্মসূচির আওতায় টিকা দেওয়া হয়নি। এ ছাড়া এবারই প্রথম ১৫ বছর বয়স পর্যন্ত ছেলে ও মেয়েশিশু টিকা পাবে।
এ কর্মসূচি বাস্তবায়নে খরচ হচ্ছে ৫১২ কোটি ৭০ লাখ টাকা।
২০০৬ সালে ক্যাচ আপ ক্যাম্পেইনের আওতায় নয় মাস থেকে ১০ বছর বয়স পর্যন্ত সাড়ে তিন কোটি শিশুকে হামের টিকা দেওয়া হয়। ২০১০ সালে টিকা দেওয়া হয়েছিল এক কোটি ৮০ লাখ শিশুকে।
হাম একটি ভাইরাসজনিত সংক্রামক রোগ। যেকোনো বয়সে হাম হতে পারে। তবে শিশুদের মধ্যে এর প্রকোপ, জটিলতা ও মৃত্যু বেশি। জটিলতাগুলোর মধ্যে নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া, অপুষ্টি, এনকেফালাইটিস, অন্ধত্ব, বধিরতা অন্যতম। অন্যদিকে রুবেলাও ভাইরাসজনিত রোগ। গর্ভধারণের তিন মাসের সময় রুবেলা ভাইরাস আক্রমণ করলে ৯০ শতাংশ ক্ষেত্রে মায়ের থেকে গর্ভের শিশু আক্রান্ত হতে পারে। সে ক্ষেত্রে গর্ভপাত; এমনকি গর্ভের শিশুর মৃত্যুও হতে পারে। শিশুর হূদ্যন্ত্রে ছিদ্র হতে পারে, শিশু অন্ধও হতে পারে। বাংলাদেশে প্রতি ১০ লাখে দুই হাজার ৯৭৯ জন রুবেলায় আক্রান্ত হয়। রুবেলা নিয়ে কোনো শিশু যাতে জন্ম না নেয়, সে জন্য গত বছরের ২৬ সেপ্টেম্বর থেকে সরকার বিনা মূল্যে রুবেলা টিকা দিতে শুরু করে।
২০১৬ সালের মধ্যে হাম ও রুবেলা টিকার হার জাতীয় পর্যায়ে ৯৫ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্যে কাজ করছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর।
বাংলাদেশ শিশু চিকিৎসক পরিষদের সভাপতি ও ঢাকা শিশু হাসপাতালের অধ্যাপক মো. রুহুল আমিন বিশাল এই কর্মযজ্ঞ বাস্তবায়নে সবার অংশগ্রহণ কামনা করেছেন। তিনি বলেন, ‘এই টিকাটি খুবই নিরাপদ। পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া নেই বললেই চলে। অন্যান্য টিকা দিলে যেমন টিকা দেওয়ার জায়গাটি ফুলে যায় বা হালকা জ্বর আসে। এই টিকাটির ক্ষেত্রেও কারও কারও এমন হতে পারে। এতে ঘাবড়ানোর কোনো কারণ নেই।’
বাংলাদেশ শিশু চিকিৎসক পরিষদের মহাসচিব ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের সহ-উপাচার্য অধ্যাপক মোহাম্মদ সহিদুল্লা সমাজের বিত্তবান শ্রেণীকেও এই কর্মসূচিতে যুক্ত হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বলেন, সরকারি ব্যবস্থাপনায় যে টিকা দেওয়া হয়, সেটি সবচেয়ে মানসম্পন্ন।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের প্রাথমিক স্বাস্থ্য পরিচর্যা বিভাগের লাইন ডিরেক্টর আবু জাফর মো. মুসা বলেন, যেসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ১৫ বছরের কম বয়সী শিশুরা লেখাপড়া করে, সেসব প্রতিষ্ঠানই টিকাদান কেন্দ্র হিসেবে বিবেচিত হবে। যেসব শিশু স্কুলে যায় না কিংবা স্কুলে টিকা নেয়নি, তারা দ্বিতীয় ও তৃতীয় সপ্তাহে দেশে যে এক লাখ ২০ হাজার টিকাদান কেন্দ্র আছে, সেখান থেকে টিকা নিতে পারবে। এ ছাড়া পথশিশু, কর্মজীবী শিশু, কর্মজীবী মায়ের শিশু বা শহর এলাকার অন্যান্য শিশু যারা টিকাকেন্দ্রে না-ও যেতে পারে, তাদের জন্য রেলস্টেশন, বাসস্টেশন, লঞ্চ টার্মিনাল, পার্ক, ফুটপাত ইত্যাদি এলাকায় বিশেষ দল গঠন করে বা অস্থায়ী টিকাদান কেন্দ্র চালু করা হবে।
মো. মুসা আরও জানান, টিকার কোনো পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া নেই। তার পরও প্রতিটি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে জরুরি মেডিকেল স্কোয়াড প্রস্তুত রাখা হয়েছে। তবে গুরুতর অসুস্থ শিশুকে এই টিকা দেওয়ার আগে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়ার অনুরোধ জানানো হয়েছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা বলছেন, বাংলাদেশসহ বেশ কিছু দেশ রুবেলা টিকা চালুর বিষয়ে গ্লোবাল অ্যালায়েন্স ফর ভ্যাক্সিনেশন ইমুনাইজেশন (গ্যাভি) ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সহযোগিতা চেয়েছিল। সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচিতে বাংলাদেশ সারা বিশ্বের জন্য রোল মডেল হওয়ায় গ্যাভি, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, ইউনিসেফ ও রোটারি ইন্টারন্যাশনাল এবং লায়ন্স ইন্টারন্যাশনাল হাম-রুবেলা কর্মসূচি বাস্তবায়নে বাংলাদেশকেই এই সহযোগিতা দিচ্ছে।
সূত্র - প্রথম আলো

