সপ্তাহ না গড়াতেই আবারও ঘন কুয়াশায় ঢাকা পড়ল দেশ। এবার কুয়াশার সঙ্গে যোগ হয়েছে গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি। তবে এই বৃষ্টির উৎস মেঘ নয়, ভারী কুয়াশা। জলীয়বাষ্প জমে ভারী হয়ে বৃষ্টির মতোই ঝরেছে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে।
গতকাল বুধবার ঘন কুয়াশা আর ঠান্ডা বাতাসে জনজীবনে নেমে আসে শৈত্যপ্রবাহের মতো অনুভূতি। ঘন কুয়াশার কারণে সড়ক, নদী ও আকাশপথে যান চলাচলে বিঘ্ন ঘটেছে। শীতের কাঁপুনিতে দরিদ্র মানুষের ভোগান্তির সীমা নেই। রাস্তায় বা বস্তিতে থাকেন এমন মানুষের অবস্থা সবচেয়ে খারাপ। বাড়ছে শীতজনিত কারণে শিশুদের রোগ।
তাপমাত্রার বিবেচনায় দেশের কোথাও শৈত্যপ্রবাহ বয়ে যাচ্ছে না। গতকাল দেশের সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ছিল চুয়াডাঙ্গায় ১০ দশমিক ৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস। আর রাজধানীর সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ছিল ১৪ ডিগ্রি।
আবহাওয়া অধিদপ্তরের আবহাওয়াবিদ মো. রাশেদুজ্জামান প্রথম আলোকে বলেন, ভারতের দিল্লি থেকে বিহার, পশ্চিমবঙ্গ ও পূর্বাঞ্চলের সাত রাজ্য হয়ে ঘন কুয়াশার আবরণটি বাংলাদেশ পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছে। বাতাসে জলীয়বাষ্প জমে ভারী হয়ে তা বৃষ্টির মতো ঝরছে। এই পরিস্থিতি আরও দু-এক দিন অব্যাহত থাকতে পারে। তিনি জানান, সাধারণত ১০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে তাপমাত্রা থাকলে শৈত্যপ্রবাহ বলা হয়। কিন্তু গতকাল দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ঘন কুয়াশার কারণে শৈত্যপ্রবাহের অনুভূতি ছিল।
ভারতের আবহাওয়া দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, কুয়াশার কারণে ভারতের বেশির ভাগ বিমানবন্দরে উড্ডয়ন কার্যক্রম চার থেকে পাঁচ ঘণ্টা বন্ধ থাকছে। গত পাঁচ বছরের মধ্যে এবার সর্বোচ্চ পরিমাণে কুয়াশা পড়তে দেখা গেছে।
১১ ঘণ্টা ফেরি চলাচল বন্ধ: ঘন কুয়াশায় কাওড়াকান্দি-মাওয়া নৌপথে রাত থেকে ১১ ঘণ্টা বন্ধ থাকার পর গতকাল বেলা ১১টায় ফেরি চলাচল স্বাভাবিক হয়। দীর্ঘ সময় ফেরি চলাচল বন্ধ থাকায় কাওড়াকান্দি ঘাটে শত শত পণ্যবাহী ট্রাক আটকা পড়েছে।
বিআইডব্লিউটিসির কাওড়াকান্দি ঘাট সূত্র জানায়, কুয়াশা বেড়ে যাওয়ায় মঙ্গলবার রাত ১২টা থেকে গতকাল বেলা ১১টা পর্যন্ত ফেরি চলাচল বন্ধ রাখে কর্তৃপক্ষ। রাতে মাঝপদ্মায় দিক নির্ণয় করতে না পেরে পাঁচটি ফেরি নদীর বিভিন্ন স্থানে নোঙর করে রাখা ছিল। এতে দুর্ভোগে পড়েন শত শত যাত্রী। কুয়াশার কারণে লঞ্চ ও স্পিডবোট চলাচলও ব্যাহত হয়।
তীব্র কুয়াশার কারণে রাত একটার দিকে দৌলতদিয়া-পাটুরিয়া নৌপথে ফেরি চলাচল বন্ধ করে দেয় কর্তৃপক্ষ। এর আগে দৌলতদিয়া ঘাট থেকে দুটি এবং পাটুরিয়া ঘাট থেকে তিনটি বড় ফেরি ছেড়ে গেলেও মাঝনদীতে কুয়াশার কারণে আটকা পড়ে। ফেরি না ছাড়ায় দুই ঘাটে আট শতাধিক যানবাহন আটকা পড়ে। কুয়াশা কমতে শুরু করলে সকাল সাতটার দিকে দুই ঘাট থেকে ফেরি ছাড়া শুরু হয়।
দৌলতদিয়া ঘাটে গতকাল দুপুর ১২টার দিকেও শতাধিক যাত্রীবাহী বাস আটকা ছিল। যশোর থেকে ছেড়ে আসা ট্রাকের চালক রিমন সরদার জানান, তিনি আগের দিন সন্ধ্যায় ঘাটে পৌঁছান। আজ (বুধবার) হয়তো নদী পার হওয়া সম্ভব নয়।
বিআইডব্লিউটিসির আরিচা কার্যালয়ের ব্যবস্থাপক (বাণিজ্য) মহিউদ্দিন রাসেল জানান, যাত্রীদের দুর্ভোগের বিষয় মাথায় রেখে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে আটকে পড়া বাসগুলোকে আগে পার করা হচ্ছে।
বিমান অবতরণে বিঘ্ন: ঘন কুয়াশার কারণে ঢাকায় শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে গত মঙ্গলবার রাত দুইটা থেকে সকাল সাতটা পর্যন্ত কমপক্ষে তিনটি উড়োজাহাজ অবতরণে এক থেকে তিন ঘণ্টা বিলম্ব হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে।
আবহাওয়া দপ্তরের শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র কুয়াশার মাত্রা পরিমাপ করেছে। তাদের হিসাবে, গত মঙ্গলবার রাত দুইটায় সবচেয়ে বেশি কুয়াশা ছিল। এ সময় বিমান ওঠানামার ক্ষেত্রে ২০০ মিটারের বেশি দূরত্বের বস্তুও দৃষ্টিগোচর হয়নি। ভোরের দিকে দৃষ্টির এই সীমা ৫০০ মিটার পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছিল। এরপর তা সর্বোচ্চ এক হাজার ৫০০ মিটার পর্যন্ত দেখা গেছে।
কুয়াশা বৃষ্টি!: রাজশাহীতে ঘড়ির কাঁটায় দুপুর ১২টা। সূর্যের দেখা নেই। বৃষ্টির মতো ঝরছে কুয়াশা। গতকাল সারা দিন রাজশাহীর বাতাস এ রকমই শিশিরভেজা ছিল। জরুরি প্রয়োজন ছাড়া মানুষ বাড়ির বাইরে খুব একটা বের হয়নি।
‘কুয়াশা বৃষ্টি’র কারণে জেলার বাঘা উপজেলার পরীগাছা এলাকায় বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের ছাতা মাথায় যেতে দেখা গেছে। সাইকেলে চেপে বেসরকারি সংস্থার নারী কর্মীরাও ছাতা মাথায় যাচ্ছিলেন। ওই সংস্থার একজন নারী কর্মী জানান, খালি মাথায় গেলে চোখ-মুখ সব ভিজে যায়। সাইকেল চালানো যায় না। তাই বাধ্য হয়ে ছাতা মাথায় ধীরে ধীরে যাচ্ছেন।
রাজশাহী আবহাওয়া অফিস সূত্র জানায়, গতকাল রাজশাহীতে সর্বনিম্ন ১২ দশমিক ৪ ডিগ্রি এবং সর্বোচ্চ ১৪ দশমিক ৭ ডিগ্রি তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে।
নাটোরেও দুই দিন ধরে কুয়াশা বৃষ্টি হয়েছে। প্রচণ্ড শীতে শহরে ও মাঠেঘাটে লোকজনের উপস্থিতি ছিল কম।
নাটোরের সিভিল সার্জন রফিকুল ইসলাম জানান, শীতজনিত রোগ বেড়ে যাওয়ায় একটি মেডিকেল টিম গঠন করা হয়েছে। কমিটির সদস্যরা জেলার সর্বত্র নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছেন। ডায়রিয়া ও নিউমনিয়ায় আক্রান্ত রোগীরা এলে জরুরি ভিত্তিতে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।
সদর উপজেলার কৃষি কর্মকর্তা মাজদার হোসেন জানান, জেলার সিংড়া, গুরুদাসপুর ও সদর উপজেলায় বর্তমানে ধানের বীজতলা রয়েছে। শীত ও কুয়াশায় এগুলোর ক্ষতি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
শীতে বিপর্যস্ত মানুষ: ঘন কুয়াশায় গতকাল ভোলায় সূর্যের দেখা মেলেনি। কনকনে ঠান্ডায় জনজীবন ছিল বিপর্যস্ত। অনেককে রাস্তায় আগুন জ্বেলে শীত নিবারণের চেষ্টা করতে দেখা গেছে।
দৌলতখান উপজেলার মদনপুর ইউনিয়নের চর পদ্মার সিডু মাঝি (৬৫) বলেন, ‘হারা দিন সুয্য ওডেনো, ঠান্ডা বাতাসে দম খিচছা আইয়ে, মনে’অ জান লই যাইবো।’
কুয়াশার কারণে ঢাকা থেকে ছেড়ে আসা লঞ্চগুলো দুপুরের পর ভোলায় এসে পৌঁছায়। এমভি বালিয়া ও এমভি লালী লঞ্চের যাত্রীরা জানান, কুয়াশার কারণে লঞ্চগুলো রাতের বেলা চরে আটকে যায়।
চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে গতকাল দিনের অর্ধেক সময়জুড়ে ছিল প্রচণ্ড কুয়াশা। ওই সময়ে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে বাতি জ্বালিয়ে যানবাহন চলাচল করেছে। উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা তারিক মাহমুদুল ইসলাম বলেন, এভাবে কুয়াশা পড়তে থাকলে ফসলে ছত্রাকজনিত রোগের প্রকোপ বাড়বে। কচি শিম, টমোটো ঝরে যাবে। সবজিতে দেখা দিতে পারে আরলিব্লাইট, লেটব্লাইট রোগ।
কনকনে শীতে জবুথবু নীলফামারীর মানুষ। স্বল্প আয়ের মানুষজন খড়কুটো জ্বালিয়ে শীত নিবারণের চেষ্টা করছে। পুরোনো কাপড়ের দোকানগুলোতে বেড়েছে স্বল্প আয়ের মানুষের ভিড়। সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগে শীতবস্ত্র বিতরণ করা হলেও প্রয়োজনের তুলনায় তা অপ্রতুল।
নীলফামারীর টুপামারী গ্রামের রিকশাচালক সাহেব আলীর (৪৫) বলেন, যে শীত পড়েছে, দিনেরাতে আগুন ছাড়া চলে না। শীতে রিকশা চালানো যায় না।
সর্বনিম্ন তাপমাত্রা, শিশুর কান্না: গতকাল দেশের সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ছিল চুয়াডাঙ্গায় ১০ দশমিক ৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস। মাত্র পাঁচ দিনের ব্যবধানে দেশের সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ড করা হলো এই জেলায়। গত বৃহস্পতিবার সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ছিল ৬ দশমিক ১ ডিগ্রি সেলসিয়াস।
চুয়াডাঙ্গা সদর হাসপাতালে গতকাল বেলা ১১টায় গিয়ে দেখা যায়, শীতজনিত রোগে আক্রান্ত শিশুদের কান্না থামাতে গিয়ে অভিভাবক ও স্বজনেরা হিমশিম খাচ্ছেন। শিশুদের কোলে নিয়ে ছোটাছুটি করছেন তাঁরা। বাড়তি রোগীর সামাল দিতে হিমশিম অবস্থা চিকিৎসকদেরও।
সদর হাসপাতালের শিশু ওয়ার্ডে ১৪ শয্যার বিপরীতে ৬৫ শিশুকে গতকাল চিকিৎসা নিতে দেখা গেছে। শয্যার অভাবে মেঝেতেই চলছে শ্বাসকষ্টসহ বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত শিশুদের চিকিৎসা। সেলাইন আর ইনজেকশন দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে শিশুরা চিৎকার দিয়ে কেঁদে উঠছে। আট মাসের সন্তানের কান্না থামাতে বাবা আব্বাস আলীকে ওয়ার্ডের এ মাথা থেকে ও মাথা ছুটতে দেখা গেছে।
চিকিৎসকের কক্ষের সামনে নাতিকে নিয়ে অপেক্ষা করছিলেন দামুড়হুদা উপজেলার মজারপোতা থেকে আসা সাবিহা বেগম। তিনি বলেন, ‘নাতিডা ১৫ দিন ধইরে ঠান্টায় ভোগজে। গ্রামের ডাক্তাররা সপ ফেল। কষ্ট কইরে বড় ডাক্তার দ্যাকাতি চুঙোড্যাঙ্গা হাসপাতালে আসলাম, চার ঘণ্টাই-উ ডাক্তারির সমনে যাতি পারলাম না।’
হাসপাতালের শিশু বিভাগের পরামর্শক মাহবুবুর রহমান জানান, চিকিৎসাধীন শিশুদের দুই-তৃতীয়াংশই নিউমোনিয়াসহ শীতজনিত শ্বাসকষ্টে আক্রান্ত।
ঠান্ডার সুযোগে চুরি: রংপুরের বদরগঞ্জে রাতে তীব্র ঠান্ডায় মানুষ যখন জবুথবু হয়ে ঘরে বসে থাকছে, সেই সুযোগে গোয়ালঘর থেকে গরু চুরি ও রাস্তায় ডাকাতি হচ্ছে। গত ১৫ দিনে উপজেলার মধুপুর ইউনিয়ন থেকে কৃষকের ১৩টি গরু চুরি হয়েছে। উপজেলার বিভিন্ন স্থানে পথচারীদের গতিরোধ করে ছিনতাই হয়েছে পাঁচটি মোটরসাইকেল। বদরগঞ্জ স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স থেকে চুরি হয়েছে একটি টেলিভিশন।
ভুক্তভোগীরা জানান, কয়েক দিন ধরে ঘন কুয়াশা ও তীব্র ঠান্ডায় রাতে মানুষ ঘর থেকে বেরোয় না। এই সুযোগে দুর্বৃত্তরা গোয়ালঘর থেকে গরু চুরি করে নিয়ে যাচ্ছে। মধুপুরের দোলাপাড়া গ্রামের কৃষক আবদুল কুদ্দুস বলেন, ‘মরণের ঠান্ডাত ঘরোত শুতি আছনো। চোরেরা কখন গরু নিয়া গেইছে, টের পাই নেই।’
মধুপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আয়নাল হক জানান, চুরি ঠেকাতে অনেকে এখন গোয়ালঘরে রাত যাপন করছেন।
বদরগঞ্জ থানার উপপরিদর্শক (এসআই) আবদুল বারী প্রধান জানান, গরু চুরি ও মোটরসাইকেল ছিনতাইয়ের কারণে চারজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
[প্রতিবেদন তৈরিতে তথ্য পাঠিয়েছেন আমাদের নিজস্ব প্রতিবেদক, রাজশাহী, ভোলা অফিস, নাটোর, চুয়াডাঙ্গা, মানিকগঞ্জ, নীলফামারী, শিবচর (মাদারীপুর), সীতাকুণ্ড (চট্টগ্রাম), গোয়ালন্দ (রাজবাড়ী) ও বদরগঞ্জ (রংপুর) প্রতিনিধি]
সূত্র- প্রথম আলো

