আপনার একজন বেশ প্রিয় মানুষের সাথে হঠাৎ দেখা হল, কিন্তু তাকে দেখার পর আপনি তাকে চিনতে না পেরে এড়িয়ে চলে গেলেন। এ অবস্থায় ওই মানুষটি আপনাকে কিভাবে দেখবেন? নিশ্চয়ই তিনি আপনার প্রতি খুব মন খারাপ করবেন। হয়ত সম্পর্কই নষ্ট হয়ে যাবে।
কিন্তু আপনারই বা কি করার আছে, আপনি তো তাকে চিনতেই পারছেন না। আসলে এমন একটি অস্বস্তিকর অবস্থাকে মনোবিজ্ঞানীরা একটি মনোরোগ হিসেবেই চিহ্নিত করে থাকেন।
এমনই একটি ঘটনা ঘটেছে জার্মানির সিলভিয়া টিপমানের জীবনে। তার এমনই একটি রোগ আছে৷ জার্মানির কেমনিটৎস শহরের ২৯ বছর বয়স্ক এই জৈব তথ্যবিজ্ঞানী মানুষের মুখ বা চেহারা মনে রাখতে পারেন না। মনস্তত্ত্ববিদরা এই রোগের নাম দিয়েছেন ‘প্রোসোপ্যাগনোসিয়া' সহজ করে বললে, এই রোগের নাম‘চেহারা মনে না রাখা’।
টিপমান একটি ঘটনার উল্লেখ করে বলেন, “একবার রাস্তায় এক স্প্যানিশ মহিলার সঙ্গে দেখা৷ তিনি হেসে সম্ভাষণ জানালেন৷ আমি মনেই করতে পারলাম না, ব্যক্তিটি কে? আসলে তিনি আমার স্প্যানিশ ভাষার টিউটর৷ স্প্যানিশ শেখার জন্য তার কাছে যাই আমি৷ ইতোমধ্যে তিনবার দেখা হয়েছে৷ বিষয়টি আসলেইখুব অস্বস্তিকর।”
এটি একটি অসুখ
মনস্তত্ত্ববিদরা বলছেন, এই রোগে আক্রান্ত রোগীদের মুখ দেখে মানুষ চিনতে কষ্ট হয়৷ তারা কোনো ছায়াছবি বা থিয়েটার ঠিকমত উপভোগ করতে পারেন না৷ কারণ ঘটনাটি তারা ভালভাবে অনুসরণ করতে পারেন না৷ নায়ক নায়িকার চেহারাই ভুলে যান৷ পরের দৃশ্যে তা আর মনে করতে পারেন না৷ কিংবা পরিচিত বা সহকর্মীদের দেখলেও চিনতে পারেন না৷
সিলভিয়া টিপমান বলেন,“এইরকম হলে অন্যরা রেগে যান৷ যেহেতু আমি তাদের চিনতে পারি না তাই তারা আমাকে অহংকারী মনে করেন।”
সুইজারল্যান্ডের ব্যার্ন ইউনিভার্সিটির জীব মনস্তত্ত্ববিদ অধ্যাপক ইয়ানেক লোবমায়ার বিষয়টি নিয়ে গবেষণা করছেন৷ তিনি এই প্রসঙ্গে বলেন, এই ধরনের প্রতিক্রিয়া অত্যন্ত স্বাভাবিক৷ ভুক্তভোগীদের সমস্যা শুধু মুখমণ্ডলকে ঘিরেই৷ এই সমস্যাটা জন্মগত৷ তবে মস্তিষ্কের কোনো কোনো জায়গায় আঘাত পেলে বা স্ট্রোক হলেও এমনটি হতে পারে৷ এর কারণ মস্তিষ্কের উদ্দীপক প্রক্রিয়ায় সমস্যা৷
তিনি বলেন, কারো মুখ দেখে মনে রাখার প্রক্রিয়াটা চলে মস্তিষ্কে৷ সুস্থ মানুষদের ক্ষেত্রে বিষয়টি ভালভাবেই চলে৷ মস্তিষ্ক অন্যের মুখমণ্ডলের বিভিন্ন বৈশিষ্ট্য, চাউনি ইত্যাদি লক্ষ্ রাখে এবং স্মৃতিতে ধরে রাখতে চেষ্টা করে৷ এজন্য মস্তিষ্কের বিভিন্ন ক্ষেত্রের এক একটি দায়িত্ব রয়েছে৷
ফল দিয়ে তৈরি একটি হাসি মুখ
সংগীতের অর্কেস্ট্রার মতোই মস্তিষ্কেরসবগুলি ক্ষেত্র সমন্বয়ের মাধ্যমে কাজ করে৷ কোনো একটি অংশ বিকল হয়ে গেলে বা ঠিকমত কাজনা করলে সমস্যার সৃষ্টি হয়৷
অনেকেই তাজানেন না
মনস্তত্ত্ববিদরা অনুমান করেন, প্রতি একশোর মধ্যে অন্তত তিনজনের মুখ না চেনার রোগটি রয়েছে৷ পরিসংখ্যানের বাইরে থাকা সংখ্যাটা আরো বেশি হবে৷ অনেকেই হয়তো জানেনই না যে তাদের এই অসুখটি আছে৷
তারা মনে করেন,মনোযোগের অসুবিধা বুঝি এটা৷ নাম মনে না রাখতে পারার সমস্যা৷ স্মৃতিশক্তি কম ইত্যাদি৷ ‘‘অনেকেই তাদের এই অসুখটার কথা শুনে হালকা বোধ করেন অবশেষে সমস্যাটির এক ব্যাখ্যা পাওয়া গেল৷'' বলেন লোবমায়ার৷
কিছু বৈশিষ্ট্য দেখে মনে রাখার কৌশল
ভুক্তভোগীরা অন্যান্য বৈশিষ্ট্য দেখে মানুষকে চিনতে চেষ্টা করেন৷ যেমন পরিচিতজনের হাঁটার ভঙ্গি, পোশাক-আশাক, কণ্ঠস্বর ইত্যাদি থেকে৷ সিলভিয়া টিপমানও নানা ধরনের কৌশলে সমস্যাটি আয়ত্তে আনার চেষ্টা করেন৷
তার ভাষায়, “ছাত্রজীবনে সহপাঠীদের জুতো দেখে তাদের চিনতে চেষ্টা করতাম৷ পেশাজীবনে এটা কার্যকর হয় না৷ কেননা চাকরিজীবীরা অনেক জোড়া জুতা কেনার সামর্থ্য রাখেন৷ সেজন্য অন্যান্য চিহ্ন মনে রাখার চেষ্টা করেন৷ আর কোনো কিছুই যদি কাজে না লাগে, কেউ সম্বোধন করলে একটুখানি মুচকি হাসলেই হয়।”
সূত্র: ডয়চে ভেলে
সুত্র -poriborton.com

