গর্ভাবস্থায় খাবারদাবারঃ অপরিহার্য পুষ্টিসমূহ
গর্ভাবস্থায় স্বাস্থ্যসম্মত খাবার গ্রহন আপনার শিশুর সুস্থভাবে বেড়ে ওঠার জন্য অপরিহার্য। এজন্য আপনাকে জানতে হবে কোন কোন খাবার-পুষ্টি আপনাকে বেশি বেশি গ্রহন করতে হবে এবং কোথায় সেগুলো পাওয়া যাবে। তবে মনে রাখতে হবে এমন কোন ম্যাজিক ফরমুলা নেই যাতে করে আপনার পুষ্টির সকল চাহিদা একসংগে মিটবে। আসলে গর্ভাবস্থার খাবার বলে আলাদা কিছু নাই। খেতে হবে পরিমানে একটু বেশি করে আর খাবারের প্রতি অতি অবশ্যই মনযোগী হতে হবে।
জেনে নিন কোন কোন খাবারের প্রতি বেশি বেশি গুরুত্ব দেয়া প্রয়োজন।
Folate and Folic Acid - জন্মগত ত্রুটি বা খুঁত রোধ করে।
Folate হল ভিটামিন ‘বি’ যা কি না স্নায়ুনালীর ত্রুটি, মস্তিষ্কের কিংবা স্পাইনাল কর্ডের কোন মারাত্মক ত্রুটি রোধে সহায়ক। গর্ভাবস্থার খাবারে যথাযথ পরিমানে Folate এর অভাবে বাচ্চা কম ওজনের হতে পারে, নির্ধারিত সময়ের আগেই জন্ম নিতে পারে। খাদ্য এবং সম্পুরক খাদ্যে Folate এর সংশ্লেষিত রুপই Folic Acid.
কতটুকু খাবেন – গর্ভবতী হওয়ার আগে থেকে এবং গর্ভাবস্থায় প্রতিদিন ৮০০ মাইক্রোগ্রাম করে Folate বা Folic Acid সম্মৃদ্ধ খাবার খাবেন।
কোথায় পাবেন – দানাদার শস্যজাতীয় তৈরী খাবার, সবুজ শাক-সবজী, লেবু ও লেবু জাতীয় ফল, শীম, মটরশুঁটি এগুলো Folate সম্মৃদ্ধ খাবারের প্রাকৃতিক উৎস।
বলা হয়ে থাকে সুস্থ গর্ভধারনের প্রয়োজনে এবং বাচ্চার কোন জন্মত্রুটি রোধে গর্ভধারনের প্রায় তিন মাস আগে থেকেই এসব খাবার গ্রহন করা উচিত।
ক্যালসিয়াম – হাড়কে করে শক্তিশালী
আপনার এবং আপনার অনাগত বাচ্চার হাড় ও দাঁতের শক্ত গড়নের জন্য ক্যালসিয়াম দরকার। এছাড়া রক্ত চলাচল, পেশিগঠন ও স্নায়ুবিক কার্যক্রম স্বাভাবিক রাখার জন্যও ক্যালসিয়ামের প্রয়োজন।
কতটুকু খাবেন – প্রতিদিন ১,০০০ মিলিগ্রাম আর গর্ভবতী মা যদি কিশোরী হন তবে ১,৩০০ মিলিগ্রাম/প্রতিদিন।
কোথায় পাবেন – দুধ এবং দুগ্ধজাত খাবার ক্যালসিয়ামের প্রধান উৎস। আরো আছে কিছু কিছু ফল ও ফলের রস এবং সকালের নাস্তার শস্যজাতীয় খাবার।
ভিটামিন ডি
অনাগত বাচ্চার দাঁত, হাড়ের শক্তি ও পরিপূর্নতার জন্য খুবই উপকারী। প্রতিদিন প্রায় ৬০০IU করে প্রয়োজন। চর্বিযুক্ত মাছ ভিটামিন ডি’র অন্যতম উৎস। এছাড়া দুগ্ধজাত খাবার ও কমলার রসে প্রচুর ভিটামিন ডি পাওয়া যায়।
আমিষ
বাচ্চার বেড়ে ওঠার সহায়ক অতি প্রয়োজনীয় এ উপাদানটি গর্ভাবস্থায় বিশেষ করে গর্ভের দ্বিতীয় ও তৃতীয় পর্যায়ে বাচ্চার সঠিক বেড়ে ওঠার ক্ষেত্রে অত্যাবশকীয়। প্রতিদিন প্রায় ৭১ গ্রাম প্রয়োজন। আর পাবেন লাল মাংস, পোল্ট্রি, মাছ, ডিম, দুধ ও দুগ্ধজাত খাবার ইত্যাদি প্রানিজ খাবারে এবং শিম, মটরশুঁটি, উদ্ভিজ মাখন ইত্যাদিতে।
আয়রন বা লৌহ – রক্তশুন্যতা রোধ করে
রক্তের একটি গুরুত্বপূর্ন অংশ লোহিত রক্ত কনিকার হিমোগ্লোবি্ন। এটি একধরনের প্রোটিন যা অক্সিজেন বহন করে কোষে কোষে পৌঁছে দেয়। এটি তৈরীর অপরিহার্য উপাদান আয়রন। গর্ভাবস্থায় ক্রমবর্ধমান চাহিদার কারনে রক্তের পরিমান বাড়ে। বাচ্চার পুষ্টির সরবরাহের সম্পূর্ন চাহিদা পূরন হয় মায়ের রক্তের মাধ্যমে। কাজেই ওই সময়ে আয়রনের চাহিদা প্রায় দ্বিগুন বেড়ে যায়। প্রয়োজনীয় আয়রন না পেলে ক্লান্তি-অবসাদ বেড়ে যায়, ইনফেকশনের ঝুঁকি বেড়ে যায়। অনেক ক্ষেত্রে অকাল প্রসব, বাচ্চার কম ওজন, এমনকি আরো কোন জটিলতা দেখা দিতে পারে।
কতটুকু খাবেন – প্রতিদিন প্রায় ২৭ মিলিগ্রাম।
কোথায় পাবেন – চর্বিবিহিন লাল মাংস, পোল্ট্রি, মাছ ইত্যাদি আয়রনের ভালো উৎস। অন্যান্যের মধ্যে আছে দানাদার খাদ্য, বাদাম এবং শুকনো ফল। আর জরুরী প্রয়োজনে ডাক্তারের পরামর্শ মতে আয়রন সাপ্লিমেন্ট গ্রহন করা যেতে পারে।
পানি
মায়ের দেহ থেকে প্রয়োজনীয় সব পুষ্টি বহন করে বাচ্চার দেহে পৌঁছে দেয় পানি। পানি কোষ্ঠকাঠিন্য, রক্তপড়া, অতিরিক্ত ফুলে যাওয়া, মুত্রনালী বা মুত্রথলির সংক্রমন ইত্যাদি রোধে পানি অনন্য ও অপরিহার্য।
কতটুকু পান করবেন – বেশিরভাগ বিশেষজ্ঞগন গর্ভবতি মায়ের জন্য প্রতিদিন ১০ কাপ বা প্রায় ২.৩ লিটার তরল পানের পরামর্শ দিয়ে থাকেন। এর মধ্যে আছে পানি, ফলের রস, কফি, চা, কোমল পানীয় ইত্যাদি। তবে মনে রাখতে হবে কিছু পানীয়তে বেশি পরিমানে চিনি থাকতে পারে যা মুটিয়ে যাবার প্রবনতাকে বাড়িয়ে দেয়। আবার অতিরিক্ত ক্যাফেইন বাচ্চার বেড়ে ওঠার ক্ষেত্রে ক্ষতির কারন হতে পারে। তাই কফি-চা ইত্যাদি ক্যাফেইনযুক্ত পানীয় ২০০ গ্রামের বেশি পান করা উচিত নয়।
তেল, চর্বি, মিষ্টি - তেল, চর্বি, মিষ্টির কোন নির্দিষ্ট পরিমান নেই তবে চাহিদামত খেতে হবে যদি ওজন বাড়ানোর লক্ষ্য না থাকে। স্বাভাবিকভাবে এমন খাবার খেতে হবে যাতে তেল, চর্বি, মিষ্টি কম পরিমানে থাকে।
সৌজন্যেঃ হেলথ প্রায়র ২১

