
অ্যালকোহলের মতাদর্শে যারা বিশ্বাসী তারা মনে করেন ক্ষমতালিপ্সাই অ্যালকোহল নেশার কারণ। শৈশব থেকে হীনম্মন্যতা বোধ জন্মায় যদি বাবা-মা অতিরিক্ত শাসন বা চোখে চোখে রাখেন এবং এই ছেলেমেয়েরাই বড় হয়ে এই হীনম্মন্যতা বোধকে কাটিয়ে ওঠার জন্য অ্যালকোহলের নেশায় আক্রান্ত হয়ে পড়ে। অনেক সময় ‘হতাশা ব্যঞ্জক উচ্চাকাক্সা’বা অতিরিক্ত ক্ষমতার প্রতি ঝোঁক ছেলে মেয়েদের অ্যালকোহলের নেশার প্রতি আকৃষ্ট করে থাকে। কারণ অ্যালকোহল একটা কিছু পাওয়া গেল বা আমি ক্ষমতাবান এই রকম একটা ভাব বা ধারণা মনে সৃষ্টি করলেও তা সাময়িক। অনেকে মনে করেন যাদের মধ্যে অ্যালকোহলের নেশার প্রবণতা আছে তাদের মানসিক অবস্থা একটু অন্যরকম। এই ছেলে মেয়েদের ব্যক্তিত্বের গঠন কিছুটা অস্বাভাবিক, একে অ্যালকোহলিক পার্সোনালিটি বলা হয়। সাধারণ ভাবে কী দেখে ‘অ্যালকোহলিক পার্সোনালিটি’ চেনা যাবে তা বলা অনেক সময় কঠিন। বিভিন্ন মানসিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে এ বিষয়ে বলা হয়। এখন নিয়মিত অ্যালকোহল ব্যবহার করার জন্য, না এই ধরনের ব্যক্তিত্ব সম্পন্ন ছেলেমেয়েরা অ্যালকোহলের প্রতি আসক্ত হয়ে পড়ে সঠিক ভাবে বলা কঠিন। Psychoanalytic theory ফ্রয়েডীয় দৃষ্টিকোণ বিচার করলে অ্যালকোহলি জমের কারণ অন্তর্দ্বন্দ্ব। নেশায় আসক্ত অদম্য ইচ্ছা ও আক্রোশ প্রবণতার মধ্যে অন্তর্দ্বন্দ্ব থেকে অ্যালকোহলের নেশার উৎপত্তি। অবদমিত আবেগ, নিরাপত্তা বোধের অভাব, নিজেকে কষ্ট দেয়ার প্রবণতা, নিজেকে শাস্তি দেয়ার প্রবণতা, বাবা-মায়ের প্রতি বিজাতীয় বিদ্বেষ প্রভৃতি নানা কারণের কথা মনে করা হয়।
এন্ডোক্রিন থিওরি : অ্যালকোহলের প্রতি আসক্তির কারণ হিসেবে শরীরের হরমোন গ্ল্যান্ডের অস্বাভাবিকতার কথা ভাবা হয়। পিটুইটারি গ্ল্যান্ড, অ্যাড্রেনালিন কর্টেক্স প্রভৃতির গণ্ডগোল অ্যালকোহল বেশি খেলে অথবা যারা নিয়মিত অ্যালকোহল খায় তাদের মধ্যে দেখা যায়।
জেনেটোট্রাফিক থিওরি : মেটাবলিজমের জন্মগত ত্রুটির জন্য কিছু মানুষের শরীরে ভিটামিনের চাহিদা বেশি হয়। অ্যালকোহল যারা খায় তাদের মধ্যে অস্বাভাবিক পুষ্টির চাহিদা দেখা যায় এবং এই চাহিদার জন্যই তারা অ্যালকোহলের পরিমাণ বাড়িয়ে দেয়।
জেনিটিক থিওরি : অনেক বৈজ্ঞানিক মনে করেন অ্যালকোহলের নেশা বংশগত। একই পরিবারের অনেকে অ্যালকোহলের নেশা করে থাকে। তার জন্যই পারিবারিক বা বংশগত যোগসূত্রতার কথা অ্যালকোহলের নেশার ক্ষেত্রে ভাবা হয়, যারা নিয়মিত অ্যালকোহলের নেশায় আক্রান্ত তাদের মধ্যে ওপরের কারণগুলোর একটি মাত্র কারণই যে দেখা হয় তা নয়। একের বেশি কারণও থাকতে পারে। নেশাগ্রস্ত ছেলেমেয়েদের কিভাবে চেনা যায় যখন কিশোর-কিশোরী নেশা শুরু করে তখন তাদের প্রথম অবস্থাতেই অনেক সময় ধরা যায় না।
প্রাথমিক অবস্থায় মাদকাসক্ত হওয়ার লক্ষণ ধরা বেশ কঠিন। খুব সতর্ক ও অভিজ্ঞ চোখে এই পরিবর্তন বুঝতে পারা যায়। যেমন মুডের পরিবর্তন, উৎসাহী সতেজ মনের দিনে দিনে নিরুসাহী হয়ে ওঠা, লেখাপড়ায় উৎসাহ না থাকা, কাজকর্মে উৎসাহ না থাকা, সব সময় শুয়ে-বসে থাকা, ঝিমুনি, বেশি ঘুমানো, বেশি রাতে ঘুমাতে যাওয়া, সকালে ঘুম থেকে না ওঠা, অতিরিক্ত অলসতা, কান্তি, বাবা-মাকে এড়িয়ে চলা, বাড়ির লোকজনকে এড়িয়ে চলা, আলাদা থাকতে চাওয়া, বাড়ির বাইরে বেশি সময় কাটানো, বন্ধ ঘরে বেশি সময় একা একা কাটানো, বাথরুমে বেশি সময় পার করা, সবার প্রতি উদাসীন থাকা, বাবা-মায়ের প্রতি উদাসীনতা, টাকা-পয়সার প্রতি ঝোঁক, টাকা চাওয়া, প্রয়োজনে চুরি করা, ছিনতাই করা, মিথ্যা কথা বলা, বন্ধুবান্ধবের সংখ্যা বেড়ে যাওয়া, নিজের যত না নেয়া, অপরিচ্ছন্ন থাকা, অত্যধিক ফ্যাশনেবল হওয়া, চুল এলোমেলো করে রাখা, ঝগড়াঝাটি করা, গালি-গালাজ করা ইত্যাদি। অবশ্য ছেলেমেয়েদের মধ্যে সামান্য অস্বাভাবিকতা বা ওপরে যে উপসর্গ, লক্ষণ বলা হলো তা প্রকাশ পেলেই যে সন্তান নেশা করছে এটাও সব সময় ভাবা ঠিক নয়। মনে সন্দেহ এলে সঠিকভাবে অনুসন্ধান করে তবেই কোনো সিদ্ধান্ত নেয়া উচিত।
সূত্র -দৈনিক নয়া দিগন্ত

