জিংক বা দস্তা ধাতু হিসেবে সুপরিচিত। সুপরিবাহী ধাতু হিসেবে বৈদ্যুতিক ও রাসায়নিক শিল্পে দস্তার রয়েছে বিশাল কদর। কিন্তু এ ধাতব বস্তুই মানুষের শরীরে স্বল্প পরিমাণে থেকেও স্বাস্থ্য গঠনে কী অপরিমেয় ভূমিকা পালন করে আসছে, তা আমরা হয়তো অনেকেই জানি না। চিকিৎসাবিজ্ঞানীদের অকান্ত গবেষণায় আজ আমরা জানতে পেরেছি, শরীর গঠনে ও রোগ প্রতিরোধে কতটা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে। ভিয়েতনাম, ভারত, জ্যামাইকা, পেরু, পাপুয়া নিউগিনি ও আমাদের দেশের ডায়রিয়া আক্রান্ত শিশুদের মধ্যে পরিচালিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, প্রতিদিন ২০ মিলিগ্রাম জিংক খাওয়ানোর ফলে তারা দ্রুত আরোগ্য লাভ করছে। পেরুর লিমায় অপর এক গবেষণায় দেখা গেছে, ডায়রিয়া আক্রান্ত শিশুদের শতকরা ২৯ জন প্রতিদিন ওই একই মাত্রায় জিংক ব্যবহারে ডায়রিয়া রোগজনিত জটিলতা থেকে সম্পূর্ণভাবে রক্ষা পেয়েছে। এমনকি পুষ্টিহীনতার শিকার শিশুদের মধ্যেও এই পরিবর্তন ছিল লক্ষণীয়। শুধু ডায়রিয়াই নয়, নিউমোনিয়া রোগপ্রতিরোধ এবং রোগ থেকে আরোগ্য লাভের ক্ষেত্রে জিংক দারুণভাবে কাজ করছে।
নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত শিশুদের প্রতিদিন মাত্র ১০ মিলিগ্রাম জিংক প্রয়োগ করে ৪৫ শতাংশ ক্ষেত্রে ভালো ফল পাওয়া গেছে। পাপুয়া নিউগিনিতে পরিচালিত গবেষণায় শরীরে জিংকের অভাব রয়েছে এমন লোকজনের মধ্যে ম্যালেরিয়ার প্রকোপ অপেক্ষাকৃত বেশি দেখা দেয়Ñ এ তথ্যই বেরিয়ে এসেছে। এ ছাড়া শরীরে ঘা শুকাতে, বুদ্ধিবৃত্তির বিকাশ, প্রজননতন্ত্রের বিকাশ সাধনেও জিংকের ভূমিকা যে অপরিহার্য, তা আজ প্রমাণিত হয়েছে। জিংকের জাদুকরী ভূমিকার রহস্য আমাদের শরীরের একটি গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থির নাম থাইমাস। গ্রন্থিটি আমাদের গলার কাছে অবস্থান করে। জিংকের অভাব ঘটলে এ গ্রন্থি ক্রমেই শুকিয়ে যেতে থাকে। থাইমাস গ্রন্থির কাজ হলো রোগপ্রতিরোধকারী টি লিস্ফোসাইট কোষগুলোকে আরো পরিণত করে তোলা। থাইমাস গ্রন্থি শুকিয়ে যেতে থাকলে শরীরে টি লিস্ফোসাইটগুলো পরিমাণে কমে যায়। সেই সাথে শরীরের ইম্যুয়ন কার্যক্রম তথা রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতাও কমে যায়। ফলে যেকোনো রোগে শরীর সহজেই কাবু হয়ে পড়ে।
এ ছাড়া শরীরের প্রায় তিন শ’ বিভিন্ন রকমের গুরুত্বপূর্ণ এনজাইম, আমিষ বা প্রোটিন এবং হরমোন তৈরির ক্ষেত্রে জিংক অপরিহার্য ভূমিকা পালন করে। জিংকের অভাবে শরীরের অভ্যন্তরের শ্লেষ্মা, ত্বক ও কোষগুলো ভালোমতো বাড়তে পারে না। হরমোন ও প্রোটিন বিনির্মাণে উল্লেখযোগ্য ভূমিকায়ই পর্যাপ্ত জিংক বহনকারী শিশুদের মানসিক বিকলাঙ্গতা ও বন্ধ্যত্বের স্বীকার হওয়ার সম্ভাবনা থাকে না বললেই চলে। ত্বক আর শ্লেষ্মাকে সুগর্বিত করে বিধায় জিঙ্ক কাটা ছেঁড়া এবং ত্বকের ঘা শুকাতে চমৎকার কাজ করে থাকে।
জিংকের ঘাটতি যাদের মধ্যে দেখা দেয় অনেক দিন ধরে তীব্র পেটের পীড়া থাকলে, কিডনির রোগ নেফ্রোটিক সিন্ড্রোমের শিকার হলে, অ্যালকোহলে আসক্তদের শরীর পুড়ে গেলে, ডায়াবেটিস রোগে আক্রান্ত হলে, শরীর অনেক দিন জরাগ্রস্ত থাকলে এবং ডায়ালাইসিসকৃত রোগীদের শরীরে জিংকের ঘাটতি দেখা দেয়। যেভাবে জিংক আহরণ করবেন একজন মহিলার জন্য জিংকের দৈনিক পরিমিত মাত্রা হলো সাত মিলিগ্রাম, পুরুষের ক্ষেত্রে এ মাত্রা হলো সাড়ে ৯ মিলি গ্রাম। ছোট মাছ, চিংড়ি, বাদাম, শিম, বরবটি, ভুসিসহ গম অথবা যব, জই, গরু বা খাসির কলিজা ও গোশতÑ এসব খাবার হলো জিংকের সহজ উৎস। তবে উল্লেখযোগ্য পরিমাণে জিংক রয়েছে জলপাই অথবা জলপাইয়ের তেলে।
সুত্র - দৈনিক নয়া দিগন্ত

