চোখের চাপজনিত রোগ গ্লোকমা
22 May,14
Viewed#: 76

গ্লোকমা এমনই একটি অসুখ যে অসুখে চোখের অপটিক স্নায়ু ক্ষতিগ্রস্ত হয়; এর সঙ্গে চোখের অভ্যন্তরীণ চাপের একটি গভীর সম্পর্ক রয়েছে। আমাদের চোখের সঙ্গে মস্তিষ্কের সরাসরি যোগাযোগ রয়েছে। প্রায় ১২ লাখ জীবন্ত তার দিয়ে অপটিক স্নায়ু গঠিত। সুস্থ স্বাভাবিক দৃষ্টির জন্য সুস্থ অপটিক স্নায়ু প্রয়োজন। গ্লোকমা রোগটি মূলত এ অপটিক স্নায়ুকেই আক্রান্ত করে। চোখের অভ্যন্তরীণ চাপ বৃদ্ধির কারণে যেসব সূক্ষ্ম রক্তনালিকা অপটিক স্নায়ুকে পুষ্টি যোগায় সেগুলো ধীরে ধীরে বন্ধ হয়ে যায়। ফলে অপটিক স্নায়ু ধীরে ধীরে দুর্বল থেকে দুর্বলতর হতে থাকে, দৃষ্টির পরিধি বা পরিসীমা সংকুচিত হতে থাকে। একপর্যায়ে দৃষ্টিশক্তি লোপ পায় এবং একজন মানুষ অন্ধত্ব বরণ করে। এটিই হচ্ছে গ্লোকমা রোগ।
কাদের গ্লোকমা রোগ হওয়ার আশংকা বেশি 
গ্লোকমা যে কোনো বয়সে হতে পারে তবে কেউ কেউ আছেন যারা অন্যদের চেয়ে বেশি মাত্রায় ঝুঁকির মধ্যে থাকেন। যেমন-
*যাদের বয়স ৩৫ বছর এর উপরে।
*যাদের পরিবারে গ্লোকমার ইতিহাস আছে। গ্লোকমা একটি পারিবারিক রোগও বটে।
*যারা ডায়াবেটিস বা উচ্চ রক্তচাপে ভুগছেন।
*যারা অতিমাত্রায় প্লাস বা মাইনাস পাওয়ারের চশমা ব্যবহার করেন।
*যাদের চোখের চাপ স্বাভাবিক মাত্রার চেয়ে বেশি থাকে।
*যাদের চোখে আঘাতের ইতিহাস আছে।
*যারা দীর্ঘদিন স্টেরয়েড জাতীয় ওষুধ চোখে প্রয়োগ করছেন অথবা মুখে সেবন করছেন।
*যারা দীর্ঘমেয়াদি চোখের জটিল প্রদাহে ভুগছেন।
*যাদের চোখে টিউমার আছে।
*যাদের চোখে অতীতে অপারেশন হয়েছে।
*দীর্ঘদিন যাদের চোখে ছানি রয়েছে।
গ্লোকমার প্রকারভেদ
গ্লোকমা রোগ শুধু বড়দের হয় না। শিশুও গ্লোকমা রোগ নিয়ে জন্মগ্রহণ করতে পারে, যাকে জন্মগত গ্লোকমা বলা হয়। জন্মের পরও শিশুর গ্লোকমা হতে পারে। জন্মগত গ্লোকমার ক্ষেত্রে চোখের আকার বেশ বড় হয়। একে বুফথ্যালমাস বা ষাঁড়ের মতো চোখ বলা হয়। চোখ বড় দেখায় বলে কেউ কেউ একে ডাগর ডাগর চোখ বলে থাকেন। এ শিশুর চোখ দিয়ে অঝর ধারায় পানি পড়তে থাকে, চোখের নেত্রস্বচ্ছ ঘোলা হতে থাকে এবং আলোর প্রতি সংবেদনশীলতা বেড়ে যায়। সময়মতো চিকিৎসা না নিলে এ ধরনের প্রতিটি শিশুই অন্ধত্ব বরণ করতে পারে।
গ্লোকমা দুধরনের হয়। একটি উন্মুক্ত কোণবিশিষ্ট গ্লোকমা এবং অন্যটি বন্ধকোণবিশিষ্ট গ্লোকমা।
উন্মুক্ত কোণবিশিষ্ট গ্লোকমার ক্ষেত্রে চোখের সামনের প্রকোষ্ঠে অবস্থিত নেত্রস্বচ্ছ এবং আইরিশের সংযোগস্থলের অ্যাঙ্গেল বা কোণের আকার স্বাভবিক থাকে। নির্গমন পথে যে ছাকনি আছে যাকে ট্রাবিকুলার মেশওয়ার্ক বলা হয়, সেই ছাকনির ছিদ্রগুলো বন্ধ হতে থাকে। ফলে চোখের অভ্যন্তরীণ চাপ ধীরে ধীরে বৃদ্ধি পেতে থাকে।
বন্ধ কোণবিশিষ্ট গ্লোকমার ক্ষেত্রে চোখের সামনের প্রকোষ্ঠে অবস্থিত নেত্রস্বচ্ছ এবং আইরিশের সংযোগস্থলের কোণটি ধীরে ধীরে সরু হতে হতে একপর্যায়ে বন্ধ হয়ে যায়। ফলে হঠাৎ করেই চোখের অভ্যন্তরীণ চাপ দ্রুত গতিতে বৃদ্ধি পায়।
গ্লোকমা রোগের উপসর্গ .jpg)
গ্লোকমার প্রাথমিক পর্যায়ে কোনো উপসর্গ থাকে না। উন্মুক্ত কোণবিশিষ্ট গ্লোকমার ক্ষেত্রে কেউ কেউ অভিযোগ করেন, তাদের বয়স ৪০ হওয়ার আগেই কাছের সূক্ষ্ম জিনিস দেখতে বা পড়তে সমস্যা হচ্ছে অথবা তাদের পড়ার চশমার পাওয়ারটি ঘনঘন পরিবর্তন করতে হচ্ছে। কেউ বলেন, পড়তে পড়তে কিছু অক্ষর হারিয়ে যাচ্ছে। কেউ আবার বলেন, তাদের রাতে দেখতে সমস্যা হচ্ছে বা সিঁড়ি দিয়ে ওঠা-নামা করতে অসুবিধা হচ্ছে। বন্ধ কোণবিশিষ্ট গ্লোকমার ক্ষেত্রে প্রাথমিক পর্যায়ে কোনো রকম উপসর্গ না থাকলেও একপর্যায়ে হঠাৎ করেই একদিন চোখে প্রচণ্ড ব্যথা অনুভূত হয়, চোখ লাল হয়ে যায়, দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে আসে, আলোর চার পাশে রংধনুর বর্ণালি দেখা যায় এবং প্রচণ্ড মাথাব্যথা এমনকি বমিও হতে থাকে। জরুরি চিকিৎসা ব্যবস্থা না নিলে স্বল্প সময়েই দৃষ্টিশক্তির স্থায়ী ক্ষতিসাধন হয়।
গ্লোকমা রোগ কীভাবে শনাক্ত করা হয়
গ্লোকমা রোগ প্রাথমিক পর্যায়ে শনাক্ত করা খুব কঠিন, যদিও এটি নির্ণয় করা জরুরি। এ রোগে চোখের দৃষ্টিশক্তির যতটুকু ক্ষতিসাধন হয় তা আর কখনও ফিরে আসে না। অনেক ক্ষেত্রেই চক্ষু বিশেষজ্ঞের চেম্বারে সাধারণ প্রক্রিয়ায় চশমার পাওয়ার পরীক্ষা করতে এসে গ্লোকমা রোগটি লক্ষণ প্রকাশের আগেই ধরা পড়ে। দৃষ্টি পরীক্ষার পাশাপাশি চোখের চাপ পরিমাপ করা হয়, অপথ্যালমোস্কপ যন্ত্র দিয়ে সরাসরি অপটিক স্নায়ু পর্যবেক্ষণ করা হয়, অপটিক স্নায়ুর ছবি তোলা বা অপটিক ডিস্ক ইমেজিং করা হয়, গোনিয়োস্কপ যন্ত্রের সাহায্যে চোখের সামনের প্রকোষ্ঠের সংযোগ কোণটি সরাসরি পর্যবেক্ষণ করে দেখা হয়- সেটি খোলা আছে, না সরু হয়েছে বা বন্ধ হয়ে গেছে। হামফ্রি ভিসুুয়াল ফিল্ড এনালাইজারের মাধ্যমে দৃষ্টির পরিসীমা বিশ্লেষণ করা হয়। অপটিক্যাল কোহেরেন্স টমোগ্রাফির মাধ্যমে অপটিক স্নায়ুর ক্ষতির পরিমাণ নির্ধারণের পাশাপাশি চোখের সামনের প্রকোষ্ঠের সংযোগ কোণটির আকার পরিমাপ করা হয়।
গ্লোকমা রোগের চিকিৎসা
গ্লোকমা সারা জীবনের অসুখ। গ্লোকমা নিরাময়যোগ্য নয়, নিয়ন্ত্রণযোগ্য অসুখ। চিকিৎসার মূল উদ্দেশ্য হল যতটুকু দৃষ্টি অবশিষ্ট আছে সেটি ধরে রাখা। গ্লোকমা রোগ তিন উপায়ে নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব। ওষুধ, লেজার চিকিৎসা এবং অপারেশনের মাধ্যমে। চোখে নিয়মিত ড্রপ দেয়াই গ্লোকমা রোগ চিকিৎসার মূল ভিত্তি। কিছু ড্রপ রয়েছে যেগুলো অ্যাকুয়াস হিউমার জলীয় পদার্থটির উৎপাদন কমিয়ে দেয় আবার কিছু ড্রপ রয়েছে যেগুলো ওই জলীয় পদার্থটির নির্গমনকে তরান্বিত করে। প্রয়োজনে স্বল্প সময়ের জন্য খাওয়ার ট্যাবলেটও দরকার হতে পারে। প্রথমেই চোখের চাপ কমানোর একটা লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়, যাকে আমরা টার্গেট প্রেসার বলে থাকি। সেই লক্ষ্যেই এক বা একাধিক ড্রপ বা ট্যাবলেট এককভাবে বা যৌথভাবে ব্যবহার করা হয়। কোনো কারণে চোখের চাপ ওষুধের মাধ্যমে কমানো সম্ভব না হলে উন্মুক্ত কোণবিশিষ্ট গ্লোকমার ক্ষেত্রে লেজার ট্রাবিকুলোপ্লাস্টি এবং বন্ধ কোণবিশিষ্ট গ্লোকমার ক্ষেত্রে লেজার পেরিফেরাল আইরিডোটমি করা হয়। ওষুধ এবং লেজারের মাধ্যমে চোখের চাপ কমানোর লক্ষ্যমাত্রা অর্জন সম্ভব না হলে ট্রাবিকুলেকটমি অপারেশন বা ভাল্ব ইমপ্লান্টের মাধ্যমে চোখের চাপ কমিয়ে আনা হয়।
সূত্র - দৈনিক যুগান্তর